সাপ আতঙ্ক নিয়েআসে রাত, দিনে সন্তান হারানোর ভয়

সাপ আতঙ্ক নিয়েআসে রাত, দিনে সন্তান হারানোর ভয়

সাপ আতঙ্ক নিয়েআসে রাত, দিনে সন্তান হারানোর ভয়

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ময়মনসিংহ সদর উপজেলার বন্যাপ্লাবিত এলাকার গল্প কী করুণ। সাপ আতঙ্ক নিয়েআসে রাত, দিনে সন্তান হারানোর ভয় নিয়ে চলে বন্যা অঞ্চলের মানুষের জীবন। আষাঢ় মাসের শুরু থেকেই সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি নামার জায়গা না থাকায় পুরো গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। এতে রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়িতে ওঠে পানি। এমনকি চুলা ও টয়লেটও এখন পানির নিচে। এমন অবস্থায় চিড়ামুড়ি খেয়ে দিন পার করছেন ৫ গ্রামের মানুষ। দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকার কারণে শিশুরাও ভুগছে বিভিন্ন রোগে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় উঠেছেন। যাদের সামর্থ্য নেই, তারা খেয়ে না খেয়েই দিনপার করছেন। কেউ কেউ আবার গরু ছাগল নিয়ে আত্মীয় বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

সরেজমিনে গিয়ে এমনই অবস্থা দেখা গেছে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ৬নং চর ঈশ্বরদিয়া ইউনিয়নের বাজিতপুর, বড়বিলা ও আলালপুর, ৭নং চর নিলক্ষীয়া ইউনিয়ন রশিদপুর ও তারাকান্দা উপজেলার ১নং তারাকান্দা ইউনিয়নের পুটামারা গ্রাম। ওই ৫ গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বর্ষার শুরু থেকে পানিবন্দি।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, প্রভাবশালীরা সরকারি খাল-বিল দখল করে গড়ে তুলেছে মাছের ফিশারি। যে কারণে পানি নামতে না পারায় বাড়িঘরে পানি উঠেছে। রশিদপুরের বাউশী বিল প্রায় ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য। এর প্রস্থ প্রায় আড়াই কিলোমিটার যার পুরোটাই প্রভাবমালীরা দখল করে ফিশারি গড়ে তুলেছেন। এছাড়াও কাটাখালী খালও প্রভাবশালীদের দখলে। ফিশারির কারণে কাটাখালী খালের উত্তর-পূর্ব মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে পানি নামতে পারে না।

স্থানীয়দের দাবি, কাটাখালী খাল ও বাউশী বিল দখলমুক্ত করলে তাদের কষ্ট লাঘব হবে।

গৃহিণী মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার পরিবারের সদস্যদের আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। স্বামীকে নিয়ে দিনে একবেলা খেয়ে দিনপার করছি। রান্না ঘরের চুলাতে পানি। পানি উঠেছে টয়লেটেও। এ অবস্থায় আর পেরে উঠছি না। সরকার যদি আমাদের না দেখে, তাহলে আমাদের পানিবন্দি হয়ে না খেয়ে মরতে হবে।

স্থানীয় নাঈব আলী বলেন, চারপাশে মাছের ফিশারি থাকার কারণে পানি নামতে পারে না। ফলে পুরো গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। আমরা এই পানিবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি চাই।

ওয়াহেদ আলী নামে এক যুবক বলেন, পানিবন্দি অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপদে আছি শিশু, বৃদ্ধ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। কেউ যদি গুরুতর অসুস্থ হন তাহলে তাকে কাঁধে করে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। এছাড়া হাস, মুরগি, গরু ও ছাগলের খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

রশিদপুর গ্রামের মাদরাসা শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রায় তিন মাস যাবত আমরা পানিবন্দি জীবনযাপন করছি। আমাদের রাত কাটে সাপের আতঙ্কে, দিন কাটে শিশু সন্তান পানিতে পড়ার ভয়ে। দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকার কারণে গ্রামের শিশুরা বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে ভুগছে। এই পানি পানিবন্দি অবস্থা থেকে আমরা মুক্তি চাই।

এদিকে ফিশারি মালিক সুরুজ মিয়া বলেন, আমি তিন একর জায়গায় মাছচাষ করি। ফিশারির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়নি।

অপর ফিশারি মালিক বাবুল মিয়া বলেন, ফিশারির কারণে জলাবদ্ধতা হয়েছে এই কথাটা ঠিক না। কাটাখালী খাল যদি খনন করা হয় তাহলে গ্রামবাসীর এই কষ্ট থাকবে না। তিনি কাটাখালী খাল খনন করার দাবি করেন স্থানীয় প্রশাসনের কাছে।

এ বিষয়ে ৭নং চর নিলক্ষীয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুকুল ইসলাম রতন বলেন, গ্রামবাসীর দুর্ভোগের খবর পেয়ে গতকাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা পরিদর্শন করে গেছেন। তিনি গ্রামবাসীর দুর্ভোগ লাঘবের ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, গতকাল আমি নিজে ৬নং চর ঈশ্বরদিয়ার বাজিতপুর, বড়বিলা ও আলালপুর, ৭নং চর নিলক্ষীয়া ইউনিয়ন রশিদপুর গ্রামগুলো পরিদর্শন করে এসেছি। যত দ্রুত সম্ভব খালগুলো উদ্ধার বা খনন করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।

খাল-বিল (খাসজমি) দখল করে মাছচাষ করার ব্যাপারে তিনি বলেন, যে বা যারাই খাল-বিল দখল করে ফিশারি তৈরি করেছে তাদের চিহ্নিত করে নোটিশ দিয়ে খাস জমি উদ্ধার করা হবে। কেউ যদি আপোষে খাস জমি ছেড়ে না যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *