সিলেট কোর্ট পয়েন্ট : এক টুকরো বাংলাদেশ
মোহাম্মদ ইয়াহইয়া শহিদ ❑ হাতের পাঁচ আঙুলের দৈর্ঘ্য সমান থাকে না, থাকার কথাও না; কিন্তু খাবার খেতে শুরু করলে পাঁচ আঙুলের মাথা এক জায়গায়ই আসে। এতে লম্বা আঙুলগুলোর নিজেকে ছোট করতে হয়। একইভাবে সব আলেমের রাজনৈতিক মতাদর্শ এক না, হওয়ার কথাও না; কিন্তু যখন এক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তখন বড়দেরকেই ছোট হয়ে ঐক্য গড়তে হয় অনেকটা পাঁচ আঙুলের মতই।
বাংলাদেশে কোনো ইস্যুতে সব মতাদর্শের আলেম এক হয়ে এক মঞ্চে বসার ঘটনা খুব একটা আমার চোখে পড়েনি। বিশেষ করে সিলেটে তো এটা একেবারেই বিরল। সর্বশেষ ২০০৪ সালে সিলেট কোর্ট পয়েন্টে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নারী উন্নয়ন নীতিমালার প্রতিবাদে ছোটখাটো একটি ঐক্যমঞ্চ আমি দেখেছিলাম। এরপর হেফাজত, জমিয়ত, খেলাফত কেউই আর ঐক্যের পথে অগ্রসর হয়নি। দিন যত গেছে সব দলই ঐক্যের পথটাকে আরো কঠিন করে তুলেছে।
২০১৩ সালে হেফাজতের ব্যানারে মোটামুটি একটা ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করা হলেও সেটা সম্ভব হয়নি খোদ কেন্দ্রীয় হেফাজতের কোন্দলের কারণে।
বিগত দু’এক বছরে নেতৃস্থানীয় ওলামায়ে কেরামকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় হারিয়েছে সিলেটবাসী। প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান, মাওলানা আমকুনি, মাওলানা সুনামগঞ্জী, মাওলানা হবিগঞ্জী, মাওলানা ইমামবাড়ী (রহিমাহুমুলুল্লাহু তা’আলা) সহ অনেককে হারিয়ে সিলেটবাসী আজ প্রায় নেতৃত্বহারা। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয় প্ররোচনায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কার্টুন প্রদর্শনের প্রতিবাদে গোটা বিশ্বেই প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বাংলাদেশেও প্রতিবাদ কম হয়নি, যথেষ্ট হয়েছে। কিন্তু ওলী-আউলিয়াদের স্মৃতিধন্য সিলেটবাসী আঞ্চলিকভাবেও একটা বড়সড় প্রতিবাদের আশা করছিল।
সিলেটবাসীর মনের কথা বুঝতে পেরেছিলেন কাসিমুল উলূম দরগাহ মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী। তিনি সবাইকে ডাকলেন, পরামর্শ করলেন। উলামা পরিষদের ব্যানারে রাসূলপ্রেমের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিলেন সিলেটের সেই ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্টেই। সিলেটবাসী একটা বড়সড় প্রতিবাদের জন্য তৈরি হতে লাগল; কিন্তু সেখানেও বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো হেফাজত।
হেফাজতের একাংশের দাবি ছিল, হেফাজতের কমিটি থাকতে উলামা পরিষদের নামে কেন আন্দোলনের ডাক দিলেন খোদ হেফাজতের সিলেট জেলার সভাপতি! আমার মত অনেকেই মনে করলো, ক্রেডিট সন্ত্রাসের শিকার হয়ে আর মনে হয় সিলেটের মাটিতে বড় কোনো আন্দোলন হবে না।
কিন্তু হেফাজতের বাধাপ্রদান সিলেটের এই বড় আন্দোলনে কোনোধরণের ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে ব্যার্থ হলো। ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্ট সিলেটে আলেম-জনতার নবীপ্রেমের ঐক্য হয়েই গেল। মিছিলের নগরীতে পরিণত হলো সিলেট শহর। ৪ নভেম্বর বুধবার সকাল থেকেই নবীপ্রেমী আলেম-জনতার উপস্থিতি সিলেটবাসীকে জাগিয়ে তোলে। জোহরের নামাজের পরে মিছিলে মিছিলে বিভিন্ন মাদরাসা থেকে কোর্ট পয়েন্টে হাজির হতে থাকে মাদরাসার ছাত্র, শিক্ষকসহ সকল শ্রেণীপেশার মানুষ।
৪ তারিখের সমাবেশে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল দুই ট্রাকের উপর ভ্রাম্যমাণ স্টেজ। যাদেরকে সিলেটের কথিত ঐক্যের ফেরিওয়ালারা বলে বেড়াত ‘ঐক্যের অন্তরায়’ বলে, সেদিন তাদের সরব উপস্থিতি এবং ঐক্যের ফেরিওয়ালাদের অনুপস্থিতি মানুষের চোখ খুলতে সাহায্য করেছে। মাওলানা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী, মাওলানা নুরুল ইসলাম সুনামগঞ্জী, মাওলানা আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী, মাওলানা ইউসুফ শ্যামপুরী প্রমুখের মত মুরব্বি আলেমদের চেহারাগুলোই দেখা গেছে সমাবেশের পুরো সময় ধরে। তরুণ আলেমদের স্টেজে চেহারা প্রদর্শনের হিড়িক একবারের জন্যও চোখে পড়েনি, চোখে পড়েনি মাইক নিয়ে টানাটানির মত ঘৃন্যদৃশ্যও। মঞ্চের এক পাশ থেকে এতো সুন্দর স্টেজ পরিচালনা মনে হয় সিলেটে এটাই প্রথম।
খলীফায়ে ফিদায়ে মিল্লাত, আল্লামা আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী সাহেবের বক্তব্য ছিলো এই ঐক্যমঞ্চের বিশেষ আকর্ষণ
সবচেয়ে বড় কথা, রাসূলপ্রেমের এই মাহফিলে নবীজীর কোন সমালোচকের প্রসঙ্গই প্রতিবাদ করা থেকে বাদ পড়েনি। যেভাবে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপ্রধানের সমালোচনা হয়েছে, সেভাবে সমালোচনা হয়েছে জামায়াতে ইসলামীরও। যেটা হেফাজত বা সমমনার মঞ্চ থেকে করা হয় না সাধারণত। খলীফায়ে ফিদায়ে মিল্লাত, আল্লামা আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী সাহেবের বক্তব্য ছিলো এই ঐক্যমঞ্চের বিশেষ আকর্ষণ। তিনি বলেন, ফ্রান্স সরকার নবীজীর ব্যাঙ্গচিত্র প্রদর্শন করায় আমরা যেভাবে এর বিরুদ্ধে একমঞ্চে এসেছি, ঠিক সেভাবেই নবীদের মাসুমিয়াত-নিষ্পাপ হওয়াকে অস্বীকারকারী জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধেও আমাদের এক মঞ্চে দাঁড়াতে হবে। এক বাতিলের বিরোধিতা করতে গিয়ে আরেক বাতিলকে সাথে রাখলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। তিনি সমস্ত ইসলামী দলকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছেড়ে ঐক্যবন্ধ হওয়ার আহবানও করেন।
সমাবেশের শেষ পর্যায়ে মাওলানা মুশতাক আহমদ খান সাহেবও আল্লামা দুর্লভপুরী সাহেবের কথায় সংহতি প্রকাশ করেন। মঞ্চ থেকে জামায়াতে ইসলামীর ইসমতে আম্বিয়া, আদালতে সাহাবা বিরোধি আকীদার সমালোচনা করেন।
সমাবেশ শেষে এক বিশাল মিছিল নিয়ে পথে নামেন আলেম-জনতা। আম্বরখানা পয়েন্টে গিয়ে সমাপ্তি ঘটে এই মহতি মাহফিলের। সিলেটের বুকে রচিত হয় নবীপ্রেমের এক নতুন ইতিহাস।
লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক


