- হাফেজ মাওলানা আরিফ বিল্লাহ
১১ জানুয়ারি ২০২৫। শনিবার রাত নয়টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশনে দাঁড়িয়েছিলাম দুই বন্ধুর মেলবন্ধনে আবদ্ধ হতে। সাড়ে ১১টার রেল আসলো সাড়ে বারোটায়। তবু ক্লান্তি নেই। স্বপ্নের ফানুস যেন আরো স্ফীত হতে লাগলো। অপেক্ষার প্রহর যে মধুময়ও হয় তা একজন স্বপ্নচারী ছাড়া আর কেউ অনুমান করতে পারবে না।
বন্ধুবর মাওলানা মুফতি তামিমুল ইসলাম ফরিদী ও মাওলানা নূরুদ্দীন জামালীর সাথে বন্ধুত্বের কোন বন্ধ্যাত্ব নেই। প্রতিনিয়তই তাজা রঙে রঙিন হচ্ছে। সিনিয়র আর জুনিয়রের মিলনমেলা হলেও আবেগ,অনুভূতির কোন ফারাক নেই। রুচি বৈচিত্র্যেও কোন খেদ নেই। জামিয়া ইকরা থেকে ফারাগাতের এত বছর পরও আমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা অকৃত্রিম ও পেলবময়। প্রায়শই একত্রিত হই। মুঠোফোনে খুনসুটিতে মাতি তিনজনে। আমাদের কর্মের স্পৃহা আর বড় হুজুরের প্রতি নিবিড় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাজুয্য আছে সমানতালে।
জামিআ ইকরার ২০২২ সালের ফুজালা সম্মেলনের পুরো দায়িত্ব ছিলো এই তিনের উপর। মাওলানা নূরুদ্দীন ভাইয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম আর মুফতি তামিম ভাইয়ের মেধা আর মেহনতের বিনিময়ে আমরা ফুযালা সম্মেলনটা সফল করলাম। দিনভর আসাতিজায়ে কেরামদের নসিহা আর দুআয় কাটালাম। শেষ সময়ে মানুষ গড়ার কারিগর আমাদের বড় হুজুর শাইখুল ইসলাম আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. আমাদেরকে অনেক দুআ দিলেন। নিজে কাঁদলেন, আমাদেরও কাঁদালেন। সেই থেকে আমাদের তিনের সমন্বয়। মুহসিন উস্তাদ মাওলানা আরীফ উদ্দীন মারুফ দা.বা. সহ সকল উস্তাযে মুহতারামদের কাছেও এই নামেই পরিচিত হয়ে গেলাম। জামিআ ইকরার নতুন-পুরাতন তুলাবাদের কাছেও পরিচিতি পেলাম ত্রিরত্ন রুপে। সবই খোদা তায়ালার কৃপা। বড়দের দোয়া আর ছোটদের ভালোবাসা। ওয়ালিল্লাহিল হামদ্।
প্রতি ইংরেজি মাসের শেষ বৃহস্পতিবার আমাদের একটা মিলন ঘটে জামিআ ইকরার আঙিনায়। বড় হুজুরের মাসিক শবগুজরির অনুষ্ঠানে। সেখানে জিকিরের মজলিশ হয়। তার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের তিনজনের নানা কিছুর ফিকিরও হয়। ফিকির অনেক ব্যাপ্ত। যেন আকাশের মতো ছড়াতে পাড়ি আর চাঁদের মতো বিলাতে পারি।
হাঁটি হাঁটি পা পা করে ২০২২ থেকে ২০২৫ এ এলাম। আজ পূর্বাঞ্চলে যাবো তিন দিনের সফরে। তারা দুজন উঠলেন ঢাকা থেকে। আমি উঠলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। আবারো তিনজনে একত্রিত হলাম স্বপ্নের ত্রিমোহনায়। ইচ্ছা কিছু করার। স্বপ্ন কিছু বুনার।
গোলাপ হয়ে জন্ম নেইনি। তাতে কী? গাঁদা ফুল দিয়েও তো মালা গাঁথা যায়। সেই পথেই হাঁটছি আমরা তিন স্বপ্নচারী। মানুষ অসীম শক্তি নিয়ে জন্মে, কিন্তু অপার স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে। স্বপ্নই শক্তিকে বাঁচায়। আমরা দুনিয়ার পথে যেন দ্বীনিয়াতের সাথে থাকতে পারি। আর দ্বীনের সাথে যেন দুনিয়াকে ব্যবহার করতে পারি। সে ভাবেই আমাদের যাত্রা সাজিয়েছি। ওয়াল ইতমামু মিনাল্লাহ।
দ্বীনকে বুলন্দিয়াতের সাথে দুনিয়াকে অর্জন করার নমুনা বড় বড় সাহাবীদের মাঝেও পাওয়া যায়। রাসূল সা. এর সাহাবীদের মাঝে দ্বীনি খিদমতের অনেক বৈচিত্রতা পাওয়া যায়। দিল নরমের চিত্র যেমন পাওয়া যায়। দ্বীনের জন্য কঠোরতম হুঙ্কারও দেখা যায়। সাদেগী জিন্দেগীর পাশাপাশি বদান্যতার উপমাও দেখা যায়। তারা তো রঙ ধরেছিলেন পেয়ারে হাবিবের রঙ থেকে। কেননা রাসূলে আরাবী সা. দ্বীনকে আল্লাহর রঙে পূর্ণতা দিয়েছেন। আর আল্লাহর রঙের চেয়ে উত্তম কোন রঙ তো আর কোথাও নেই।
আমরা সেই রঙেই আমাদের জীবন, পরিবার ও সমাজিক আয়োজনকে সাজাতে চাই। বড়দের পদচিহ্নের ধুলি ধরে পথ পাড়ি দিতে চাই। আমরা এসেছি স্বপ্নের ভাউচার নিয়ে ঐতিহ্যের পদচিহ্ন খুঁজতে। এসেছি বীর চট্রলায় আর বণিক পাড়া সমুদ্র তীরে। এখানের অলিগলিতে ঘুরেছি। সাগরের বিশালতার ছাপ নিয়েছি। সূর্য ডুবার সাক্ষী হয়ে জ্বলে উঠার সবক নিয়েছি। ফিরে এসেছি; কিন্তু বারবার যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছি। সাময়িক আলবিদা বীর চট্রলা! আবারো ফিরে আসবো হে সাগরকণ্যা।
লেখক ও প্রাবন্ধিক,
ফারেগীন, জামিয়া ইকরা বাংলাদেশ ঢাকা।


