১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৮ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

স্মৃতির পাতায় বদরযুদ্ধের প্রান্তর

আমিনুল ইসলাম কাসেমী 

বেশ কয়েকবার হজ্জ-ওমরার সফরে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু বদর প্রান্তরে যাওয়া হয়নি। মদীনা শরীফে গেলে ওহুদ যুদ্ধের ময়দানে এবং যেখানে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, সে সব জায়গাতে সব সময় যাওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু বদরের প্রান্তরে যাওয়া হয় না। ইচ্ছে থাকলেও সময় হয় না। কেননা বদরের সেই যুদ্ধের ময়দান মদীনা শরীফ থেকে আশি মাইল তথা ১২০ কিলোমিটার দুরে। এই দুরত্বের কারণে সেখানে যাওয়া হয় না। তাছাড়া হজ্জের সময় এত দুরত্বের সফরে হাজী সাহেবদের যাওয়ার অনুমতি থাকে না।

তবে বদরের ময়দানে যাওয়ার জন্য মনটা ছটফট করে যাচ্ছিল বহুদিন ধরে। মনে চায় একটু ঘুরে দেখে আসি। কোথায় বদরের যুদ্ধ হয়েছিল। কোথায় সংঘটিত হয়েছিল সেই ইসলামের প্রথম যুদ্ধ। আমার পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে প্রথম যুদ্ধ। যে যুদ্ধে আল্লাহর খাছ রহমত নাজিল হয়েছিল সাহাবায়ে কেরামের উপর। সাহাবাগণ ছিল অতিশয় দুর্বল, তারপরেও তাঁরা আল্লাহর মদদে বিজয় লাভ করেছিল। তাছাড়া শুহাদায়ে বদরের মাকবারা যিয়ারত করার স্বপ্ন ছিল। যে সব বীর সাহাবী বদরের যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, তাদের মাযার দেখার জন্য মনটা বারবার চাইছিল।

২০১৩ সনের ফেব্রুয়ারী মাসের দিকে ওমরার সফরে গেলাম। তখন আমাদের জামাতে সফরে ছিলেন, প্রিয় উস্তাদ, জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ মাদ্রাসার শায়খুল হাদীস আল্লামা জাফর আহমাদ সাহেব দামাতবারাকাতুহুম। মক্কার ওমরার কাজ সম্পন্ন করার পর মদীনা শরীফে গেলাম। মদীনা শরীফে যাওয়ার পর আমাদের সাথে সাক্ষাত করতে আসলেন, আমাদের রাজবাড়ী গোয়ালন্দের কয়েকজন যুবক। যারা নাকি বদরে থাকেন। এবং বদরের যুদ্ধ যেখানে সংঘটিত হয়েছিল তার পাশেই তারা বসবাস করেন।

সেই সব যুবকেরা আমাদেরকে দাওয়াত করল তাদের বদরের বাসাতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য। আমাদের রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ টেক্সটাইল মিলের এমডি আলহাজ্জ নজির উদ্দীন আহমেদ সাহেবও সেই সফরে ছিলেন। ঐ যুবকেরা নজির উদ্দীন সাহেবের অনেক কাছের লোক। তারা আমাদের জামাতের সকলকে বারবার অনুরোধ জানাতে লাগল। আমরা যেন তাদের দাওয়াত গ্রহণ করি।

আমাদের উস্তাদ মাওলানা জাফর সাহেবের নেতৃত্বে সাতজন রওয়ানা হলাম বদরে। মদীনার মসজিদে নববীতে আসরের নামাজ আদায় করার পর গাড়ীতে চেপে বসলাম। মানুষ সাতজন কিন্তু গাড়ী দুইটা। দুটোই প্রাইভেট গাড়ী। দু গাড়ীতে সাতজন ভাগাভাগি করে বসলাম।

আমি খেয়াল করতে লাগলাম, গাড়ী কোন রোড দিয়ে যায়। মদীনা শহর থেকে বের হয়ে মক্কার হাইওয়েতে উঠে যুলহুলায়ফা মসজিদ পার হয়ে মক্কার হাইওয়ে থেকে ডানের রাস্তা ধরল। কিছুদুর যাওয়ার পর চেকপোষ্ট। তবে সেখানে কোন বিড়ম্বনা পোহাতে হল না। নিমিষেই যেন চেক পয়েন্ট পার হয়ে গেলাম।

গাড়ী বদরের দিকে ছুটে চলেছে। এখন আর শহরের কোন লেশ নেই। পাহাড় আর মরুভুমি। কোন বাড়ী ঘর দেখা যায় না। মাঝে মাঝে কোথাও পেট্রলপাম্প, রেষ্টু্রেন্ট এবং মসজিদ নজরে পড়ে। এছাড়া আর কিছু দেখা যায় না।

এক ঘন্টা গাড়ী চলার পর আমরা বদর শহরে পৌছালাম। বদর এখন একটা বড় শহর। আমাদের দেশের জেলা শহরের মত বড় হবে। তবে শহর বেশ সাজানো-গোছানো। দেখতে খুব ভাল লাগল। শহরের বিভিন্ন জায়গায় গাড়ী দিয়ে আমাদের ঘোরানো হল। আমরা গাড়ীতে বসে বসে সব দেখলাম।

অবাক হলাম শহরের কিছু দৃশ্য দেখে। যেগুলো আর কোন শহরে দেখি নি। এমনকি সৌদি আরবের অন্যন্য শহর গুলোতে এমন দৃশ্য নজরে পড়ে না। সে আজব দৃশ্য হলো, বদর শহরের বিভিন্ন জায়গাতে, ভাঙ্গা গাড়ী, ভাঙ্গা মোটর সাইকেল শো করা রয়েছে। আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না, কি ব্যাপার? শহরের মোড়ে এরকম ভাঙ্গা গাড়ীগুলো কেন রাখা হয়েছে? এমন সুন্দর একটা শহরের মোড়ে মোড়ে এমন ভাঙ্গা গাড়ী এবং ভাঙ্গা মোটর সাইকেল লটকিয়ে রাখার সার্থকতা কি?

সঙ্গে থাকা সেই যুবক ভাইদের কাছে এর রহস্য জিজ্ঞেস করলাম, তারা বলল, স্থানীয় অনেক উঠতি বয়সের যুবকেরা বেপরোয়া গাড়ী চালায়। কেউ আনলিমিটেড মোটর সাইকেল চালায়ে হতাহত হয়ে থাকে। যে কারণে স্থানীয় প্রশাসনের লোকেরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ঐ ভাঙ্গা গাড়ি লটকিয়ে রেখেছে। তারা বোঝাতে চায়, বেপরোয়া গাড়ী চালানোর পরিণাম অনেক ভয়াবহ। এজন্য যুবকেরা যেন ওর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এবং সতর্ক থাকতে পারে। বড় ভাল লেগেছিল স্থানীয় ট্রাফিক বিভাগের এমন কর্মসুচি। যারদ্বারা তারা অনেক এ্যাকসিডেন্ট এর হার কমে গেছে। সেখানকার যুব সমাজ সতর্ক হয়েছে।

যাই হোক, গাড়ী দিয়ে আমরা শহরের এক প্রান্তে যেখানে বদরের ময়দান, সেখানে গিয়ে পৌছালাম। বদর ময়দানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা আছে, যেটার নাম মসজিদে আরীছ। আমরা সরাসরি মসজিদে আরীছে চলে গেলাম। সেখানকার ইমাম একজন বাঙালী। অবশ্য ওপারের বাঙালী। বাংলাদেশী নয়। তিনি আমাদের অর্ভ্যথনা জানালেন। ইমাম সাহেবই আমাদেরকে বদরের প্রান্তরের সব কিছু বর্ননা করলেন। এবং তিনি সব ঘোরায়ে দেখালেন।

যুদ্ধের সময়।কোথায় ছিল মুসলিম বাহিনী, কোথায় কাফের বাহিনী। মুসলিমদের জায়গা প্রাথমিক পর্যায়ে ভাল স্হান ছিল না, বালু এবং ধুলো মেশানো। যেটা বাতাসে চোখে মুখে লাগছিল। আর কাফেরদের স্হান ছিল মাটির। সেখানে কোন বালু উড়ছিল না। তাদের জন্য সুবিধাজনক ছিল। কিন্তু তখন বৃষ্টি হল। বৃষ্টি হওয়াই ছিল মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে গায়েবী সাহায্য। বৃষ্টির পানিতে বালুগুলো জমে সুন্দর হাঁটা চলার পরিবেশ হল।পক্ষান্তরে বৃষ্টিতে কাফেরদের সেই মাটির জায়গা কাদায় ভরে গেল।পিচ্ছিল হয়ে গেল। ওরা শুধু কাদার ভিতরে নিজেরা আছাড় খেতে লাগল।

সব জায়গা আমাদেরকে তিনি দেখালেন। বিস্তারিত ইতিহাস তিনি রেফানেন্স সহ শোনালেন। তবে গা শিউরে উঠল, যখন গেলাম শোহাদায়ে বদরের মাকবারতে। আহ, একদম যেন শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেল। সে ইতিহাস চোখে ভেসে উঠল। কত মোজাহাদা ছিল। কত কোরবানী তারা করেছেন। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ। মুসলমান ছিল খালিহাত। আর ওরা সশস্ত্র। কিন্তু মুসলিমদের ঈমানী শক্তির কাছে সব মিটে গিয়েছিল। চরম বিপর্যয় নেমে আসে কাফেরদের। যেটা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ওলাকাদ নাসারাকুমুল্লাহু বি বাদরিউ ওয়া আনতুম আজিল্লাহ’। ‘আমি তোমাদের বদরের প্রান্তরে সাহায্য করেছিলাম,অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল।’

আরও পড়ুন: এই ক্রান্তিকালে আমাদের মুরুব্বী কে?

আল্লাহতায়ালা মুমিন দের সাহায্য করেছিলেন। তাদের ঈমানী শক্তি ছিল প্রখর। তারা যেন ঈমানী শক্তি দিয়ে বদর জয় করেছিলেন। শোহাদায়ে বদরের সেই মাকবারাতে একটি বড়আকারে ফলক দেখতে পেলাম। যে ফলকের উপরেই কোরআনের উপরক্ত আয়াত ( ওলাকাদ নাসারাকুমুল্লাহ। ) লিখে এরপরে বদরের শহীদদের নাম লেখা রয়েছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম সেই ফলকের দিকে। আর যেন চিন্তার সাগরে ডুবে গিয়ে ছিলাম। আহ, কত সৌভাগ্যবান তারা। বদরের যুদ্ধে যারা শরীক হয়েছিল, সকলকেই আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আবার যারা শহীদ হয়েছিল, তাদের মর্য্যাদা তো আরো অনেক উপরে। জান্নাতের মধ্যে সুউচ্চ মাকাম লাভ করবে তারা।

আসুন! আমাদের ঈমানী শক্তিকে মজবুত করি।দ্বীন ইসলামের উপর অটল-অবিচল থাকি। পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শে উজ্জীবিত হই। আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com