১৯শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

হযরত ঈসা আলাইহিস সালামঃ আমাদের নবী

মাহতাব উদ্দীন নোমান

 

আমাদের নবী হযরত ঈসা (আ.)

আল্লাহ তাআলা হযরত আদম (আ.) থেকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সময়ে আগত সকল নবী-রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করাকে ঈমানের মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন –

“রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে তার কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও। সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং তার পয়গম্বরগণে প্রতি। তারা বলে, আমরা তার পয়গম্বরগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার কাছে ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।”

– সূরা বাকারাঃ ২৮৫

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রায় ৫৭০ বছর পূর্বে শাম বা সিরিয়াতে বনী ইসরাইলের সর্বশেষ নবী হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের আবির্ভাব ঘটে। মুসলিমগণ হযরত ঈসা (আ.) এর নবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপন ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। হযরত ঈসা (আ.)-কে নবী হিসেবে বিশ্বাস না করে কোনো মুসলিমই পরিপূর্ণ মুসলিম হতে পারবে না। তিনি আল্লাহ তাআলার প্রেরিত রাসূল, পাশাপাশি তাঁকে ইঞ্জিল কিতাব দান করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে –

“মারিয়ম-তনয় মসীহ্ রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তার পূর্বে অনেক রাসূল অতিক্রান্ত হয়েছেন। আর তার জননী একজন ওলী। তারা উভয়েই খাদ্য ভক্ষণ করতেন।”

– সূরা মায়েদাঃ ৬৭

অলৌকিক জন্মগ্রহণ ছিলো সময়ের দাবি

যখন যে অঞ্চলে যে বিষয়ের আধিক্য ও উৎকর্ষ থাকে, তখন সে অঞ্চলে সে বিষয়ে সর্বোচ্চ ব্যুৎপত্তি দান করে আল্লাহ তাআলা নবী প্রেরণ করতেন। যেমন, হযরত মূসা (আ.)-এর সময় মিসরে ছিল জাদুবিদ্যার আধিক্য। ফলে আল্লাহ তাঁকে লাঠির মুজিযা দিয়ে পাঠালেন। সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে আরবরা ভাষা ও সাহিত্যের সর্বোচ্চ অলংকারে ভূষিত ছিল, ফলে কুরআন তাদের সামনে হতবুদ্ধিকারী ভাষা নিয়ে মুজিযা রূপে নাযিল হয়। অনুরূপভাবে হযরত ঈসা (আ.)-এর সময়ে শাম বা সিরিয়া অঞ্চল ছিল চিকিৎসা বিদ্যায় সেরা। একারণে হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা ও মুজিযাসমূহ দিয়ে পাঠান। এমনকি তাঁর জন্মটাও ছিল জীববিজ্ঞানের বিপরীতে এক জীবন্ত মুজিযা। তাঁর পূন্যবতী মা হযরত মারইয়াম দুনিয়ার স্বাভাবিক গর্ভধারণ পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে তাঁকে গর্ভে ধারণ ও জন্মদান করেন। তাঁর জন্মকাহিনী পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে –

“এই কিতাবে মারইয়ামের কথা বর্ণনা করুন, যখন সে তার পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল। অতঃপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য সে পর্দা করল। অতঃপর আমি তার কাছে আমার রূহ প্রেরণ করলাম, সে তার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল।

মারইয়াম বলল, আমি তোমার থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি যদি তুমি আল্লাহ ভীরু হও।

সে বলল, আমি তো শুধু তোমার পালনকর্তা প্রেরিত, যাতে তোমাকে এক পবিত্র পুত্র দান করে যাব।

মারইয়াম বলল, কিরূপে আমার পুত্র হবে, যখন কোন মানব আমাকে স্পর্শ করেনি এবং আমি ব্যভিচারিণীও কখনও ছিলাম না।

সে বলল, এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলেছেন, এটা আমার জন্য সহজসাধ্য এবং আমি তাকে মানুষের জন্য একটি নিদর্শন ও আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ করতে চাই। এটা তো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার।

অতঃপর তিনি গর্ভে সন্তান ধারণ করলেন এবং তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলেন। প্রসব বেদনা থাকে এক খেজুর বৃক্ষ মূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করলো। তিনি বললেন, হায়, আমি যদি কোনরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম।

অতঃপর ফেরেশতা তাকে নিম্ন দিক থেকে আওয়াজ দিলেন যে, তুমি দুঃখ করো না। তোমার পালনকর্তা তোমার পায়ের তলায় একটি নহর জারি করেছেন। আর তুমি নিজের দিকে খেজুর গাছের কান্ডে নাড়া দাও, তা থেকে তোমার উপর পাকা খেজুর পতিত হবে।

এখন আহার করো, পান করো এবং চক্ষু শীতল করো। যদি মানুষের মধ্যে কাউকে তুমি দেখো, তবে বলে দিও, আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে রোজা মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন মানুষের সাথে কথা বলবো না।

অতঃপর তিনি সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলেন। তারা বলল, হে মারইয়াম! তুমি একটি অঘটন ঘটিয়ে বসেছ। হে হারুন-ভগ্নি, তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিলেন না এবং তোমার মাতাও ছিলেন না ব্যভিচারিণী।

অতঃপর তিনি হাতে সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করলেন। তারা বলল, যে কোলের শিশু তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব ?

সন্তান বলল, আমি তো আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে। এবং জননীর অনুগত থাকতে এবং আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করবো এবং যেদিন পুনরুজ্জ্বীবিত হয়ে উত্থিত হবো।

এ-ই মারইয়ামের পুত্র ঈসা। সত্য কথা, যে সম্পর্কে লোকেরা বিতর্ক করে। আল্লাহ এমন নন যে, সন্তান গ্রহণ করবেন, তিনি পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, তিনি যখন কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন একথাই বলেন, ‘হও’ এবং তা হয়ে যায়।

তিনি আরো বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার পালনকর্তা ও তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তার এবাদত করো। এটি সরল পথ। অতঃপর তাদের মধ্যে দলগুলো পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করল। সুতরাং মহাদিবস আগমনকালে কাফেরদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।”

– সূরা মারইয়ামঃ ১৬-৩৭

চিকিৎসা-বিজ্ঞান ব্যার্থ করে দেয়া তাঁর মুজিযা

হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্মগ্রহণই কেবল নয়, তাঁর নবুওয়াতের বড় একটি অংশ ছিলো জাগতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিপরীতে আল্লাহ তাআলার অপার কুদরত ও মহিমা উম্মতের সামনে তুলে ধরা। তাঁর জন্ম ও জন্ম-পরবর্তী মুজিযা সমূহ নিয়ে সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ তাআলা বলেন –

“স্মরণ করুন, যখন ফেরেশতাগণ বললো, হে মারইয়াম আল্লাহ তোমাকে তাঁর এক বানীর সুসংবাদ দিচ্ছেন, যার নাম হলো মসীহ-মারইয়াম তনয় ঈসা, দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি মহাসম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভূক্ত। আর তিনি মায়ের কোলে ও বয়োঃপ্রাপ্ত অবস্থায় মানুষের সাথে কথা বলবেন এবং তিনি হবেন সৎকর্মশীলদের একজন।

তিনি বললেন, পরওয়ারদেগার! কেমন করে আমার সন্তান হবে; আমাকে তো কোন মানুষ স্পর্শ করেনি।

(আল্লাহ) বললেন, এ ভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যখন কোন কাজ করার জন্য ইচ্ছা করেন তখন বলেন যে, ‘হয়ে যাও’ অমনি তা হয়ে যায়।

আর তাকে তিনি শিখিয়ে দেবেন কিতাব, হিকমত, তওরাত, ইঞ্জিল। আর বনী ইসরাঈলদের জন্যে রাসূল হিসেবে তাকে মনোনীত করবেন। তিনি বললেন নিশ্চয়ই আমি তোমাদের নিকট তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে এসেছি নিদর্শনসমূহ নিয়ে।

আমি তোমাদের জন্য মাটির দ্বারা পাখীর আকৃতি তৈরী করে দেই। তারপর তাতে যখন ফুৎকার প্রদান করি, তখন তা উড়ন্ত পাখিতে পরিণত হয়ে যায় আল্লাহর হুকুমে। আর আমি সুস্থ করে তুলি জন্মান্ধকে এবং শ্বেত কুষ্ঠ রোগীকে। আর আমি জীবিত করে দেই মৃতকে আল্লাহর হুকুমে। আর আমি তোমাদেরকে বলে দেই যা তোমরা খেয়ে আসো এবং যা তোমরা ঘরে রেখে আসো। এতে প্রকৃষ্ট নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা মুমিন হও।”

– সূরা আলে ইমরানঃ ৪৫-৪৯

উপরোক্ত আয়াতগুলো থেকে আমরা হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে অনেকগুলো বিষয় জানতে পারলাম। যেমন, তিনি  দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়ম বহির্ভূতভাবে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর নাম রাখেন মসীহ ঈসা রূপে। তিনি শয়তানের অনিষ্টকারিতা হতে মুক্ত ছিলেন। দুনিয়া ও আখেরাতে তিনি ছিলেন মহাসম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহর একান্ত প্রিয়জনদের অন্যতম। তিনি মাতৃক্রোড়ে থেকেই সারগর্ভ বক্তব্য রাখতেন। তিনি বনী ইসরাঈলের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে কিতাব, হিকমত, তওরাত, ইঞ্জিল শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর মুজিযা সমূহের মধ্যে ছিল :-

  • তিনি মাটির তৈরী পাখিতে ফুঁ দিলেই তা জীবন্ত হয়ে উড়ে যেত
  • তিনি জন্মান্ধকে চক্ষুষ্মান ও কুষ্ঠ রোগীকে সুস্থ করতে পারতেন
  • তিনি মৃতকে জীবিত করতে পারতেন
  • তিনি বলে দিতে পারতেন মানুষ বাড়ি থেকে কী খেয়ে এসেছে এবং ঘরে কী সঞ্চিত রেখে এসেছে

এছাড়াও তিনি আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন –

“স্মরণ করুন, যখন মারইয়াম-তনয় ঈসা (আঃ) বললঃ হে বনী ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, আমার পূর্ববর্তী তওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আগমন করবেন। তাঁর নাম আহমদ। অতঃপর যখন সে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বললঃ এ তো এক প্রকাশ্য যাদু।”

 – সুরা সাফঃ ৬

এখন প্রশ্ন হলো, মুসলমান ও খ্রিষ্টান উভয় ধর্মাবলম্বীরাই যদি হযরত ঈসা (আ.)-কে ভালোবাসে ও সম্মান করে, তাহলে এই দুই ধর্মের মাঝে পার্থক্য কোথায়?

শেষ পর্ব : ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মঃ বিশ্বাসের নিক্তিতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম

লেখক : শিক্ষক ও খতীব

“আল্লাহ তাআলা মানুষকে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন। এসবের মাঝে একটি বড় নেয়ামত হলো সন্তান। এ নেয়ামতের মূল্য অনূভুত হয় নবীদের কাছ থেকেই। তাঁদের সন্তান না হলে আল্লাহর কাছে এ নেয়ামত প্রার্থনা করেছেন”
পড়ুনঃ সন্তানের জন্মে পরিবারের দায়িত্বঃ ইসলামী দিকনির্দেশনা

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২২ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com