হাদিস চর্চার উচ্চতর অধ্যায়ের পথে নতুন সংযোজন

হাদিস চর্চার উচ্চতর অধ্যায়ের পথে নতুন সংযোজন

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ইলমের পথ কখনো ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি ধারাবাহিকতা, আদব ও আমানতের স্রোত। আকাবিরদের রেখে যাওয়া সেই স্রোতই কখনো শিষ্যের কণ্ঠে, কখনো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে নতুন করে প্রবাহিত হয়। তেমনই এক চিন্তাশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ ইলমি সেমিনার অনুষ্ঠিত হলো আজ বুধবার, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬— বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান, সাইয়্যিদ মাওলানা আসআদ মাদানী (রহ.)–এর খলীফা, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত দেশের অন্যতম প্রসিদ্ধ দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিআ ইকরা বাংলাদেশ এর তত্ত্বাবধানে তাখাসসুস ফী উলূমুল হাদিস বিভাগ উদ্বোধনের প্রাক্কালে আয়োজিত মতবিনিময় সভায়। হাদিসচর্চার পাঠ্যসূচি, পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষাবর্ষের মেয়াদকালকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই সভা ছিল মূলত ইলমি দৃষ্টিভঙ্গি ও মানহাজ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

দারুল উলুম দেওবন্দের উলূমুল হাদিস বিভাগের প্রধান আল্লামা আব্দুল্লাহ মারুফী সাহেব এর বাংলাদেশে অবস্থানরত বহু শিষ্য ও অনুসারী আলেমের সক্রিয় অংশগ্রহণে মজলিসটি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। তাঁদের বক্তব্য, ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে যেন প্রতিফলিত হচ্ছিল দেওবন্দি ইলমি পরম্পরার সেই সুগভীর ছায়া।

এই ইলমি মজলিসের সভাপতির আসন অলংকৃত করেন জামিআ ইকরার সম্মানিত রঈস আল্লামা আরীফ উদ্দীন মারুফ। তাঁর স্বাগত বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সভার রূহ ও উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ইলমের মজলিস এটা আকাবিরদের সুন্নত। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন আকাবিরদের সেই চিরায়ত রীতি— “সুন্নাতুল আকাবীর মুজাকারাতুল ইলম”—অর্থাৎ ইলম নিয়ে আলোচনা ও পরামর্শ করা ছিল আমাদের পূর্বসূরি মনীষীদের অভ্যাস ও ঐতিহ্য। আজকের এই সভাও সেই ধারাবাহিকতারই একটি বাস্তব উদাহরণ।

বাংলাদেশে উলূমুল হাদিস চর্চার ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, নব্বইয়ের দশকে প্রথম বসুন্ধরা এলাকায় এই উচ্চতর হাদিসচর্চার সূচনা হয় এবং পরবর্তীতে মারকাযুদ দাওয়াহসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা বিস্তৃত আকার ধারণ করে। ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে তাখাসসুস পর্যায়ের হাদিস শিক্ষা কার্যক্রম। এই ধারাবাহিকতায় জামিআ ইকরা বাংলাদেশের তাখাসসুস ফী উলূমুল হাদিস বিভাগ একটি সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল সংযোজন।

হাদিসচর্চার উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লামা আরীফ উদ্দীন মারুফ অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য সালাফে সালেহিন ও আকাবিরদের মানহাজকে সামনে রেখে হাদিস চর্চা করা। এই চর্চার উদ্দেশ্য তাঁদেরকে রদ করা বা তাঁদের ওপর আপত্তি তোলা নয়; বরং তাঁদের ইলমি অবদানকে সমর্থন করা, তাঁদের মতামতকে আরও সুদৃঢ় ও প্রমাণসমৃদ্ধ করা। এই কথাগুলো যেন পুরো তাখাসসুস কার্যক্রমের নৈতিক ভিত্তি নির্ধারণ করে দেয়।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত উলামায়ে কেরামগণ তাঁদের মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ পেশ করেন। উপস্থিত ছিলেন মাওলানা আব্দুর রহমান নাঈম কাসেমী দা. বা. (উস্তাদ, দারুল উলুম মিরপুর-১৩, ঢাকা), মাওলানা যাকারিয়্যা কাসেমী দা. বা. (পরিচালক, মাদরাসা দারুল উলুম আমীন বাজার, ঢাকা), মাওলানা মুফতী আমীনুর রহমান কাসেমী দা. বা. (মুহাদ্দিস, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ), মাওলানা ফখরুল ইসলাম কাসেমী দা. বা. (মুহাদ্দিস, চৌধুরী পাড়া মাদরাসা), মাওলানা যায়েদ মুস্তাকিম কাসেমী দা. বা., মাওলানা আবু সাদেক কাসেমী দা. বা. (মুশরিফ, তাখাসসুস ফিল হাদিস, মারকাযুল ফিকরিল ইসলামী বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা), মুফতী মুঈনুল ইসলাম কাসেমী দা. বা. (শায়খুল হাদিস, জামিয়াতুল মুহাজিরীন ও প্রধান মুফতি রউজাতুল উলুম, উত্তরা, ঢাকা) এবং মাওলানা মুফতী আব্দুল্লাহ মামুন কাসেমী দা. বা. (পরিচালক, মারকাযু দিরাসাহ আল ইসলামিয়্যাহ, কাজীপাড়া, মিরপুর, ঢাকা)।

বক্তারা তাখাসসুস ফী উলূমুল হাদিস বিভাগের সিলেবাস প্রণয়ন, পাঠদানের পদ্ধতি, গবেষণাভিত্তিক অধ্যয়ন ও শিক্ষাবর্ষের মেয়াদকাল নিয়ে তাঁদের সুচিন্তিত মতামত উপস্থাপন করেন। আলোচনায় বারবার গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়—এই বিভাগ যেন কেবল সনদ অর্জনের জায়গা না হয়ে ওঠে; বরং তা হয়ে ওঠে আদব, গভীরতা ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন মুহাদ্দিস গড়ে তোলার এক ইলমি ক্ষেত্র।

সবশেষে সম্মিলিত দুআর মাধ্যমে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। দুআয় আল্লাহ তায়ালার দরবারে কামনা করা হয়—এই তাখাসসুস কার্যক্রম যেন বাংলাদেশের হাদিসচর্চাকে আরও বিশুদ্ধ, সুসংগঠিত ও আকাবিরদের মানহাজভিত্তিক করে তোলে।

এই মতবিনিময় সভা স্পষ্ট করে দিয়েছে—জামিআ ইকরা বাংলাদেশের তাখাসসুস ফী উলূমুল হাদিস বিভাগ কেবল একটি একাডেমিক উদ্যোগ নয়; এটি ইলমের আমানত বহনের এক সচেতন প্রচেষ্টা, যেখানে কণ্ঠ নয়—চর্চা কথা বলবে, আর হাদিস শিক্ষা হবে সালাফের আলোয়, আকাবিরদের ছায়ায়।

Related Articles