পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : হারাম খাবার খেয়ে শরীর ও আত্মার সংশোধন সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেছেন জানেশীনে ফিদায়ে মিল্লাত, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি, ভারত উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক রাহবার, মাওলানা সায়্যিদ মাহমুদ আসআদ মাদানী।
আর রবিবার (১৬ নভেম্বর) রাজধানীর ইকরা ঝিল মসজিদ কমপ্লেক্সে শাইখুল ইসলাম আল্লাম ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ (দা. বা.) এর আহ্বানে আয়োজিত একদিনব্যাপী ইসলাহী ইজতেমার আখেরী মোনাজাতের পূর্বের বয়ানে এসব কথা বলেন তিনি।
শরীর ও আত্মার ব্যাপারে আলোচনা করতে যেয়ে মাওলানা মাহমুদ আসআদ মাদানী বলেন, মানুষ দুটি জিনিসের সমন্বয়ে গঠিত—একটি হলো শরীর বা দেহ এবং অন্যটি হলো রূহ বা আত্মা। শরীর একটি অস্থায়ী জিনিস, যা একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আত্মা লম্বা সময় ধরে চলবে। মৃত্যু মানে আত্মার শেষ নয়, বরং এক জগৎ থেকে অন্য জগতে স্থানান্তর বা ট্রান্সফার হওয়া।
তিনি একটি শক্তিশালী উদাহরণ দিয়ে বলেন, “যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার কাছ থেকে সবার আগে তার নামটি কেড়ে নেওয়া হয়। তখন কেউ বলে না যে অমুক সাহেব শুয়ে আছেন, বরং সবাই বলে ‘মৃতদেহ’ বা ‘লাশ’ পড়ে আছে। তাই এই নাম বা পদের অহংকার করে লাভ কী?” এই উপলব্ধি আমাদের জীবনের অর্থহীন অহংকার থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।
ইসলাহে নাফস বা আত্ম সংশোধন করার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে যেয়ে এই আধ্যাত্মিক রাহবার বলেন, শরীরের সংশোধনের প্রথম ধাপ হলো একে রোগ থেকে বাঁচিয়ে রাখা, আর এর জন্য জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা আনা অপরিহার্য। ঠিক সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠা এর অন্যতম প্রধান অংশ। আল্লাহ আমাদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মাধ্যমে এই শৃঙ্খলার একটি চমৎকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, খাবারের অভ্যাস। আমাদের ছোট ছোট লোকমায় খাওয়া উচিত এবং একটি লোকমা ভালোভাবে চিবিয়ে শেষ না করে অন্যটি মুখে তোলা উচিত নয়।
হারাম খাবার খেয়ে শরীর ও আত্মার সংশোধন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের খাবার কোথা থেকে আসছে তা। হারাম খাবার খেয়ে শরীর ও আত্মার সংশোধন সম্ভব নয়। যেমন পেট্রোলের গাড়িতে যদি সামান্য পানিও মিশিয়ে দেন, গাড়িটি খিটখিট শব্দ করবে বা বন্ধ হয়ে যাবে। ঠিক তেমনি, আপনার জীবনও যদি হারাম দ্বারা মিশ্রিত হয়, তবে তা সঠিকভাবে চলবে না।” তাই খাবার হালাল হওয়া আবশ্যক।
আত্ম সংশোধনর উপায় বাতলে দিয়ে জানেশীনে ফিদায়ে মিল্লাত বলেন, আত্ম সংশোধনের প্রধান উপায় হলো আল্লাহর জিকির। তবে এই জিকিরের উদ্দেশ্য দুনিয়াবী কোনো লাভ হওয়া উচিত নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই এর মূল লক্ষ্য। দুনিয়াবী উপকারগুলো বোনাস হিসেবে পাওয়া যায়। জিকির কেবল মুখে বা আওয়াজ করে হয় না; এটি যখন মানুষের নিঃশ্বাসের সাথে মিশে যায়, তখন সে ঘুমের মধ্যেও জিকির করতে থাকে। কারণ শ্বাস-প্রশ্বাস তো ঘুমের মধ্যেও চলতে থাকে। এর আসল লক্ষ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য এমনভাবে অনুভব করা, যাতে মানুষ সর্বদা অনুভব করে যে আল্লাহ তার সঙ্গেই আছেন এবং তাঁর রহমতের ছায়ায় সে আছে।
তিনি আরো বলেন, আত্ম সংশোধনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘আচরণ’ বা চরিত্র ঠিক করা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যে তার পরিবারের কাছে শ্রেষ্ঠ।” আপনার আসল পরিচয় বাইরের মানুষ দেবে না, দেবে আপনার পরিবারের সদস্যরা। বাবা-মায়ের সাথে আপনার আচরণ কেমন? যদি আপনি তাদের জন্য ভালো হন, তবেই আপনি ভালো মানুষ।
তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “প্রত্যেক ফল পাকার পর মিষ্টি হয়, কিন্তু মানুষ এমন এক ফল, যে পেকে যাওয়ার পর (অর্থাৎ বৃদ্ধ বয়সে) তেতো হয়ে যায়।” বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা খিটখিটে হয়ে যেতে পারেন, কিন্তু তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করা এবং এমন আচরণ করা উচিত যেন তাদের অন্তর থেকে আপনার জন্য দোয়া বেরিয়ে আসে। একইভাবে স্ত্রী, সন্তান এবং ভাই-বোনদের সাথেও সুন্দর আচরণ করা জরুরি। ছোট বাচ্চাদের ভালোবাসা দিয়ে শেখানো উচিত, মারধর করে নয়, কারণ তাতে তাদের মনে কোরআন বা দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় না, বরং ভয় তৈরি হয়।
বয়ানের শেষ দিকে মাওলানা মাহমুদ আসআদ মাদানী বলেন, জীবনে শৃঙ্খলা এবং ভালো কাজগুলো নিয়মিত বা ধারাবাহিকভাবে করা উচিত। হঠাৎ একদিন খুব বেশি ইবাদত করে অন্যদিন ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়, বরং অল্প হলেও প্রতিদিন নিয়ম করে করা উচিত। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, কথা বলা এবং মানুষের সাথে আচরণ—সবকিছুতেই একটা নিয়ম মেনে চললে শরীর ও আত্মা উভয়েরই সংস্কার হবে। যখন আপনার জীবনযাপনের প্রতিটি অংশ শুদ্ধ হবে, তখনই আপনার জিকির ও ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে এবং আপনি তাঁর প্রকৃত নৈকট্য লাভ করতে পারবেন।
আখেরী মোনাজাতের মাধ্যমে ঢাকার ইসলাহী ইজতেমার শেষ হয়। মোনাজাত পরিচলানা করেন জানেশীনে ফিদায়ে মিল্লাত, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি, মাওলানা মাহমুদ সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (দা. বা.)। মোনাজাতে দেশ, জাতী ও মুসলিম বিশ্বের শান্তি কামনা করা হয়।


