১৮ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৭ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

হারিয়ে যাচ্ছে কওমী মাদরাসার ঐতিহ্য

ফাইল ছবি

হারিয়ে যাচ্ছে কওমী মাদরাসার ঐতিহ্য

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী 

‘হারিয়ে যাচ্ছে কওমী মাদরাসার ঐতিহ্য’ কথাটা অনেকের কাছে পছন্দীয় না হলেও বাস্তবতা শতভাগ। একটু গভীর ভাবে দৃষ্টি দিলে বোঝা যাবে, কওমী মাদ্রাসা তাঁর স্বকীয়তা, তাঁর ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। যে যাই বলুক, আমাদের দেশের দেওবন্দী মাদ্রাসাগুলো দিনে দিনে তার ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারছে না। এমন এমন বিষয়ে আমাদের অধঃপতন হচ্ছে, যে গুলো আমাদের মুরুব্বীগণ কখনো কল্পনা করেননি। এমন অবস্থার শিকার এখন কওমী অঙ্গন, যে অবস্থার কথা কোনদিন ভাবা যায়নি।

কদিন  আগে বেফাকের রেজাল্ট বের হল, সারাদেশের কওমী মাদ্রাসাগুলোর  ফলাফল আমাদের চোখের সামনে।  একদম সাড়া জাগানো ফলাফল। কোন মাদ্রাসার রেজাল্ট কিন্তু খারাপ নয়। সব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল গৌরবময়। বিশেষ করে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের ফলাফল ঈর্ষনীয় বলা যায়।

বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মোমতাজ (A+) এর সংখ্যা অনেক বেশী। দেখা গেল একটা প্রতিষ্ঠানে  ৫০ জন ছাত্র পরীক্ষা দিলে  তার মধ্যে বিশ/ পঁচিশজন মোমতাজ হয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠান মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছে। মোটকথা, অনেক গৌরবময় ফলাফল। যে ফলাফলটা  নিয়ে আমরা মানুষের মাঝে গর্ব করতে পারি।

আমার কাছে মনেহয়, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, সেই নব্বই দশকের গোড়ার দিকে। তখন কোন প্রতিষ্ঠানে এত্ত ভাল ফলাফল লক্ষ্য করা যায় নি। তখন এক প্রতিষ্টান থেকে ৫০ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলে, দু/চারটের বেশী মোমতাজ আশা করা যেত না। অনেক নামী-দামী  মাদ্রাসার কথাই বলছি, দুই তিনজন মোমতাজ, বাকী আট-দশজন জাইয়্যিদ জিদ্দান, আর জাইয়্যিদ এবং মকবুল নিয়েই সবাই খুশি থেকেছে।

সেই তুলনায় এখন মাদ্রাসাগুলোর ফলাফল আকাশ চুম্বি। মেধাবী ছাত্রের সংখ্যা অনেক বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে। মোমতাজ (A+) বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে কওমী মাদ্রাসাগুলো তার আগের জায়গা থেকে অনেক নিচে নেমে গেছে। আমাদের বাহ্যিক চাকচিক্য বেড়েছে। ছাত্রদের ষ্টাইল, চলা ফেরায় অনেক অনেক আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। মাদ্রাসার ইমারত এবং জীবন যাত্রার মান বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন অধঃপতন এসেছে, যেটা কেউ ভেবে কুল কিনারা করতে পারছে না।

অনেক বিজ্ঞমহলের ধারণা, অনেক আলেম উলামার বক্তব্য, কওমী মাদ্রাসার এমন ঈর্ষণীয় ফলাফল,  হাজারো মেধাবী ছাত্রের উপস্থিতি, তারপরেও যেন কওমী মাদ্রাসা থেকে কি একটা জিনিস হারিয়ে গেছে। কি যেন নেই। ফলাফল আগের তুলনায় ভালো হলেও কিন্তু বড় কোন ঘাটতি দেখা যাচ্ছে এখন কওমীতে। যে ঘাটতি আগে ছিল না।

এখন অনেক মেধাবী মুখ আসলে ফলাফল ভাল করলে সেই আগের সাধারণ ছাত্রের সমপরিমাণ যোগ্যতা যেন বর্তমানের নামকরা ছাত্রদের মাঝে পাওয়া যাচ্ছে না। আগেকার  ফারেগীন ছাত্ররা যে যোগ্যতা, যে আদব আখলাক এবং চিন্তা চেতনা নিয়ে বের হত, বর্তমানের সাড়া জাগানো মেধাবী মুখগুলো সেরকম চিন্তা-চেতনা, আদব-আখলাক নিয়ে বের হতে পারছে না।

অনেক আলেমদের সাথে কথা বলে দেখেছি, বর্তমানের ফারেগীন ছাত্ররা মেধাবী হলেও, ভাল- ফলাফল করলেও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের চরম উদাসীনতা।  বেশ অনেক বিষয়ে তাদের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। যার কারণে হাল জামানার আলেম-উলাগণ  উলোট-পালোট করে ফেলছেন, আলেমানা শান তাদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এক. বর্তমানের  ফারেগীন ছাত্রদের মাঝে আদব-আখলাকের চরম অবনিত। কিছুটা সেই বেআমল, বেআদব, উচ্ছৃঙ্খল দলের ছাত্রদের ছোঁয়া যেন তাদের মাঝে লেগেছে। এখনকার ছাত্ররা মুরুব্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা মুরুব্বীদের ভ্রুক্ষেপ করে না।

দুই. আত্মশুদ্ধির মেহনত নেই। কেউ আত্মার সংশোধন এর জন্য কোন চেষ্টা করছে না। অধিকাংশ ছাত্রদের কোন মুরুব্বী নেই। নিজের খেয়াল খুশিমত চলাফেরা করছে।  যার কারণে ছাত্ররা যেন বেআমল।

তিন. অনেক ছাত্র আছেন, যারা তরবিয়ত বিহীন বেআমল  রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সাথে জড়িত। ঐসব সংগঠনে চলার কারণে ছাত্ররা বেআমল হয়ে যাচ্ছে।

চার. ছাত্রদের কিতাবী যোগ্যতা এখন অনেক কম। বাজারে নোট বইয়ের সয়লাবে, মুল কিতাবের সাথে সাক্ষাত কমে যাচ্ছে। পরীক্ষার খাতায় ভালো লিখতে পারে। কিন্তু মুল কিতাব বোঝা ছাত্রের সংখ্যা কম। যার কারণে যোগ্যতা পয়দা হচ্ছে না। সেই আগেরমত কিতাবের কালো কালো হরফ যা আছে সব পড়তে হবে, মুখস্থ করতে হবে এমন সংখ্য একদম কমে গেছে।

পাঁচ. রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সময় দেওয়ার কারণে, কিতাবের পিছনে সময় দেওয়া হচ্ছে কম।  দরসী কিতাব পড়ার পর গায়রে দরসী কিতাব মুতালায়া কম হচ্ছে।

ছয়. মোবাইল ব্যবহারে ছাত্রদের বেশী ক্ষতি হচ্ছে। যদিও কিছু ফায়দা আছে মোবাইলে, তবে  ক্ষতির দিকটা বেশী।মোবাইলে মুতালায়া করতে গিয়ে অন্য সব জিনিস মুতালায়া বেশী হচ্ছে।

এরকম কিছু বিষয় আছে, যার দ্বারা কওমী মাদ্রাসাগুলো চরম ক্ষতির মধ্যে।শিক্ষা ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন। এবিষয়গুলো যদি আমরা সংশোধন না হই, তাহলে আরো অধঃপতনে চলে যাব।

এক সময় আমাদের দেশের  আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে অনেক যোগ্যতা সম্পন্ন এবং আমলী-আখলাকী আলেম তৈরী হত। কিন্তু যখনই আলিয়াতে রাজনৈতিক সংগঠন প্রবেশ করেছে, তখনই সেখান থেকে আদব-আখলাক বিদায় নিয়েছে। ইলম-কালাম চলে গেছে। নোট বই, সাজেশন পড়ে খুব ভাল ফলাফল তারা করে, কিন্তু অধিকাংশ ছাত্রের যোগ্যতা পয়দা হয় না। বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে আসার পরেও কোন মাসয়ালার সুষ্ঠ সমাধান দিতে পারে না। ইমামতিতে থাকে অযোগ্য। বহু মানুষের ইলমে ক্বেরাত এর কোন জ্ঞান নেই।

ঠিক ঐ রাস্তায় যেন হাঁটছে কওমী মাদ্রাসাগুলো। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দাপটে  কওমীর আসল ঐতিহ্য হুমকির সম্মুখীন। তরবিয়ত বিহীন ছাত্র সংগঠনগুলো কওমীতে প্রবেশ করে তার ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। যেটা খুবই দুঃখজনক। আল্লাহ আমাদের সহীহ বুঝ দান করুন। কওমী মাদ্রাসাগুলো হেফাজত করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com