হিন্দুরা কি ছোট মনের হয়?

হিন্দুরা কি ছোট মনের হয়?

হিন্দুরা কি ছোট মনের হয়?

ফয়জুল্লাহ আমান ❑ ‘অনেক হিন্দুর সাথে আমার উঠা বসা আছে। এদের মন ছোট। খুব সংকীর্ণমনা হয় এরা। এক পয়সা খরচ করতে হিসেব কষে। আমার দোকানে আসলে তাদের কত আপ্যায়ন করি, অথচ তাদের ওখানে গেলে কখনও কিছু খেতে সাধে না। আসলেই আমাদের দেশের হিন্দুরা একটু কেমন যেন। এদের ভেতর উদারতার অভাব। শতকরা ৯৫ জন হিন্দুর মন ছোট।’

আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধুর বক্তব্য তুলে ধরলাম। এ বক্তব্যের সাথে আমাদের দেশের প্রায় সব মুসলমান এক মত। দেশের ভিন্ন ধর্মাবলম্বিদের প্রতি মন্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারলে খুবই আনন্দ আর তৃপ্তি পাই আমরা। এভাবেই ইসলামের জয় হয় যেন। অন্য ধর্মের অনুসারীদের খাটো করতে পারলে নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয়ে যায়।

অতিরিক্ত গবেষক হলে বলে বসেন, হিন্দুরা মুশরিক তো তাই। তাওহিদের বিশ্বাসের কারণে মুসলমানদের মন সব সময় বড়। আল্লাহর প্রতি ইমান থাকার কারণে আত্মা বিরাট হয়ে যায়।

একথা সত্য, তাওহিদের বিশ্বাসের কারণে হৃদয় প্রশস্ত হয়। কিন্তু সে তো ঐশ্বরিক ব্যাপার। সাধারণ তাওহিদ চর্চার কারণে নয়, সাধকদের যে বিশেষ স্তর অর্জিত হয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তার ফলশ্রুতিতে হৃদয় উন্মোচিত হয়। কিন্তু সে তো বড় সুফি সাধকদের ব্যাপার। সাধারণ মুসলিম অমুসলিমের মন ছোট বড় হওয়া অন্য এক ব্যাপার। সাধারণভাবে মন ছোট হওয়া বা বড় হওয়া পরিবেশ ও বংশীয় শিক্ষার প্রভাবের ফল।

ইসলামী সাহিত্যে সবচেয়ে বড় দানশীল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন হাতেম তায়ি। ইয়ামানের তাই গোত্রের একজন গোত্রপতি। তার বদান্যতার গল্পে ভরা আমাদের দেড় হাজার বছরের সাহিত্য। বাংলায়ও পুঁথি সাহিত্য থেকে নিয়ে আধুনিক যুগে ফররুখ আহমদ পর্যন্ত বহু গল্প রচনা করেছেন। কিংবন্তি এই হাতেম ছিলেন একজন মুশরিক। রাসুল সা. যার জাহান্নামী হবার ঘোষণা দিয়েছেন। বোঝা যাচ্ছে কেবল হিন্দু বা মুশরিক হবার কারণেই কেউ বখিল হয় না। জাহিলি যুগের অসংখ্য কাফির মুশরিকের বদান্যতার গল্প পাওয়া যায়।

এ থেকে বুঝতে পারছেন, -হিন্দুদের মন ছোট- এটি কোনো ধর্মীয় আপ্তবাক্য নয়। কোরআন হাদীসের কোথাও এমন কোনো কথা নেই। আমাদের দেশের সাম্প্রদায়িক পরিবেশে এ ধরনের কথা প্রচারিত হয়ে তা চরম সত্যের রূপ পেয়েছে। আর যদি কথাটি সত্য হয়েও থাকে তাহলে তা আমাদের জন্য সত্যি দুঃখজনক। -আমাদের দেশের হিন্দুর মন ছোট-এ কথা বললে হিন্দু ছোট হয় না। এতে বরং আমরা মুসলমানরা ছোট হই। আমাদের দেশের হিন্দুর মন ছোট হবে কেন?

এর বাস্তব কারণ উদ্ঘাটন করলে দেখা যাবে, এর জন্য আমাদের মুসলমানদের দায় আছে। কারণ কোনো দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন তখনই ছোট হবে যখন তারা আশঙ্কার ভেতর বেড়ে উঠে। সব সময় ভয়ে থাকে কেউ তাদের উপর আক্রমণ করে কি না। কেউ তার জমি দখল করে নেয় কি না। আমাদের দেশের হিন্দুরা যদি ছোট মনের হয়ে থাকে তাহলে বলতে হয় আমরা তাদের ভালো রাখিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। রাসূল সা.এর প্রতিবেশি ইয়াহুদিদের সাথে যে সম্পর্ক ছিল আমরা কি আমাদের প্রতিবেশি হিন্দুদের সাথে তেমন স্বাভাবিক সুন্দর সম্পর্ক রাখতে পারছি? মৃত্যুর আগেও রাসুল সা. প্রয়োজনে একজন ইহুদির কাছ থেকে জবের আটা কর্জা করেছিলেন। অথচ নবীজীর জন্য জীবন দিতে পারেন এমন অসংখ্য সাহাবি মদীনায় ছিলেন। এসব আমাদের শিক্ষার জন্য। অমুসলিম বলে তাদের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখা যাবে না একথা ঠিক নয়। অমুসলিমদের সাথে সদাচারের নির্দেশ খোদ কোরআনে এসেছে। অসংখ্য হাদীস রয়েছে।

ইসলাম আমাদের শেখায় সব মানুষকে আপন করে নিতে। সব জাতিয়তা ও আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় ইসলাম।

ভারতবর্ষে হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। মুসলিমরা যেমন হিন্দুদের প্রতি চরম বিদ্বেষ রাখে, হিন্দুরাও মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা রাখে। চরমভাবে বিদ্বিষ্ট একে অপরের প্রতি। এর কারণ সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশরা দেড়শ বছর ধরে দুটি ধর্মের অনুসারীদের পরস্পরের প্রতি এমন বিদ্বিষ্ট করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। ভুল ইতিহাস পড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এভাবে দুটি জাতির ভেতর স্থায়ি এক সন্দেহ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। আজও আমরা সেখান থেকে বের হতে পারিনি।

মূলত এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষের প্রতি সন্দেহের চোখে তাকানো এটি ছোট মনের কারণেই হয়ে থাকে। কেবলই সন্দেহ হয়, সে আমার অনিষ্ট করবে। সে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। এভাবে চিন্তা করলে ভিন্ন ধর্মের কারো কাছে যাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়। তাকে নিজের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা তো দূরের ব্যাপার, সাধারণ পার্থিব বিষয়েও একসাথে কাজ করা তখন দুষ্কর হয়ে পড়ে। ইসলাম আমাদের শেখায় সব মানুষকে আপন করে নিতে। সব জাতিয়তা ও আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় ইসলাম।

মনে করুন আপনার বাড়ি রংপুর। যখন ঢাকা আসেন রংপুরের একটা মানুষ পেলেই তাকে বড় আপন মনে হয়। অথচ সে আপনার গ্রাম বা থানার নয়। আবার আপনি যদি ভারতে যান তাহলে খুলনা বা চিটাগাংয়ের একজনকেও আপনার অনেক কাছের মনে হয়। অথচ সে অন্য বিভাগের। আরব দেশে কাজ করতে গেলে কেবল বাংলাদেশ নয় ভারত পাকিস্তানের মানুষকেও নিজের দেশের মতই কাছের মনে হবে। আর যদি অন্য কোনো মহাদেশে যান তাহলে এশিয়ার যে কাউকে ঘনিষ্ট মনে হবে।

এখন কল্পনা করুন, আপনি চাঁদের দেশে গিয়েছেন, সেখানে আমেরিকা বা জাপান বা অস্ট্রেলিয়া বা আফ্রিকার কাউকে পেলেন। পৃথিবীর যে কোনো মানুষকে দেখতে পাবেন, তাকে কী পরিমাণ আপন মনে হবে, ভেবে দেখুন। মূলত আমাদের সবাইকে একটু উপরে উঠতে হবে। মন মানসিকতা একটু উচু করতে হবে। তাহলেই এমন সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা বাঁচতে পারব।

আবহমান কাল থেকেই এদেশে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ পার্সিসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। এমন সন্দেহের পরিবেশ ছিল না। ইতিহাস থেকে আমরা এ সত্য জানতে পারি। সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে সব কিছু। ধরে নিলাম, ইতিহাস উল্টাই ছিল। তা মেনে নিলেও এখনও এমন উল্টাই রাখতে হবে? কেন আমরা আমাদের বদলাতে পারি না? আমাদের ধর্ম তো আর আমাদেরকে এমন সংকীর্ণ হতে বলে না?

পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতের অপব্যাখ্যা করে এ ধরনের সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রাখার চেষ্টা করে কুচক্রি মহল। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, মুমিনদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইহুদি ও মুশরিকদেরকেই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখবে আর যারা বলে আমরা খৃস্টান, তাদেরকেই তুমি মুমিনদের নিকটতর বন্ধুরূপে দেখবে, কারণ তাদের মধ্যে অনেক পণ্ডিত ও সংসার বিরাগী আছে, আর তারা অহংকারও করে না। [মায়দা: ৮২]

এ আয়াতের দোহাই দিয়েই ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছিল কিছু আলেম। তারা বলত, স্বদেশি হিন্দুদের চেয়ে বিদেশী ইংরেজদের রাজত্বে থাকতে পারা রহমত। অথচ আয়াতে রাসুল সা.-এর সময়কার অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। সেসময়ে মক্কার মুশরিক ও মদীনার ইহুদিরা চরম শত্রু ভাবাপন্ন ছিল। এর বিপরীতে নাজরানের খৃস্টানরা মুসলমানদের প্রতি বন্ধু ভাবাপন্ন ছিল। সব যুগের সব মুশরিক আর সব খৃস্টানদের কথা বলা হয়নি এ আয়াতে।

ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের আলেমরা শুরু থেকেই বৃটিশদের বিরোধিতা করে আসছিলেন। স্যার সৈয়দ যখন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়ান পেট্রিয়াটিক সোসাইটি নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, তখন দেওবন্দ থেকে কংগ্রেসে যোগ দেওয়া ও স্যার সৈয়দকে পরিত্যাগ করার ব্যাপারে স্পষ্ট ফতোয়া দেওয়া হয়। মাওলানা রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি প্রমুখ বড় আলেম এমন ফতোয়া দেন।

মূলত হিন্দু বৌদ্ধ ইহুদি বা খৃস্টান যে ধর্মের অনুসারীই হোক, শুধু শুধু কারও প্রতি দুশমনি করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থি। পাশের দেশে হিন্দু যদি মুসলমানদের প্রতি অন্যায় করে থাকে তাহলে এর উত্তরে আমাদের উচিত আমাদের দেশের হিন্দু ভাইদের প্রতি সদাচার বাড়িয়ে দেওয়া। আচরণের মাধ্যমেই আমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারি। আমাদের ধর্মের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে পারি। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের তাওফিক দিন। আমীন।

লেখক : খতিব, মুহাদ্দিস ও গবেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *