১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১০ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

হেফাজতের কমিটির পাঁচজনের চারজনই বাবুনগরীর আত্মীয়

ফাইল ছবি

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : তিন ধরনের চাপে পড়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কমিটি ভেঙে দিয়েছেন মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরী। একের পর এক নাশকতা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অনেক নেতার গ্রেপ্তারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে সংগঠনটি।

নাশকতার মামলায় নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এড়াতে ও বহুমুখী তদন্তের হাত থেকে বাঁচতে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার জোর চেষ্টা চালান সংগঠনটির নেতারা। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। সেই বৈঠকে হেফাজতকে সংগঠন থেকে রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দেওয়াসহ তিনটি কড়া শর্ত দেওয়া হয় বলে খবর বেরিয়েছে।

এই চাপের সঙ্গে সংগঠনের ভেতর আরো দুটি চাপে পড়ে হেফাজত। এর একটি হচ্ছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নাশকতার কর্মসূচিসহ কিছু কার্যক্রমের বিরোধিতা করে কয়েকজন নেতার পদত্যাগের পর আরো অনেকে পদত্যাগের হুমকি দিচ্ছিলেন। আরেকটি হচ্ছে, গ্রেপ্তার বন্ধের ব্যবস্থা করতে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ওপর সংগঠনের নেতাকর্মীদের চাপ বাড়ছিল।

এই তিন চাপে দিশাহারা শীর্ষস্থানীয় নেতারা নিজেদের গ্রেপ্তারের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে তড়িঘড়ি করে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। গত রবিবার রাত ১১টার দিকে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় সংগঠনের আমির জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতার পরামর্শে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো। আগামী দিনে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে হেফাজতের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

এর পরও সংগঠনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মধ্যরাতেই আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে বাবুনগরীপক্ষ। রাত পৌনে ৩টার দিকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রথমে তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। যেখানে বিলুপ্ত কমিটির উপদেষ্টা মাওলানা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটিতে প্রথমে বিদায়ী আমির মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরী ও বিদায়ী মহাসচিব মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদীকে রাখা হয়। তিন সদস্যের কমিটিতে বর্তমান নেতারাই থাকায় সমঝোতার আলোচনায় প্রশ্ন উঠতে পারে ভেবে আবারও দুজনকে যুক্ত করা হয়। পরে রাত ৪টার সময় আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য হিসেবে মাওলানা সালাহউদ্দিন নানুপুরী ও অধ্যাপক মিজানুর রহমান চৌধুরীকে যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচজনের আহ্বায়ক কমিটি।

প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, এমন কৌশলের কারণে হেফাজতের ওপর সরকার ও প্রশাসনের নাশকতাবিরোধী হিসেবে বিশ্বাস তৈরি হয়নি। সন্দেহের চোখে এখনো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে হেফাজতের কর্মকাণ্ড। মামলায় শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার ও তদন্তের প্রক্রিয়ায় কোনো নতুন নির্দেশনা নেই।

এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দুই দফায় আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও এই কমিটি নিয়ে হেফাজতের অনেকেই নাখোশ। কমিটি ভাঙায় ক্ষোভ-হতাশা সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও। তবে নেতারা নতুন মেরুকরণের দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। আহ্বায়ক কমিটির মধ্যে অধ্যাপক মিজানুর রহমান ছাড়া অন্য চারজনই জুনাইদ বাবুনগরীর আত্মীয়।

মহিবুল্লাহ বাবুনগরী তাঁর আপন মামা, নুরুল ইসলাম জিহাদী ফুফাতো ভাই ও সালাউদ্দিন নানুপুরী মেয়ের ভাশুর ও ভাগ্নে সম্পর্ক। জুনাইদ বাবুনগরীসহ চারজনের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর পাশের উপজেলা ফটিকছড়িতে। শুরুতেই কমিটিতে আত্মীয়করণ করায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এই আহ্বায়ক কমিটিকে ‘ফটিকছড়ি কমিটি’ বলেও আখ্যায়িত করছেন।

অরাজনৈতিক ধর্মীয় বৃহৎ এ সংগঠনে ২০ দলীয় জোটের একাধিক শরিক দলসহ ইসলামী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ছিলেন কমিটিতে। নতুন এ কমিটি গঠনপ্রক্রিয়ায় অরাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। কেন্দ্রীয় ২০১ সদস্যের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার পাশাপাশি ঢাকা মহানগর কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকায় আগের কমিটির নেতারা ছাড়া কাউকে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

নতুন আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মঈনুদ্দিন রুহী গণমাধ্যমে বলেন, ‘নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে আত্মীয়করণ হয়েছে। জুনাইদ বাবুনগরীর আত্মীয়-স্বজনকেই বেশির ভাগ পদে নিয়ে আসা হয়েছে। পাঁচজনের মধ্যে চারজন উনার আত্মীয়। আগে থেকেই বলে আসছি হেফাজতে ইসলামের গত কেন্দ্রীয় কমিটিতে (সদ্যোবিলুপ্ত) নেতৃত্বের শূন্যতা, আদর্শ ও লক্ষ্যহীন হওয়ায় এই গাড়ি (হেফাজতে ইসলামের গত কমিটি) দুর্ঘটনায় পড়বে বলে যে আশঙ্কা করেছিলাম এখন তা-ই হয়েছে। ড্রাইভারবিহীন গাড়ির অবস্থা এমনই।’

প্রতিষ্ঠাতা আমির মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর অনুসারীরা কি এর সঙ্গে আছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মঈনুদ্দিন রুহী বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমরা চাই আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নীতি-আদর্শকে ধারণ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ পরিচালিত হোক। এতে দল-মত-নির্বিশেষে সংগঠন সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’

এদিকে ঢাকায় পুলিশের গোয়েন্দাদের একাধিক কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হেফাজতে ইসলামের নেতাদের মামলা ও তদন্তের ব্যাপারে নতুন কোনো নির্দেশনা নেই। তবে কমিটি ভেঙে দেওয়া এবং কাওমি মাদরাসায় রাজনীতি বন্ধ করার উদ্যোগকে ইতিবাচক দেখা হচ্ছে। জুনাইদ বাবুনগরীর নিয়ন্ত্রিত আহ্বায়ক কমিটিকে কৌশলী পদক্ষেপ বিবেচনা করে হেফাজত প্রকৃতপক্ষে রাজনীতি বাদ দেয় কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংশোধনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে পুলিশ প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন পক্ষ আলোচনায় বসবে বলে জানায় সূত্র।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com