হেফাজতে নেতার চেয়ে কঞ্চি বড়

হেফাজতে নেতার চেয়ে কঞ্চি বড়

বিশ্লেষণ । আমিনুল ইসলাম কাসেমী

হেফাজতে নেতার চেয়ে কঞ্চি বড়

এক. বিএনপি তথা চারদলীয় ঐক্যজোট যখন ক্ষমতায়। সেই সময়ে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা, যিনি দলের সংসদীয় উপদেষ্টা , মন্ত্রী ছিলেন। পার্লামেন্টে জোর গলায় বক্তৃতা করতেন। তিনি তার দলের কিছু অপরিপক্ক নেতাদের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, আগে দেখতাম কুকুরে লেজ নাড়ে, এখন দেখি লেজে কুকুরকে নাড়াচ্ছে।

অর্থাৎ সেই সময়ে দলের কিছু দ্বিতীয় সারির নেতারা এমন ভাবে চলাফেরা করছিল, এমন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েছিল, তাতে তিনি এমন মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এক দিকে দুর্নীতীর মহোৎসব। অন্য দিকে ত্যাগী নেতাদের অবমুল্যায়ন এবং বয়োজৈষ্ঠ্যদের টপকিয়ে জুনিয়ার নেতাদের হাতে দলের ষ্টিয়ারিং চলে গিয়েছিল। যে কারণে সংগঠনের সিনিয়র নেতারা চরমভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।

আর সেই অপরিপক্কদের হাতের দলের ষ্টিয়ারিং যাওয়ার খেসারত কিন্তু বিএনপিকে দিতে হয়েছে চরম ভাবে। সেই থেকে দলটি মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। দেশ/ বিদেশে সব জায়গাতে জনসমর্থন হারাতে থাকে। এবং বদনামের খড়গ মাথায় নিয়ে তাদের চলতে হয়। আজো সেই বদনাম ঘুচায় নি। মানুষ সেই সব ডাকসাইডের নেতাদের অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি এখনো ভোলেনি।

দুই. আল্লামা আহমদ শফি রহ. যখন হেফাজতের প্রধান। তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবে হেফাজত পরিচালনা করছিলেন। যার দ্বারা দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলে হেফাজতে ইসলামের সুনাম- সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল তখন। বিশেষ করে দুই হাজার তের সাল থেকে তো হেফাজতে ইসলাম হিরো বনে গেল। যেখানে হেফাজত এর মিটিং সেখানেই লাখো জনতা। ঠিক সেই সময়ে আল্লামা আহমদ শফির আশে- পাশে জুটে গেল দলে দ্বিতীয় – তৃতীয় সারির নেতা। তারা সব সময় ঘুর ঘুর করত। আস্তে আস্তে তারা আল্লামা আহমদ শফিকে গ্রাস করে ফেলল। ওরা এমন হয়ে গেল, হুজুর যেন তাদের ছাড়া চলতে পারেন না। আর সেই সুযোগে হেফাজতের স্টিয়ারিং চলে গেল ওসব অপরিপক্ক নেতাদের হাতে। তারা তখন যেদিকে নিত সেদিকেই যেত হেফাজত। তাদের কথা অনুযায়ী সব কিছু চলতে লাগল তখন।

আল্লামা আহমদ শফি যেন তাদের কাছে পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন। ওরাই ছিল সব। হুজুরের নিজস্ব কোন মতামত আর থাকল না। এমনকি হুজুরের মর্জির বাইরে অনেক কিছু ঘটেছে তখন।

শেষমেষ কি হয়েছিল সেটা আমরা সবই জানি। সেই আশ- পাশের লোকদের কারণে হুজুরের অনেক সম্মানের হানি হয়েছে। সংগঠনের মাঝে অনেক অস্থিরতা বিরাজ করেছে। তারা হেফাজতের আসল অস্তিত্ব আর বাকী রাখেনি।

তিন. হেফাজতের বর্তমান মহাসচিব এখন আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদী সাহেব। একজন খ্যাতিমান আলেমেদ্বীন। শায়খুল হাদীস। দীর্ঘকালব্যাপি তিনি আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়্যাতের সাথে আছেন। বায়তুল মোকাররমের খতীব মাওলানা ওবায়দুল হক সাহেব যখন খতমে নবুওয়্যাতের সভাপতি, তিনি ছিলেন সেক্রেটারী। অত্যন্ত যোগ্যতা সম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব। রাজপথে খতমে নবুওয়্যাতের বহু আন্দোলন -সংগ্রাম তিনি করেছেন। পরীক্ষিত নেতা।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল, তিনি বহু উঁচুমানের ব্যক্তিত্বদের সোহবত লাভ করেছেন। হাটহাজারীর মুফতী ফয়জুল্লাহ রহ.-এর বিশেষ শাগরেদ। এমনিভাবে আরেকজন তাকওয়া পরহেজগারীর যেন মূর্তপ্রতিক আল্লামা হামেদ রহ.-এর ছাত্র তিনি। আবার বাংলাদেশের আলেমদের ছারে তাজ মুরুব্বী আল্লামা আহমদ শফি রহ.-এর খলিফা তিনি।

অর্থাৎ আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদী সাহেব কিন্তু সাধারণ কোন ব্যক্তি নন। কোন ছলিমদ্দি- কলিমদ্দি মার্কা মানুষ তিনি নন। নিঃসন্দেহে তিনি উঁচু মানের ব্যক্তিত্ব।

কিন্তু দুঃখ হল, বর্তমানের হেফাজতের ডাকসাইডের কিছু নেতা যেন আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদী সাহেবকে এ্যাডভাইস করছেন। তাঁকে এখন গাইড করছেন নিচের সারির নেতারা। ঠিক আল্লামা শফির পজিসনে নেওয়ার ফন্দি আঁটছেন মনেহয়। ওনারা নুরুল ইসলাম জিহাদী সাহেবের স্টিয়ারিং কেড়ে নিয়ে হেফাজতের বারটা বাজাতে চাচ্ছেন।

তা নাহলে একজন প্রচার সম্পাদক কিভাবে দলের সেক্রেটারীকে উপদেশ দেয়? বড় আজীব ব্যাপার। তিনি সেক্রেটারীকে ওযাহাত করার ব্যাপারে জনসম্মুখে বিবৃতি দেওয়া এটা বড় গোস্তাখি ছাড়া আর কিছু নয়।

জিহাদী সাহেব যে বক্তৃতা করেছেন চরমোনাই-এর ময়দানে, সেটা ওযাহাত করবেন না কি করবেন, সেটা তো তাঁর বিষয়। তিনি তো আর ছোট শিশু নন। তিনি বর্তমানে এদেশের শীর্ষ আলেমদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। অযোগ্য হয়ে তিনি হেফাজতে ইসলামের মত সংগঠনের মহাসচিবের পদে আসীন হন নি। বরং তাঁর খ্যাতি, তাঁর ইলম, যোগ্যতা সবই প্রশংসনীয়। তাঁকে উপদেশ দেওয়ার আগে ভাবার দরকার। তাঁকে কবজায় আনতে হলে বোঝা- পোড়া প্রয়োজন।

এ জন্য বাঁশের থেকে কঞ্চি মোটা হলে সমস্যা। আগে যেরকম বিভিন্ন দল এবং প্রিয় সংগঠন হেফাজতের মধ্যে হয়েছে, আবার কিন্তু তেমন কিছু হওয়ার আশংকা করা যাচ্ছে। বাঁশের জায়গা বাঁশ থাকুক, আর কঞ্চি তার জায়গায়। হেফাজত আবার ডাকসাইডের নেতাদের দ্বারা যেন পরিচালিত না হয় সেই কামনা- বাসনা রইল। আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *