অখণ্ড অবসরে নবীজীর সীরাত লিখে শেষ করেছি : ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ
আজিজুল পারভেজ : দেশের খ্যাতিমান আলেম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের সময়টা বাসায় অনেকটা আইসোলেশনে থাকার মতোই কাটছে। কারোর সঙ্গে দেখা নেই প্রায় তিন মাস। গবেষণা, পড়াশোনা ও লেখার কাজেই তাঁর এখনকার ব্যস্ততা। বললেন, ‘অখণ্ড অবসর পেয়ে একটি বড় কাজ শেষ করার সুযোগ পেয়েছি।’ প্রায় ৯ বছর আগে হাত দিয়েছিলেন মহানবীর জীবনী লেখার কাজে। সময় না পাওয়ায় শেষ হচ্ছিল না সেই কাজ। অবশেষে গত রবিবার প্রায় দুই হাজার পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপিটি শেষ হলো। বিষয়টিকে তিনি ‘করোনার করুণা হিসেবে’ দেখছেন। পাশাপাশি এই সময়ে আরেকটি কাজও সমানতালে চালিয়ে গেছেন। সেটি হলো কোরআনের তাফসির। এই দুই কাজ করার মাধ্যমেই করোনার সময়টা উপভোগ্য হয়ে উঠেছে তাঁর। এ ছাড়া অনলাইনে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সেমিনারেও অংশ নিয়েছেন তিনি। লিবিয়া ও আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত দুটি সেমিনারের কথা জানালেন।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনীগ্রন্থটি বাংলা ভাষায় লেখা তথ্যপূর্ণ একটি মৌলিক গ্রন্থ হচ্ছে বলে তাঁর ধারণা। তাঁর মতে, এত তথ্যপূর্ণ জীবনীগ্রন্থ বাংলায় আর আছে বলে জানা নেই। বইটি তিন খণ্ডে বের হবে। প্রথম খণ্ডের ছাপার কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। বইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, বইটির মাধ্যমে মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে প্রাশ্চাত্যের সৃষ্ট কিছু প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিশেষ করে, মুহাম্মদ (সা.)-এর একাধিক বিয়ে সম্পর্কে বিশদ আলোকপাত করা হয়েছে। একাধিক বিয়ের পেছনে অসহায়দের সহায়তাই যে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, সেটি উঠে এসেছে। জিহাদ সম্পর্কেও বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
করোনার এই সময়কে মানবজাতির জন্য একটি সংকটকাল অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘এই সংকট শুধু আর্থিক দিক দিয়েই হচ্ছে না, সামাজিক এবং ধর্মীয়ভাবেও হচ্ছে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কসহ নানাভাবেই সংকট চলছে। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও একটি সংকট চলছে। এই সংকট কত দিন ভোগ করতে হবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে একটি বেপরোয়া ভাবও চলে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘এই সময়ে সাহস ও মনোবল হারানো যাবে না। মনোবল মানুষের সংকট নিরসনে ৬০ শতাংশ সহায়তা করে। ধৈর্য ধারণ করে সুচিন্তিতভাবেই অগ্রসর হতে হবে। আর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ৭০ বছর বয়সী এই বরেণ্য আলেম বলেন, ‘পড়ালেখা ও লেখালেখিই আমার শখ। কোরআনের তাফসিরটি শেষ করতে চাই। বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে যে একটি আতঙ্ক, বৈরী ভাব তৈরি হয়েছে, সেটি কিভাবে নিরসন করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যেতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে আলেম-উলামাদের আরো কিভাবে সচেতন করা যায় সেই চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছি।’
এই যে একটি ভাইরাস সারা বিশ্বকে কাবু করে ফেলল, এটি থেকে আমরা কী শিক্ষা পেলাম জানতে চাইলে দেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত শোলাকিয়ার ইমাম ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, ‘ধর্মীয় দিক থেকে যদি ব্যাখ্যা করি, তাহলে হাদিসে আছে, মানুষ যখন পাপাচারে লিপ্ত হয় তখন আল্লাহতালা তাকে সতর্ক করতে বিভিন্ন মহামারির সম্মুখীন করেন। এই দিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যাবে হেন পাপাচার নেই, যা আমাদের সমাজে হচ্ছে না। বিশেষ করে, প্রতারণা যে কী ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, মানুষের কতটা দুঃসাহস থাকলে চোখের সামনে করোনায় মৃত্যু দেখার পরও একজন চিকিৎসক করোনা পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণা করে? যে পাপাচার আমাদের মধ্যে হচ্ছে তার প্রায়শ্চিত্ত আমাদের প্রাকৃতিকভাবেই করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যে অপরাধ করে ফেলেছি তার ওপর আমাদের অনুশোচনা তৈরি হতে হবে। সে সম্পর্কে সবাইকেই সচেতন হতে হবে। পৃথিবীজুড়ে যে অনাবশ্যক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, এই করোনাকালেও তা থেমে নেই। আমরা জুলুমের পর জুলুম করছি। তাই প্রথমত, আমাদের সচেতন হতে হবে; দ্বিতীয়ত, প্রকৃতির দাবিকে আমাদের মেটাতে হবে। সর্বোপরি আল্লাহর কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে।’


