অটিস্টিক শিশুরাও আদর্শ নাগরিক হয়ে গড়ে উঠুক

অটিস্টিক শিশুরাও আদর্শ নাগরিক হয়ে গড়ে উঠুক

সচেতনতা । নিশাত মাহজাবীন

অটিস্টিক শিশুরাও আদর্শ নাগরিক হয়ে গড়ে উঠুক

হঠাৎ সেদিন মনিরা আপার বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। অনেক দিন পর মনিরা আপা আমাকে দেখে অবাক হলেন। মনিরা আপার একমাত্র ছেলে চঞ্চল, দেখতে দারুণ সুন্দর- ফর্সা আর নাদুস নুদুস। বয়স পাঁচ বছর। ঘরে ঢুকতেই দেখা গেল বিছানার উপর ডিগবাজি খাচ্ছে কোথায় যেন একটু অস্বাভাবিক লাগে। মনিরা আপাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ওর কী হয়েছে। তিনি উত্তর দিলেন না। পরে জানালেন চঞ্চল অটিস্টিক শিশু।

চঞ্চলের মতো এমন আরো অনেক শিশু রয়েছে দেশে। অটিজম বা অটিস্টিক শিশুদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা অনেক কম। অটিজম শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘outos’- আত্ম বা নিজ থেকে এসেছে। এর বাংলা অর্থ নিজের মধ্যে মগ্ন থাকা। শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন সুইস মনোচিকিৎসক অয়গেন ব¬য়লার। একান্তভাবে ভগ্নমনষ্ক মানুষ, যারা অন্য লোকের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে না, তাদের বোঝাতে তিনি শব্দটির প্রচলন করেন। অটিজম শিশুর একধরনের মানসিক পীড়া বিশেষ। এটি কোনো সাধারণ রোগ নয়। শিশুর সামাজিক ও বাচনিক বিকাশের ক্ষেত্রে এক চরম প্রতিবন্ধকতা। অটিজম মস্তিষ্কের একটি স্নায়বিক সমস্যা, যা মস্তিষ্কের সাধারণ কর্মক্ষমতাকে ব্যাহত করে। মস্তিষ্কের অসম বিকাশ বা বিকাশগত প্রতিবন্ধকতাই মূলতঃ অটিজম। অটিজমে আক্রান্তরা একটি রহস্যময় জগতে আটকা পড়ে থাকে। তারা না পারে নিজেকে প্রকাশ করতে, না পারে অন্যকে বুঝতে। তাই তাদেরকে বলা হয় অটিস্টিক। এরা নিজেদের একটা আলাদা জগৎ তৈরি করে নেয়। এরা একা একা নিজের মনে, নিজের জগতে বিচরণ করে। তাদের চাহনি কিছুটা অস্বাভাবিক; এরা অন্যের চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারে না।

এদের নাম ধরে ডাকলেও এরা সাড়া দেয় না; কারো সাথে কথা বলে না। কিছু জিজ্ঞাসা করলেও উত্তর দেয় না। নিজের মধ্যে নিজেকে অস্বাভাবিকভাবে গুটিয়ে রাখে, সর্বক্ষণ অন্যমনষ্ক থাকে। সমবয়সীদের সঙ্গে এদের বন্ধুত্বও গড়ে ওঠে না এদের মধ্যে অমিশুক প্রবণতা থাকার কারণে। এরা কল্পনাপ্রসূত খেলা খেলতে পারে না। একই কাজ বারবার করতে পছন্দ করে। নিজের হাত, নিজের আঙ্গুল নিয়ে নিবিষ্ট মনে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাড়াচাড়া করে। অটিজমের কারণে এদের কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কোনো ধরনের আনন্দকেও ভাগ করে নেয় না অন্যের সাথে, এরা কোনো রকম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে না। এরা ভালো খাবার খেতে, সুন্দর পোষাক পরতে পছন্দ করে। সাধরণতঃ এদের কোনো কিছু শুনে শেখার চেয়ে দেখে শেখার প্রবণতা বেশি থাকে। তাই এদেরকে ছবি, বই বেশি টানে। মৌখিক তথ্যের চেয়ে লিখিত তথ্য এদের মস্তিষ্কে অনেক সহজে সমন্বিত হয়। অনেকে সঙ্গীত বা ছড়া পছন্দ করে। কোলাহলমূখর পরিবেশ অসহ্য মনে হলে কান চেপে রাখে, চিৎকার করে ওঠে এসব বিশেষ শিশুরা।

অটিস্টিক শব্দটির তেমন গভীরতা এবং ব্যাপকতা দুই-ই বেশি। অটিস্টিক শিশুরা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শী হয়। এ ধরনের বিশেষ প্রয়োজন সম্পন্ন শিশু বা বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তারা প্রায় স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে। তাই এদের সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধী হিসেবে আখ্যায়িত করা ঠিক নয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা অটিজমকে একটি রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে; যার সাংকেতিক নম্বর এফ ৮৪.০।

অটিজম শব্দটা বাংলাদেশে যতটা চেনা, ঠিক ততটাই অচেনা। এখনও এ দেশে অটিজমকে সাধারণত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং অভিশপ্ত হিসেবে দেখা হয়। এখনো অনেকেই অটিজমকে সমাজের বাধা হিসেবেই বিবেচনা করে। যে মা অটিজমে আক্রান্ত শিশু জন্ম দেন, তিনি সমাজে নিগৃহীত হন। এ পরিবারকে এক রকম অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সাধারনেরা বলেন পাগল, শিক্ষিতরা বলেন ভারসাম্যহীন। সাধারণত মেয়েদের তুলনায় ছেলেরাই অটিজমে বেশি আক্রান্ত হয়।

১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ সাইকিয়াট্রিস্ট চিকিৎসক অটিজম সম্পর্কে প্রথম ধারণা দেন। পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট ডাঃ লিও ক্যানার প্রথম এ অসুখের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেন এবং এর নাম দেন ইনফেনটাইল অটিজম। কিন্তু এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি। প্রায় একই সময় জার্মান বিজ্ঞানী ডাঃ হ্যান্স এসপারজার রোগটি সম্বন্ধে বিস্তারিত জনসম্মুখে উপস্থাপন করেন। এর আগে রোগটি থাকলেও তেমন কোনো ধারণা ছিল না। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোতে এ রোগটি নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে special education exceptionality হিসেবে অটিস্টিককে অন্যান্য শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতার বাইরে স্বতন্ত্র ক্যাটাগরিভুক্ত করা হয়।

২০০৬ সালে অটিজম সোসাইটি অফ আমেরিকার তথ্যানুযায়ী ষাটের দশকে ইউএসএ’তে প্রথম অটিস্টিক শিশুকে চিহ্নিত করা হয়। তবে তখন একে অব্যাখ্যায়িত অক্ষমতা হিসেবে দেখানো হয়েছিল। বর্তমানে এটা fastest growing developmental disability এবং বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ১০-১৭ শতাংশ। ইউএসএ, ইউকে, কানাডা ও অষ্ট্রেলিয়া এই চারটি দেশে অটিস্টিকদের সংখ্যার হিসাব রাখার ব্যবস্থা আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সব দেশের হারকে ব্যবহার করে অন্যান্য দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে অটিস্টিকদের অনুমিত সংখ্যা হিসাব করা হয়। ১৯৯১ সাল থেকে অটিজম সমস্যার গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালকে ‘অটিজম বছর’ হিসেবে ঘোষণা করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রতি ৫০০ শিশুর মধ্যে একজন শিশু অটিজমে আক্রান্ত। বাংলাদেশে অটিজমে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ২,৮০,০০০ এর কম নয়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩০ শতাংশের মৃগীরোগ বা এপিলেন্সি আছে।

অটিজমে সচেতনতা বাড়াতে অটিজমের ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে জানা জরুরি। অটিজম শিশুর সাধারণ তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে: এরা সামাজিকতা বোঝে না; একই আচরণ বার বার করে। এরা চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ করতে পারে না। এদের মধ্যে যারা মাইল্ড অটিজমে আক্রান্ত তারা মূল ধারার স্কুলে পড়তে পারে। মডারেটি যারা, তারা যথাযথ পরিচর্যা পেলে অনেকটা ভাল হয়ে যায়। যারা সিভিয়ার অটিজম সমস্যায় ভুগছে, তাদেরকে অনেক বেশি পরিচর্যার মাধ্যমে কিছুটা চলার মত অবস্থায় আনা সম্ভব। কিন্তু, প্রতিক্ষেত্রেই সবার আগে চাই সচেতনতা।

শিশুর বয়স ১৮ মাস থেকে ৩ বছর সময়ের মধ্যে সাধারণত অটিজম আছে কি-না তা সনাক্ত করা যায়। সিডিয়ার অটিজম কখনই সারানো যায় না, তবে চিকিৎসার সাহায্যে শিশুদের ভাষার সমস্যা কাটানো যায়, সামাজিক যোগাযোগও উন্নত করা যায়। মা-বাবাকে ধৈর্য্য ও সংবেদনশীল হতে হবে অটিস্টিক শিশুদের প্রতি। বাবা-মায়ের ধৈর্য্য, পরিশ্রম ও ভালোবাসার মাধ্যমে শিশু এগিয়ে যাবে সামনে। মনে রাখতে হবে, শিশুটি যখনই ভাবভঙ্গির মাধ্যমে বা কথার মাধ্যমে ভাব স্থাপন করতে চাইবে, তখনই তাকে উৎসাহ দিতে হবে। সহজ-সরল ভাষায় তার সাথে কথা বলতে হবে। কোনো কারণে শিশু চিৎকার বা চেঁচামেচি করলে শান্ত ও স্থির থেকে তাৎক্ষণিক তার চাহিদা পূরণ করতে হবে। তাহলে এদের আক্রমণাত্মক আচরণ, রাগ, ভাংচুর করার প্রবণতা কমে আসবে। প্রতিদিন তার হাঁটার জন্য কিছুটা সময় বরাদ্দ রাখতে হবে; তাকে দৌড়ানো ও লাফানোর সুযোগও করে দিতে হবে। ভালো লাগা বা না লাগার সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা তাকে দিতে হবে। তার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপানো যাবে না। এদের মধ্যে অনেক প্রতিভা আছে। প্রতিভা খুঁজে বের করে বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। এজন্য বাবা মাকে শিশুর প্রতি অধিক যত্নবান হতে হবে। শিক্ষক ও অভিভাবককেও এসব শিশুদেও ক্ষেত্রে একই পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

হেলেন কেলার মাত্র আঠার মাস বয়সে অন্ধ ও বধিরত্ব জীবন বয়ে বেড়ানো শুরু করেন। শিক্ষকের অকৃত্রিম সেবা ও প্রশিক্ষণকে পুঁজি করে পরবর্তীতে কর্মক্ষম হয়ে উঠেছিলেন; জয় করে নিয়েছিলেন নিজেকে বিশ্ব মর্যাদাশীলদের সারিতে। আমাদের বিশেষ শিশুরাও এদেশের উজ্জ্বল নাগরিক। এরাও নিশ্চই পারবে মানবতার যুদ্ধে অংশ নিতে; পারবে জয়ী হতে। বাবা-মাসহ পরিবারের সকল সদস্য, সেবাদানকারীরা এবং সমাজের সবার জ্ঞান, নিজস্ব চেতনা ও গ্রহণযোগ্যতা এবং সর্বোপরি সকলের সচেতনতা এসব বিশেষ শিশুদের শিশুটির সুন্দর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *