পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম: এবারের নির্বাচন অন্য জাতীয় নির্বাচনের মতো নয়। দেশের অর্থনীতির অবস্থাও আগের মতো নেই। এই ভিন্ন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতির অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) মনে করে, এ অবস্থায় এখনই সতর্কভাবে সংস্কারের নীতি গ্রহণ করা উচিত।
নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকনির্দেশনা আসা খুব জরুরি।
গতকাল মঙ্গলবার পিআরআইয়ের বনানী কার্যালয়ে আইএমএফ এবং বাংলাদেশ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক।
পিআরআইয়ের মতে, এবারই প্রথমবারের মতো রাজনীতি ও অর্থনীতি দুই বিষয়ে একসঙ্গে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ ও শর্ত অনুযায়ী সংস্কারের বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে।
সংস্থাটি বলছে, গত জাতীয় নির্বাচনের সময় বিদেশিদের তেমন সম্পৃক্ততা দেখা যায়নি। এবার তারা বেশ নজর দিয়েছে। ফলে এ বছর নির্বাচনও অন্য দুইবারের মতো হবে না।
নির্বাচনের পরও যে শান্তিতে থাকব, তা-ও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
আহসান এইচ মনসুরের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ছাড়া এবার আরো কিছু নতুন ইস্যু এসেছে। শ্রম অসন্তোষ বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটির এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। শ্রম পরিবেশ ঠিক করতেই হবে।
মানবাধিকার বিষয়টি ইস্যু হয়ে আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে। অর্থনীতির চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি অর্থনীতি বাইরের নানা ইস্যু সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে, যা অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
অনুষ্ঠানে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, রিজার্ভ কমে যাওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, ঋণের বোঝা বৃদ্ধিসহ নানা দিক দিয়ে চাপে আছে অর্থনীতি। আইএমএফ এসব বিষয়ে সংস্কার করতে বলেছে। কিন্তু নির্বাচনের আগে এসব সংস্কার করা সম্ভব নয়। আবার সংস্কারে দেরি হলে আরো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আহসান মনসুর বলেন, নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা নেই। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯-১০ শতাংশের মধ্যে থাকবে। যদিও চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ। বাস্তবে গত চার মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ৯.৮ শতাংশ। গত অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৫.৬ শতাংশ প্রক্ষেপণ হলেও বাস্তবে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশের বেশি। বর্তমানে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে কমেনি। কারণ মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমদানি সীমাবদ্ধ থাকায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, মুদ্রা বিনিময় হার কোথায় ঠেকবে বলা কঠিন। নির্বাচনের পরেও যে এসব সংস্কার হবে, সেই দিকনির্দেশনাও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে বড় ধরনের সংস্কার করতেই হবে।
টাকার মান বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, সুদহার বাড়িয়ে টাকা আকর্ষণীয় করতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নজর দিয়ে ব্যয় কমাতে হবে। কোনোভাবে টাকা ছাপানো যাবে না। টাকা না ছাপিয়ে ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। আবার ডলারের বিনিময় হার হঠাৎ করে বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার আগে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের যে প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে, তা অসত্য। বাজারে ডলারের একাধিক বিনিময় হার থাকার কারণে ব্যাংকগুলো এটি করে থাকে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক দায়ী।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৭-১৮ বিলিয়ন ডলারে ধরে রাখতে হবে। এর জন্য বন্ধুরাষ্ট্রের কাছে থেকে এখন ধার নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সৌদি আরব, চীন বা ভারতের কাছ থেকে দুই বিলিয়ন ডলার ধার পেতে পারে বাংলাদেশ। তবে এটি শ্রীলঙ্কার পর্যায়ে পেঁওছে যাওয়ার মতো ধার নয়। ওই পর্যায়ে না যাওয়ার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ডলার ধার করা হবে।
পিআরআই নির্বাহী পরিচালক বলেন, যদি শক্তিশালী কোনো দেশ বাধা না দেয়, তাহলে আইএমএফের দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮১ মিলিয়ন ডলার পেতে তেমন সমস্যা হবে না। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আইএমএফের মিশন প্রধান হিসেবে সুদান সফরে গিয়েছিলাম। সুদান তখন আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির মধ্যে ছিল। তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছিল না। তখন আমরা বলেছি, তাদের ঋণের কিস্তি আপাতত পরিশোধ করতে হবে না। শুধু সংস্কার করলেই হবে। এমন প্রস্তাব আইএমএফের বোর্ডে ওঠার আগের রাতে জি-১০ আপত্তি জানায়। ফলে ওই প্রস্তাব পাস হয়নি।’
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতিতে ঋণাত্মক প্রভাব পড়েছে। অর্থনীতিকে সচল করবে, এমন আমদানি কমেছে। আমদানি কম হওয়ার কারণে রাজস্বেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমবে। জিডিপি কমার কারণে কর জিডিপি অনুপাত বাড়লেও তাতে কাজের কাজ কিছু হবে না।
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাস্তবে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। এ জন্য নতুন করদাতাকে খুঁজে বের করার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে দুর্নীতি দূর, অটোমেশন ও কর আদায় ব্যবস্থাকে গতিশীল করতে হবে। তিনি বলেন, সরকার মূল্যস্ফীতি কমাতে চায়। কিন্তু আমদানি সংকুচিত করে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না।


