অর্থবহ হোক আমাদের স্বাধীনতা

অর্থবহ হোক আমাদের স্বাধীনতা

আজ গৌরবময় বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণ করেছিল পাক হানাদার বাহিনী। চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। বিজয়ের অনুভূতি সবসময়ই আনন্দের। তবে একই সঙ্গে দিনটি বেদনারও। অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের; যেসব নারী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তাদের। এদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার তথা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কোটি কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন একই লক্ষ্যে অবিচল একদল রাজনৈতিক নেতা। তাদের সবাইকেই আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল একরাশ স্বপ্ন বুকে নিয়ে। সাড়ে চার দশকের এ পথপরিক্রমায় সে স্বপ্নের কতটা পূরণ হয়েছে, আজ সে হিসাব মেলাতে চাইবে সবাই। এর মধ্যে আমাদের অনেক চড়াই-উৎরাই মোকাবেলা করতে হয়েছে। রাজনীতি এগিয়েছে অমসৃণ পথে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায়। জনবহুল ও সীমিত সম্পদের এ দেশকে স্বয়ম্ভর করে তোলার কাজও সহজ ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন দিনগুলোয় রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্র চালু করতে হয়েছিল। স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি সংবিধানও প্রণয়ন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজন ছিল গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশে নিরবচ্ছিন্ন যাত্রার। সদ্য স্বাধীন দেশের নেতৃত্বের এ বিষয়ে অঙ্গীকারের অভাব ছিল না। দুর্ভাগ্যজনক, পরবর্তী সময়ে এক্ষেত্রে মারাত্মক বিচ্যুতি ঘটে এবং তার খেসারত দিতে হয় জাতিকে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দারিদ্র্য এখনও প্রকট। গণতন্ত্র, বাক্স্বাধীনতা, ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা পেলেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হতে পারেনি আজও। গণতন্ত্রকে সর্বস্তরে পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে অঙ্গীকারের অভাব পীড়াদায়ক। রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর বিভক্তি; এর পাশাপাশি জাতীয় প্রশ্নে অনৈক্য আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এখনও তৎপর। আশার কথা, যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে এবং বেশ ক’টি রায় কার্যকরও হয়েছে। সমগ্র বিচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে তা এ ধরনের অপশক্তির তৎপরতা রোধে সহায়ক হবে, আশা করা যায়। এতে আইনের শাসন জোরদার করার পথও সুগম হবে।

নিঃসন্দেহে আমাদের আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। যতœবান হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মূল্যবোধ রক্ষায়। বিজয়কে অর্থবহ করতেই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুকন্যার সাহসি পদক্ষেপে যেভাবে ধীরে ধীরে পদ্মাসেতু মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছেÑতাতে আমাদের মনোবল বাড়ছে। আমরা পথ হারাইনি এবং হারাবো না। রোহিঙ্গাইস্যুতেও বাংলাদেশ সমগ্রবিশ্বের সব মানবিকতাকে টপকে নিজেদের জাত চিনিয়েছে। হার মানেনি। এখানে মানবতাই জিতেছে। যে কোনো জাতির শক্তির প্রধান উৎস ঐক্য। রোহিঙ্গাইস্যুতেও দেশের আলেমসমাজসহ সবার ঐক্য ছিলো। দেশের সবাইকে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেছে। ঐক্য মূলত সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের পেছনে কাজ করেছিল মত-পথ-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার এ যুদ্ধে অংশগ্রহণÑঐক্য। এজন্যই সম্ভব হয়েছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মাত্র নয় মাসে পরাজিত করা।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পর আমরা সেই ঐক্যে চিড় ধরাবার চেষ্টা করছি। গুরুত্বহীন বিষয়েও রাজনৈতিক বিভক্তি দেশে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার পথে বড় অন্তরায় হয়ে আছে। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দিয়ে সৎ নেতৃত্ব তৈরীর লক্ষ্যে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কারও জন্য অপেক্ষার সুযোগ নেই। তবে হ্যাঁ, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় অভিন্ন নীতি অনুসরণ অপরিহার্য। সম্ভাবনা অসীম, একে জিইয়ে রাখতে হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সব সমস্যা মোকাবেলায় কাজ করে যেতে হবে। বিভেদ নয়, দেশগড়ার জন্যই আমরা এগিয়ে যাবো- এটাই হোক আমাদের বিজয়ের প্রত্যাশা।

-সাজিদ সাজু

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *