- আমিনুল ইসলাম কাসেমী
এই উপমহাদেশসহ বিশ্ব জুড়ে উলামায়ে দেওবন্দের রাজনীতি মিশে আছে। এক সময় ব্রিটিশ রাজ্যে সূর্য ডুবত না। মানে পুরো দুনিয়ার বহুলাংশে ছিল ব্রিটিশদের শাসন ব্যবস্থা। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকার অনেক দেশ ব্রিটিশদের করতলে ছিল। শত শত বছর তারা শাসন করেছে। এ সমস্ত জায়গাতে তাঁরা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। দোর্দান্ড প্রতাপে তাদের শাসনব্যবস্থা চলছিল। ঠিক সেই প্রতাপশালী ব্রিটিশদের দুয়ারে আঘাত হেনেছিল উলামায়ে দেওবন্দ। তাদের মসনদে ঘূণ ধরাতে সক্ষম হয়েছিল দেওবন্দী আলেমগণ।
শত শত বছরের ব্রিটিশ রাজ্যে আলেমগণ জিহাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হন। হাজার হাজার ওলামায়ে কেরামের ত্যাগ-কোরবানীর বদৌলতে পরাক্রমশালী ব্রিটিশদের পিছু হটতে বাধ্য করে। আলেমগণের রক্তের স্রোত বইয়ে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত করে এই দেশ। একটা স্বাধীন সার্বোভৌমত্ব রাজত্ব গড়ে ওঠে আমাদের। আর ব্রিটিশগণ চিরতরে বিদায় নেয় এই ভূমি থেকে।
উলামায়ে দেওবন্দের রাজনীতি ছিল দেশ ও জাতির মুক্তির। দ্বীন-ইসলামের প্রচার-প্রসার। ব্রিটিশদের দ্বারা আক্রান্ত ইসলামী তাহজীব-তামাদ্দুন এর মুক্তি। তাদের নাগপাশ থেকে জাতিকে হেফাজত। এরকম হাজারো খড়গ থেকে এদেশের সর্বস্তরের মানুষকে তারা বাঁচিয়েছিল। আলেমগণের সার্বজনিন মুক্তির রাজনীতির সফলতা ভোগ করেছিল সকলেই। এমন নয়, তারা শুধু মুসলিমদের জন্য লড়েছেন বাকি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য মুখ বুজে ছিলেন। বরং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মুক্তির জন্য লড়াই করেছেন তারা। সকল জাতির মুক্তির ত্রাতা হয়ে আভির্ভূত হয়েছিলেন উলামায়ে কেরাম।
যেখানেই মানুষ নির্যাতিত-নিপেড়িত হয়েছে, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
১৯৪৭ সনে এই উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কিন্তু আলেমগণেরর মিশন স্তিমিত হয়নি। বরং মাঠে-ময়দানে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত। শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) ১৯৫৭ সনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে নিবিষ্ট রেখেছেন। জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত তিনি কল্যাণে ব্যয় করেছেন। সর্বস্তরের মানবের জন্য তাঁর সকল কার্যক্রম অব্যহত ছিল। ঠিক তিনি যখন ইন্তেকাল করেন, তাঁর বড় সাহেবজাদা ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.) তাঁর কাজগুলো ধরে রাখেন। তিনিও স্বীয় পিতার পথে পা বাড়ান।
ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী পিতার রাজনীতির সস্পূর্ণ অনুগামী ছিলেন। আরব-আজম সবখানে তাঁর পদচারণা ছিল। তিনি যেন উম্মতের কান্ডারীর ভুমিকায়। পুরো ইসলামী বিশ্বের অগ্রদুত হিসাবে অবদান রেখেছেন। তাঁর সফর ছিল গোটা বিশ্বে। যেখানেই মানুষ নির্যাতিত-নিপেড়িত হয়েছে, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
এভাবে দেওবন্দী আলেমগণের রাজনীতি সদা-সর্বদা এবং সার্বজনিন। সকল মানুষের মু্ক্তির মানসে তাঁরা ছুটে গিয়েছেন। প্রতিটি ব্যক্তি সর্বস্তরের মানুষের জন্য কাজ করেছেন। বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে তারা রাজনীতি করেননি। বিশেষ কোনো গোষ্ঠিকে বাঁচাতে তাদের মিশন ছিল না। বরং বিশ্বব্যাপি সর্বস্তরের মানুষের পাশে তাঁরা দাঁড়িয়েছেন।
ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.) এর ইন্তিকালের পরে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের রাজনীতি এবং ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার রাহবার হিসাবে তাঁর সাহেবজাদা সাইয়্যেদ মাহমুদ মাদানী দামাতবারকাতুহুম এর আগমন ঘটে। যিনি বর্তমানে ফেদায়ে মিল্লাতের জানেশীন। একেবারে আকাবির-আছলাফের নকশে কদমে পা রেখে চলেছেন। বিশেষ করে তাঁর দাদা কুতুবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) এর যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
বর্তমানে মাহমুদ মাদানী সাহেব যেভাবে রাজনীতি করে যাচ্ছেন, সেটা তো এক অবিস্মরনীয়। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন পূর্বসূরীদের কথা স্মরণ করে দিচ্ছে। বেশ কয়েক বছরধরে মাহমুদ মাদানীকে আমরা দেখে যাচ্ছি। তিনি যেভাবে সামনে বাড়ছেন, তাতে বিজ্ঞ রাজনীতিবিদের মেধা-মননশীলতা তাঁর মাঝে কাজ করে যাচ্ছে।
আমাদের বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামের রাজনীতি এবং মাওলানা মাহমুদ মাদানী এর রাজনীতি যেন অনেক তফাৎ। মাহমুদ মাদানী সাহেবের রাজনীতিতে যেন আমাদের পূর্বসূরী আলেমদের ছাপ। তাঁর প্রতিটি কর্মে যেন আকাবিরে দেওবন্দ এবং বিজ্ঞ আলেমদের নমুনা দেখতে পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় জিনিস যেটা, তাঁর রাজনীতিতে বিশালতা, প্রশস্ততা এবং সার্বজনিনতা লক্ষ্য করা যায়।
পক্ষান্তরে আমাদের বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামের রাজনীতিতে দেখা যায় সংকীর্ণতা। বিশেষ করে ইদানিং কালের রাজনীতিবিদগণ যেন সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধ। তারা এমন ঘরকুনো এবং সাধারণ মানুষ থেকে এমন ভাবে বিচ্ছিন্ন। যেটা কোনো রাজনীতিবিদদের বৈশিষ্ট হতে পারে না। আমরা বাংলাদেশী আলেমগণ যেন রাজনীতিতে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে আছি। নিজেদের ঘর গোছাতে ব্যর্থ। রাজনৈতিক প্লাটফরম একটা ভিন্ন জিনিস। সেখানে সকলে শরীক করা দরকার। শাখাগত কোন মাসয়ালাতে মতবিরোধ থাকলেও কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে একই মঞ্চে আনা দরকার।
আজমীর শরীফের ওরসে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সেখানে মেডিকেল টিম পাঠিয়েছে। এরকম বহু কল্যাণমুলক কাজ তারা করে যাচ্ছে।
আপনি জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের দিকে তাকালে অবাক হবেন! মাহমুদ মাদানী মাহেবের কার্যক্রমের দিকে দৃষ্টি দিলে আপনার চোখ খুলে যাবে। কীভাবে সর্বস্তরের মানুষকে সাথে রাজনীতি করে যাচ্ছেন। সকল মতের মানুষকে একই জায়গায় নিয়ে আসতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। আপনি দেখুন! কয়েকবছর আগে ভারতে মাহমুদ মাদানী সাহেব বিশ্ব শান্তি সন্মেলন এর আহবান করেছিলেন। যেখানে আজমেরী, বেরলভীসহ সকল মতের মানুষ এক মঞ্চে ওঠায়েছেন। যারা অভিন্ন মতে সেদেশে মুসলিমদের তাহজীব-তামাদ্দুন এর পক্ষে কথা বলেছেন। আবার কদিন আগে দেখলাম, আজমীর শরীফের ওরসে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ সেখানে মেডিকেল টিম পাঠিয়েছে। এরকম বহু কল্যাণমুলক কাজ তারা করে যাচ্ছে।
বিগত করোনাকালিন মাহে রমজানে আড়াইহাজার তবলীগের আটকেপড়া সাথীদের যেভাবে তাদেরকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করে স্পেশাল ট্রেনের মাধ্যমে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করলেন, সেটা ইতিহাস হয়ে থাকবে। আরো অবাক হব আমরা, বিগত কয়েকদিন আগে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের একজন হিজাব পরিহিতা কলেজ পড়ুয়া মেয়ে, নিজের বাইক চালিয়ে কলেজে প্রবেশ করছিল। হিজাব বিরোধী যুবকেরা তার রাস্তা আটকিয়ে ধরলে সে “আল্লাহুআকবার” ধ্বনি দিয়ে সে সব যুবকদের পরাস্ত করে কলেজে প্রবেশ করে। যে খবর পুরো দুনিয়ায় মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাহমুদ মাদানী সাহেব সেই কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে পাঁচলক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। এবার চিন্তা করুন কী তাদের রাজনৈতিক কৌশল। কীভাবে তারা মানুষের মন জুগিয়ে চলেছেন।
এভাবে বহু কার্যক্রম জমিয়তের। যেগুলোর ধারে কাছে আমরা নেই। তাদের রাজনৈতিক দর্শন থেকে আমরা অনেক দূরে। শুধু এমপি মন্ত্রী হওয়াটাই কিন্তু রাজনীতি নয়। জনতার সেবাই মূল রাজনীতি। আকাবিরে দেওবন্দ এমপি-মন্ত্রী হওয়ার পিছনে ছোটেননি। বরং তাঁরা জনতার স্বার্থে কাজ করেছেন। শাইখুল ইসলাম মাদানীকে আমরা সবচেয়ে বড় রাজনীতিবিদ মনে করি, তাঁর জীবনীর দিকে লক্ষ্য করুন, ক্ষমতায় যাওয়ার নেশা তাঁকে পায়নি। বরং আর্ত-মানবতার সেবায় নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম ছিল তাঁর। যে কারণে তিনি বিশ্বব্যাপি দ্যুতি ছড়িয়ে ছিলেন।
এজন্য আকাবিরে দেওবন্দের রাজনীতি এবং আমাদের দেশীয় উলামায়ে কেরামের রাজনীতি বড় পার্থ্ক্য দেখা দিয়েছে। আমরা জনতার স্বার্থের পরিবর্তে ক্ষমতার মসনদে আরোহনের চিন্তায় মগ্ন। যার কারণে জনগণের ফায়দা হচ্ছে না। আর এই ক্ষমতা গ্রহণের লিপ্সা আমাদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি করছে। আমরা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে আছি। দল আর উপদলে ভরপুর আমাদের বাংলাদেশ। তাই আসুন! জনতার সেবায় কাজ হোক। এই কামনা-বাসনা রইল। আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট
- আরও পড়ুন: স্মরণে ফেদায়ে মিল্লাত


