আধ্যাত্মিকতার প্রাণপুরুষ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

আধ্যাত্মিকতার প্রাণপুরুষ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

  • আমিনুল ইসলাম কাসেমী

সাম্প্রতিক কালে নিঃস্বার্থভাবে দ্বীনি খেদমত আঞ্জাম দেওয়ার মানুষের বড্ড অভাব। কম সংখ্যক লোক এখন নিজের পয়সা খরচ করে দ্বীনের বার্তা জাতির কাছে পৌছে দিচ্ছেন। সর্বত্র এখন টাকার ছড়াছড়ি। দাওয়াত দেওয়ার আগে শর্ত-শরায়েত, কোথাও সরাসরি টাকা-পয়সা চাওয়া না হলেও ফন্দি বের করা হয়। নানান উপায়ে ভক্ত-অনুরক্তদের কাছ থেকে টাকা পয়সা আদায় করা হয়। কেউ তো সরাসরি বলে ফেলেন, এতো টাকা দিতে হবে। নতুবা তিনি দাওয়াতী কাজে যাবেন না। আবার কেউ তো খরচের নামে মোটা অংকের টাকা দাবী করে বসেন। মোটকথা, নিঃস্বার্থবান দ্বীনের দায়ীর অভাব। মহান আল্লাহ তাআলার রেজামন্দি হাসিল করার মানসে দ্বীনের কাজ করার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ একজন মুহাক্কিক আলেম এবং আধ্যাত্মিকতার প্রাণপুরুষ। আত্মশুদ্ধির মেহনতে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.) থেকে খেলাফত-ইজাযত লাভের পর তিনি এ ময়দানে অবিরাম ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে তিনি যেন হুবহু ফেদায়ে মিল্লাত এবং আকাবিরে দেওবন্দের নকশে কদমে পা রেখে চলেছেন। আকাবির-আসলাফগণ যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে দ্বীনের মশাল প্রজ্জলন করেছিলেন ঠিক তিনি যেন সেটার পরিপূর্ণ অনুসারী।

ফকীহুন নফস, কুতুবে রব্বানী রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহী (রহ.), শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.), কুতুবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী (রহ.) সহ আকাবিরে দেওবন্দ এর সিলসিলার সাথে তাঁর আধ্যাত্মিক রাবেতা কায়েম রয়েছে। তাঁর সিলসিলা তো মোবারকময়, সারা দুনিয়ার আলেম এবং পীর মাশায়েখদের নিকট সমাদৃত। পূর্বসুরীগণ যে মেযায-মানশা তথা দৃষ্টিভঙ্গি লালন করেছেন, তিনিও সেই চিন্তা-চেতনা বক্ষে ধারণ করে আছেন। কিঞ্চিত পরিমাণ টাল-মাটাল নেই।

আকাবিরে উলামায়ে দেওবন্দ ছিলেন দ্বীনের অকুতোভয় সৈনিক। পুরো জিন্দেগী দ্বীন-ইসলামের খেদমতে কাজ করেছেন। কোন পদ-পদবী, কোন পারিশ্রমিক পাওয়ার আশায় নয়। বরং অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে দ্বীনি খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। শত মুশকিলাতের মধ্যে জমে থেকেছেন। ক্ষুধার্ত থেকেছেন তবু কারও কাছে সুওয়াল করেননি। কারও কাছে কোন কিছু চেয়ে নেননি। মাদ্রাসাতে হাদীস পড়িয়েছেন, দাওয়াতী কাজে নিজেকে বিলীন করেছেন, তবুও কারো সাথে টাকা-পয়সার চুক্তিতে যাননি। এমনও নজীর আছে, বেতন ধার্য করা চাকুরী ছেড়ে ফি সাবিলিল্লাহ খেদমত করেছেন। উল্লেখ্য যে, শাইখুল ইসলাম মাদানী (রহ.) মদীনা শরীফে একটি মাদ্রাসাতে ধার্যকৃত বেতনে খেদমত করতেন। কিন্তু সেটা ছেড়ে মসজিদে নববীতে বিনা পারিশ্রমিকে খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ওই সকল বুজুর্গদের মেযায তথা চিন্তা-চেতনা লালন করেন। হুবহু ওই সকল ব্যক্তিদের পথে পা রেখে চলছেন। তিনিও প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল হাদীসের খেদমতের সাথে জড়িত। বিভিন্ন সময়ে দ্বীনি নানান খেদমত আঞ্জাম দেন। যেমন- ওয়াজ মাহফিল, সেমিনার, আলোচনা সভা ইত্যাদী। তাঁর প্রতিটি কর্ম লিল্লাহিয়্যাতের জন্য।

দেওবন্দের এমন এমন বুজুর্গদের ইতিহাস পাওয়া যায়। জীবনের প্রারম্ভে অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে মাদ্রাসা থেকে কিছু বেতন নিয়েছেন। পরে যখন তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন, উক্ত প্রতিষ্ঠানে মাসে মাসে টাকা দান করেছেন। আগে যেসব টাকা মাদ্রাসা থেকে বেতন হিসাবে নিয়েছেন, সেগুলো পরিশোধ করার চেষ্টা করছেন। যাতে তাঁর খেদমত নিঃস্বার্থ হয়।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ওই সকল বুজুর্গদের মেযায তথা চিন্তা-চেতনা লালন করেন। হুবহু ওই সকল ব্যক্তিদের পথে পা রেখে চলছেন। তিনিও প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল হাদীসের খেদমতের সাথে জড়িত। বিভিন্ন সময়ে দ্বীনি নানান খেদমত আঞ্জাম দেন। যেমন- ওয়াজ মাহফিল, সেমিনার, আলোচনা সভা ইত্যাদী। তাঁর প্রতিটি কর্ম লিল্লাহিয়্যাতের জন্য। কোন মাদ্রাসার সাথে কখনো চুক্তি বদ্ধ হননি। আবার কোন ওয়াজ বা দ্বীনি আলোচনার মাহফিলে কারো সাথে চুক্তি করেননি। নিছক দ্বীনি স্বার্থে আজ ৫০ বছর যাবত এসব ময়দানে কাজ করে যাচ্ছেন।

বর্তমানে সারাদেশের আনাচে-কানাচে তাঁর ইসলাহী ইজতেমা হচ্ছে। তিনি একের পর এক সফর করে যাচ্ছেন। কিন্তু সবই বিনিময় ছাড়া। কারো থেকে কোন প্রকার বিনিময় নেন না। নিস্বার্থভাবে তিনি ছুটে চলেছেন। নিজের খানকাতেও ইসলাহী প্রোগ্রাম হচ্ছে। হাজারো ভক্তবৃন্দ জমা হচ্ছেন সেখানে। কিন্তু কারো কাছ থেকে কিছু নেওয়ার ইচ্ছে নয়।

বিগত ফেব্রুয়ারী মাসে গিয়েছিলাম কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে। সেখানে তিন দিনব্যাপি ইসলাহী ইজতেমা হয়েছিলো লাখো মানুষের উপস্থিতিতে। ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব সে ইজতেমার মধ্যমণি। সব সময় তাঁর সাথে মানুষ সাক্ষাত করতে ভিড় জমাচ্ছে। কিন্তু তাঁর কোন ধরণের চাওয়া-পাওয়া দেখলাম না, কোন কিছুর প্রতি কোন লোভ-লালসাও দেখা গেল না। তিনি আল্লাহর রেজামন্দী হাসিলের নিমিত্তে কাজ করে যাচ্ছেন। ঢাকাতে গত শনিবার (৪ ডিসেম্বর) ইজতেমা শেষ হলো। এখানে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত হয়েছে। কিন্তু পার্থিব কোন চিন্তা তাঁকে গ্রাস করেনি। বরং সুদূর প্রসারী চিন্তা নিয়ে তিনি এগোচ্ছেন। বিনিময় ছাড়া কাজ করে জাতিকে সামনে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যহত রাখছেন।

সবচেয়ে বড় যে খেদমত তিনি আঞ্জাম দিচ্ছেন, সেটা হলো ‘আলেমদের ইসলাহকরণ’। হযরত ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী (রহ.) এ কাজটি বেশি করেছেন। আলেমদের ইসলাহী ময়দানে নিয়ে আসতেন। সাধারণত যোগ্যতা সম্পন্ন আলেমগণ সহজে আত্মশুদ্ধির ময়দানে যেতে কিছুটা গাফলতি করেন। ফেদায়ে মিল্লাত কৌশলে তাদের ময়দানে নামাতেন। বর্তমানে আল্লামা মাসঊদ সাহেব সেই ফেদায়ে মিল্লাতের কৌশলী রাস্তা অনুকরণ করছেন। অনেক যোগ্য আলেমকে বাগে এনে আত্মশুদ্ধির ময়দানে লাগিয়ে দিচ্ছেন। যে কাজটি অনেক প্রশংসনীয়। এটাই নিঃস্বার্থবান দায়ীর সিফাত। উম্মতের দরদ বুঝে তার কাছে যাওয়া। কোন প্রকার ফর্মালিটি ছাড়াই দ্বীন ইসলামের চেরাগ জ্বালানো।

আল্লামা মাসঊদের আলো দিনে দিনে আরো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। মানুষকে সঠিক রাস্তা বাতলে দিচ্ছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর খেদমতকে কবুল করুন। আমিন।

লেখক ও কলামিষ্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *