- মুফতি আব্দুস সালাম ইবন হাশিম
মুস্তফা লুৎফি আল-মানফালুতি (১৮৭৬–১৯২৪) ছিলেন মিসরের প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক। আসিউত প্রদেশের মানফালুত নগরে এক জ্ঞানপিপাসু ও ধর্মপরায়ণ পরিবারে তাঁর জন্ম। কৈশরেই তাকে আল-আজহারে পাঠানো হয় তিনি সেখানে শায়খ মুহাম্মদ আবদুহর সান্নিধ্য লাভ করেন।
আজহারে থাকাকালীন তিনি প্রাচীন আরবি সাহিত্য গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। আবু তাম্মাম, বুহতুরি, শরিফ রাদি, মুতানাব্বি, ইবনুল মুকাফফা, জাহিজ, ইবনু আবদু রব্বিহী, আসবাহানি ও ইবন খালদুন প্রমুখের রচনা তাঁর সাহিত্যিক রুচি ও স্বতন্ত্র ভাষাশৈলী নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুহাম্মদ আবদুহর ইন্তেকালের পর তিনি নিজ শহরে ফিরে গিয়ে প্রায় দুই বছর একান্তভাবে সাহিত্যচর্চায় নিমগ্ন থাকেন।
১৯০৭ সাল থেকে আল-মুয়াইয়্যাদ পত্রিকায় তাঁর সাপ্তাহিক ‘নাযারাত’ শিরোনামের প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। পরবর্তীতে এগুলোই তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আন-নাযারাত’-এর ভিত্তি হয়। তিনি সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন—শিক্ষা ও বিচার মন্ত্রণালয়, আইনসভা এবং পরবর্তীতে পার্লামেন্টের সচিবালয়ে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘আন-নাযারাত’ (১৯০৯), ‘আল-ইবারাত’ (১৯১৫), ‘ফি সাবিলিত তাজ’ (১৯২০) এবং ‘মুখতারাতুল মানফালুতি’ (১৯২২)। ফরাসি সাহিত্য থেকেও তিনি কয়েকটি বিখ্যাত রচনা আরবিতে রূপান্তর করেন, যার মধ্যে ‘আল-ফাদিলাহ’ ও ‘মাজদুলিন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯২৪ সালের ১২ জুলাই তাঁর ইন্তেকাল হয়।
মানফালুতির সাহিত্যিক কীর্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ‘নাযারাত’—যেখানে সাহিত্য, সমাজ, নৈতিকতা ও মানবজীবনের নানা প্রসঙ্গ গভীর অনুভব ও অনন্য ভাষাশৈলীতে উঠে এসেছে।
গ্রন্থটির ধারাবাহিক বাংলা অনুবাদ করছেন মুফতি আব্দুস সালাম ইবন হাশিম। পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকমের পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে এই অনুবাদ।
আজ থাকছে ‘নাযারাত’-এর ভূমিকার প্রথম অংশ।
- পর্ব-১
ভূমিকা
এমন সুন্দর করে আপনি কীভাবে লিখেন? প্রশ্নটি মানুষ আমাকে প্রায়ই করে থাকে। এমন প্রশ্ন কবি-সাহিত্যিকদেরকে তারা সচরাচরই করে। এই প্রশ্নের আড়ালে তাদের একটি না বলা চাওয়া থাকে। আমার লেখালেখির পদ্ধতি তারা রপ্ত করতে চায়। তারাও আমার মতো করে লিখতে চায়।
কিন্তু আমি চাই না তারা এটি করুক। তাদের জন্য অতি মঙ্গলজনক হবে যদি তারা এই কাজটি না করে। আমি চাই না সাহিত্যাঙ্গনের একজন নবাগতও আমার লেখার শৈলী অনুসরণ করুক, কিংবা অন্য কোনো লেখকের অনুকরণ করুক।
যদি তারা একথা বিশ্বাস করে থাকে যে, লেখার মাধ্যমেই আমি সাহিত্যের জগতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছি, তাহলে তা সম্ভব হয়েছে একটিমাত্র কারণে: আমি নিজের লেখনীকে অন্যের ছায়া থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছি। অনুকরণ বা অনুসরণের শৃঙ্খল থেকে আমি নিজেকে বিমুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছি।
আমার পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে এক অদ্ভুত কারণে; আমার দুর্বল স্মৃতিশক্তির কারণে । হ্যাঁ, আমি জীবনে প্রচুর পড়েছি, গদ্য, কবিতা, প্রবন্ধ বিস্তর পড়েছি । কিন্তু কিছুই মনে রাখতে পারিনি ।
পড়া শেসে আমার মাথায় কোনো তথ্য জমা থাকতো না । কোনো শব্দ, ছন্দ, বাগধারা কিংবা ব্যাকরণ স্মৃতিতে আটকে থাকতো না। যা গেঁথে থাকতো, তা হলো: সেই লেখার রেশ, তার সৌন্দর্যের নির্মল আবহ, হৃদয় ছোঁয়া এক আবেশ।
মুখস্ত করার উদ্দেশ্যে আমি কখনো কোনো সাহিত্য পড়িনি, নিজের ভাষাশৈলীকে নান্দনিক করার জন্যও কিছু পড়িনি, নিজেকে বিরাট গদ্যকার হিসেবে জাহের করার মানসেও না। মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে ভাষা ও সাহিত্যের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার পক্ষপাতী আমি নই ।
আমার ব্যাপারটা পুরাই ভিন্ন । আমি এমন এক মানুষ, যার হৃদয়ে ছিলো সৌন্দর্যের প্রতি অপার আকর্ষণ, নিবিড় এক মায়া। আমি সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে পড়তাম যখনই তাকে দেখতাম কোনো মানবের রূপে, ভরা পূর্ণিমার প্রহরে, সূর্যাস্তের করুণ আবেশে, গভীর রাতের নিস্তব্ধ ঘুমে কিংবা সুবেহ সাদিকের প্রথম আলোয়, পাহাড়ের চূড়ায়, টিলার ঢালে, নদী তটে কিংবা সাগরের উত্তাল তরঙ্গে। আমি সৌন্দর্যকে খুঁজে ফিরতাম সঙ্গীতের সুরে, উটচালকের গানধ্বনিতে, পাখিদের মেলায়, ফুলের ছড়ানো সৌরভে, হৃদয়ের কোমলতায়, আত্মার নৈঃশব্দিক তানে, কবিতার ছন্দে বা প্রাঞ্জল কোনো গদ্যের ছত্রে।
আমি সাহিত্য-বাগানে এক মুগ্ধ পথিকের মতো হেঁটে বেড়াতাম। যখনই চোখে পড়ত কোনো একটি অপরূপ ফুল—যা প্রস্ফুটিত ছিল শোভাময় ডালের কোনো এক সতেজ শাখায়—তখন আমি থেমে যেতাম তার সামনে, মুগ্ধ বিস্ময়ে। তাকিয়ে থাকতাম গভীর আদরে, পরম যত্নে, তার গঠনের শৈল্পিক নিখুঁততায় ও রূপের দীপ্তিতে বিমোহিত হয়ে। অথচ কখনোই আমার মনে হতো না, তাকে ছিঁড়ে নিতে হবে কিংবা শাখাচ্যুত করতে হবে। আমি তাকে ঠিক সেখানেই থাকতে দিতাম। তবে তার সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি আমার অন্তরে গেঁথে যেত, যতক্ষণ না আরেকটি সৌন্দর্য এসে তার জায়গা আলতোভাবে প্রতিস্থাপিত হতো।
আমি সে সাহিত্য-বাগান থেকে এমন এক হৃদয় নিয়ে বেরিয়ে আসি, যা উৎফুল্লে উড়তে থাকে, অঝোরে প্রেম ঝরে পড়ে তার প্রতি, ঠিক যেমন শিশির ঝরে পড়ে সুবেহ সাদিকের কোমল পাতায়। আমি সে বাগানে কিছুক্ষণ মাত্র ঘুরে বেরিয়েছি, কিছু ফুলের সামনে মাত্র কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছি, তাতেই মনে হলো, আমি আর আমি নেই! যেন আমার পূর্বের আত্মা হারিয়ে গিয়ে, তার স্থানে আরেক নতুন আত্মা অধিষ্ঠিত হয়েছে। আমার বুকের দুপাশে এমন এক শিহরণ অনুভব করতে লাগলাম, যা আমার জীবনে কখনো ঘটেনি। আমি তখন জগতকে দেখতে শুরু করলাম এক ভিন্ন দৃষ্টিতে, যে দৃষ্টি আমার নয়, যে দৃষ্টি কোনো ঊর্ধ্বলোকের দান। সেই দৃষ্টিতে দেখতে লাগলাম এমনসব ব্যঞ্জনা, এমনসব গভীর ও মর্মস্পর্শী অর্থ, যা চোখকে রূপে পূর্ণ করে তোলে, আর আত্মাকে আনন্দ ও বিস্ময়ে প্লাবিত করে।
আমি মানুষদের দেখতাম, কেবল চেহারা নয়—তাদের ভেতরে অভিনিবেশ করতাম। আমি সৌন্দর্য দেখতাম, শুধু রূপের খোলস নয়—আমি তার অন্তর্লীন সার ও স্নিগ্ধ মর্মবস্তু অবলোকন করতাম । আমি কল্যাণকে দেখতাম, অবধান করতাম তার অনুপম রূপ, তার ছায়াবাহার সুষমা । অমঙ্গলকে দেখতাম, আর অনুভব করতাম তার প্রকৃত কদর্যতা, তার অন্তর্লুকানো কালিমা । যখন নিয়ামতকে দেখতাম, তার হাসিমুখের সৌম্য আলোকচ্ছটা অনুধাবন করতাম। দুঃখকষ্টের মুখোমুখি হতাম, দেখতাম তার চোখে জমে থাকা অশ্রুজল। যখন চোখের দিকে তাকাতাম, তাতে আবিষ্কার করতাম দৃষ্টির অতল গহ্বরে লুকানো এক অপার জাদু । আর যখন তাকাতাম ঠোঁটের দিকে, দেখতে পেতাম দাঁতের ফাঁকে খেলে যাওয়া টলমলে রক্তরঙা মদিরা।
আমি যখন সূর্যের দিকে তাকাতাম, কেবল আলো নয়, দেখতে পেতাম তার রুপালি সুতোর মতো রশ্মি, কোমলতা আর দীপ্তির মেলবন্ধনে ছড়িয়ে আছে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে। চাঁদের আলো আমার চোখে ধরা দিত এমনভাবে, যেন সে নিজেই বিস্তৃত হতে চাইছে, তার চারপাশে আলো উপচে পড়ছে শান্ত অথচ প্রগাঢ় আবেশে।
আমি দেখতাম ভোরের আলোকে, কীভাবে তার শুভ্রতা অন্ধকারের গহিন শিরায় ক্রমশ প্রবেশ করছে, ঠিক যেমন বার্ধক্যের ধূসরতা ধীরে ধীরে প্রবেশ করে যৌবনের তারুণ্যময় রক্তে।
তারাকে আমার মনে হতো যেন রাতের পর্দা চিরে উঁকি দেওয়া সোনালি চোখ, একের পর এক আশ্চর্য চাহনি নিক্ষেপ করছে এই পৃথিবীর বুকে।
আমি যখন রাতকে দেখতাম, মনে হতো এ এক মহার্ঘ কালো ডানা, ধীরে ধীরে ধেয়ে আসছে এই পৃথিবীর উপর, যেমন নিদ্রা এসে জাপটে ধরে ক্লান্ত চোখকে।
জলের ধারা যখন কলকলিয়ে বয়ে যেত, আমি শুনতাম যেন কোনো নিবিড় আত্মকথন; পাতার মৃদু মর্মরে ধরা দিত সুরের নৈঃশব্দ্য; আর পাখির গানে ফুটে উঠত তাদের অদৃশ্য ভাষা, যা কেবল হৃদয় দিয়েই অনুধাবন করা যায়।
আমি সাহিত্যের প্রেমে এমন গভীরভাবে মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যে, তা আমার দুই বক্ষের মধ্যবর্তী সবটুকু জুড়ে স্থান করে নিয়েছিল। জীবনের কোনো মুহূর্ত আমার কাছে এত প্রিয় ছিল না, এত আপন ছিল না, যতটা যত প্রিয় ছিল সেই মুহূর্ত। তখন আমি নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নিঃসঙ্গ হই, তারপর আমার আত্মাকে তুলে দিই আমার বইয়ের হাতে।
আমার মনে হতো, আমি যেন এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়ে প্রবেশ করেছি এক অন্য জগতে, ইতিহাসের হারানো কোনো কল্পলোকের ভেতর।
লেখক, মুদির, মাদরাসাতু ইকরা, আফতাব নগর ঢাকা


