আবরার হত্যাকাণ্ড ও বর্তমান ছাত্র আন্দোলন নিয়ে কিছু কথা
শেখ নাঈমুল ইসলাম : এক চরম অস্থির সময় অতিবাহিত করছি আমরা। পঁচে যাওয়া এক সিস্টেম আর নষ্ট সমাজ ও রাজনীতির ভেতর দিয়ে দিন দিন মানবের বদলে দানব তৈরি হচ্ছে। অসংখ্য উদাহরণের মত বুয়েটের আবরারের নির্মম হত্যাকাণ্ড এর আরও একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
এখানে দুটি বিষয় নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। প্রথমত, মানুষ কেন দিন দিন এত উগ্র সহিংস হয়ে উঠছে এবং ক্ষমতাসীন দল ও তার অঙ্গসংগঠনের দানবীয় আচরণ। দ্বিতীয়ত, গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ কিংবা ছাত্রদের যে আন্দোলন তার ভাষা বা রূপ।
আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো যে, একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই হচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। যে কারণে বিগত শতাব্দীর চেয়ে বর্তমান প্রজন্ম একটি চরম অস্থির সময় এবং হতাশার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। একদিকে রাষ্ট্র এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন উগ্রতা ছড়িয়ে দিচ্ছে অপরদিকে নীতি-নৈতিকতা বিহীন পুঁজিবাদী অর্থনীতির কারণে ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে তৈরি হয়েছে চরম হতাশা। এই দুয়ের মিশেলে মানুষ হিংস্র দানব হয়ে উঠছে। এবং সেই সাথে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে যেহেতু এখানে কোন কার্যকর বিরোধী দল নেই তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গসংগঠনের মধ্যে একটি চরম ফ্যাসিবাদী চেহারা প্রকাশ পেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদৌ জানেন কি না জানিনা যে, তার দল ও দলের অঙ্গসংগঠনের প্রতি আম জনসাধারণের চরম ক্ষোভ ও ঘৃণা তৈরি হয়েছে এবং ক্রমশঃ তা বেড়ে চলেছে।
জনসাধারণের ক্ষোভ ও অসন্তোষ নিয়ে যে কোন রাজনৈতিক শক্তিই স্থায়ী হতে পারে না এবং তার ফলাফল যে কত ভয়াবহ হতে পারে তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে মনে হয় আর কেউ ভালো জানেন না। কারণ তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশের জনগণ দেড় দশকের অগণতান্ত্রিক সামরিক ও স্বৈরশাসকদের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছিলো। পরবর্তীতে এক সামরিক শাসকের স্ত্রীর হাতে দেশ পরিচালনার ভার চলে যাওয়া এবং ৯৬ এ প্রহসনের নির্বাচন দিয়ে পুনরায় তার ক্ষমতা দখলের মাত্র দুই মাসের মাথায় এই জনসাধারণের ক্ষোভ ও অসন্তোষের শক্তিই বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতে প্রথমবারের মত দেশ পরিচালনার ভার তুলে দিয়েছিলো।
সুতরাং ধরাকে সরা জ্ঞান না করে যে জনঅগ্নি লাভা কাজে লাগিয়ে একদা আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগ ভাষা আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই জনঅগ্নি লাভার কি শক্তি তা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ভুলে গেছে কি?
এখন আসি আবরার হত্যাকাণ্ড ইস্যুতে চলমান আন্দোলন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা বা রূপ নিয়ে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে আছে। এই মুহুর্তে তারা এই ধরণের যৌক্তিক আন্দোলনকে পলিটিক্যালি বায়াজড করার অপচেষ্টায় লিপ্ত, যার উদাহরণ আমরা দেখেছি কোটা বিরোধী এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মত যৌক্তিক আন্দোলনে।
বর্তমানে যে আঙ্গিকে বা ভাষায় এই আন্দোলন হচ্ছে তাতে কার্যকরী কোন ফলাফল আসবে বলে মনে হয় না। প্রথমত এই আন্দোলন বা ইস্যু শুধু বুয়েটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না, এটি একটি জাতীয় ইস্যু। আবরারের হত্যাকাণ্ড কোন এক্সেপশনাল কেস না। এটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা র্যাগীং এবং ছাত্র রাজনীতির নামে দলীয় রাজনীতির পেটোয়া বাহিনীর দ্বারা ছাত্র নিপীড়নের যে অসভ্য সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যমান তারই চূড়ান্ত ভয়াবহ একটি রূপ। সুতরাং এই আন্দোলনকে শুধুমাত্র ছাত্রলীগ বিরোধী আন্দোলনে রূপ দেয়া হলে কিংবা কেবল বুয়েট ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে তার সুদুরপ্রসারী কোন ফলাফল আসবে বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ছাত্র রাজনীতির নামে দলীয় রাজনীতির পেটোয়া বাহিনী তৈরি এবং ভয়াবহ দানবীয় রাজনীতির যে চর্চা নব্বই পরবর্তী সময় থেকে শুরু হয়েছে, এই আন্দোলন তার বিরুদ্ধে হওয়া উচিত। তা সে যে দলেরই হোক না কেন। নতুবা পুরনো শকুনের থাবায় এটি হাইজ্যাক হওয়ার সম্ভাবনা এবং আলামত লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ফলে মনে সংশয় জাগছে, লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাবে না তো?
লেখক : রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়


