পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : মতের মিল না হওয়ায় আবারও নির্বাচন কমিশনের সভা বর্জন করেছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। ১৫ অক্টোবর সোমবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অগ্রগতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সভা চলাকালে সকাল ১১টা ৭ মিনিটে মাহবুব তালুকদার সভা বর্জন করেছেন বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইসির যুগ্ম সচিব আসাদুজ্জামান আরজু।
আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে বেলা ১১টায় নির্বাচন কমিশনের ৩৬তম এ সভা শুরু হয়। সভায় বক্তব্য প্রদানের সুযোগ না দেয়ায় মাহবুব তালুকদার সভা থেকে বের হয়ে যান বলে সূত্রে জানা গেছে। সভা থেকে বের হয়ে আসার বিষয়টি পরে সাংবাদিকদের নিজেই জানান মাহবুব তালুকদার।
গেল বছরের ফেব্রুয়ারিতে কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন ইসি দায়িত্ব নেয়ার পর এ পর্যন্ত অন্তত চারটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিলেন কমিশনার মাহবুব। বর্তমান ইসির অধীনে ৩০ অক্টোবর থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন সন্নিকট হওয়ায় আইন সংস্কারের কাজ বাদ দিয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো এগোচ্ছিল। কিন্তু আকস্মিকভাবে ইভিএম নিয়ে নতুন প্রকল্প নেয়া এবং নির্বাচনী আইন সংস্কার নিয়ে তোড়জোড় শুরু করে ইসি। এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং দক্ষ জনবলের বিষয়টি তুলে ধরে ইভিএম নিয়ে আরপিও সংশোধনে ভিন্নমত পোষণ করেন মাহবুব তালুকদার। সর্বশেষ সিটি নির্বাচনের আচরণবিধি সংশোধন নিয়ে অন্যদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন মাহবুব তালুকদার।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পাঁচ দফা প্রস্তাব নিয়ে সভায় বক্তব্য দিতে চেয়েছিলেন এ নির্বাচন কমিশনার। কিন্তু সেই সুযোগ না পাওয়ায় নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে তিনি বেরিয়ে যান। গত ৮ অক্টোবর কমিশনে দেয়া এক আনঅফিসিয়াল নোটে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ওই পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন মাহবুব তালুকদার। নির্বাচনী দায়িত্বে সেনাবাহিনীর কার্যপরিধি নির্ধারণ, সবার জন্য সমান সুযোগ রেখে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন, ভোটে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, ইসির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারের সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে নিজের মতামত সেখানে তিনি তুলে ধরেন।
ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের বিধান রেখে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৩০ আগস্ট এ সম্পর্কিত সভার সিদ্ধান্তের সাথে একমত হতে না পেরে ২০ মিনিট সভা চলার পর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে সভা বর্জন করেন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। এর আগে পাঁচ কমিশনারের তিনজনই ইভিএম ক্রয়ের এ প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে উল্লেখ করেন। ইভিএম ব্যবহারের এ ঘটনায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, মাহবুব তালুকদারের ভিন্ন মত থাকতে পারে এটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। এ সময় তিন নির্বাচন কমিশনার মো: রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এবং ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ উপস্থিত ছিলেন।
নোট অব ডিসেন্টে তিনি লিখেছেন, নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই আমার অধিকার খর্ব করতে পারে না, বাকস্বাধীনতা ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা আমার সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এমতাবস্থায় অনন্যোপায় হয়ে আমি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট প্রদান করছি এবং প্রতিবাদস্বরূপ কমিশনসভা বর্জন করছি।
স্থানীয়ভাবে পরীক্ষামূলক ইভিএম ব্যবহারের কথা শুরুতে বলা হয়েছিল উল্লেখ করে মাহবুব তালুকদার বলেন, এ জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার ইভিএম কেনায় আমি ভিন্নমত পোষণ করেছিলাম। সম্প্রতি ৩৮২১ কোটি টাকার প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার মুখে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে এ বিপুল অর্থ ব্যয় করে ইভিএম কেনা কতটা যৌক্তিক, তা বিবেচনাযোগ্য। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা রয়েছে। বিগত রকিব উদ্দিন কমিশন ইভিএম ব্যবহার বাতিল করে অনেক ইভিএম ধ্বংস করে দেয়। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কখনো কাম্য নয়।
পরিকল্পনা কমিশন অদ্যাবধি প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করেনি বলে তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, যে ইভিএম বিএমটিএফ থেকে সরকারি সংস্থার সুবাদে বিনা টেন্ডারে কেনা হচ্ছে, এর অরিজিন কী, কে উদ্ভাবন করেছে কিংবা কোত্থেকে আমদানি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কারিগরি দিক থেকে এটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত কি না তা পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করার পর অদ্যাবধি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি বলে জানা যায়।
এর আগে গত ৩০ আগস্ট কমিশনের যে সভায় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রাখতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেখান থেকেও মাহবুব তালুকদার আপত্তি জানিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন।


