সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু, সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্যোগে আবুধাবির এয়ারপোর্ট রোডের ফুডল্যান্ড হোটেলের দরবার হলে গত বৃহস্পতিবার (২৫ মে) এই সংবর্ধনা দেওয়া হয়। আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ সাইমুম সরওয়ার কমল। অনুষ্ঠানে অতিথিরা একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের ওপর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে নয় মাস যুদ্ধ পরিচালনা করার পর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। জীবনকে বাজি রেখে সে সময় তরুণেরা দেশমাতৃকার জন্য তাদের শ্রেষ্ঠ সময়টি উপহার দিয়েছিলেন। জীবিকার প্রয়োজনে প্রবাসে আসা একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা আজও দেশের কল্যাণটুকুই কামনা করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি এস এম রফিকুল ইসলাম।
সাইমুম সরওয়ার কমল তার বক্তব্যে বলেন, আমি ছন্দের মানুষ। যার ছন্দ আছে সে কবিতা ভালোবাসে, সে মানুষকেও আপন করে নিতে পারে। তিনি নিজেকে জনগণের একজন বলে আখ্যায়িত করেন। সাইমুম সরওয়ার রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার দুই অমর চরিত্র, অমিত আর লাবণ্যের গল্প আনেন তার বক্তব্যে। অনুষ্ঠানকে আলোর ঝলকানির সঙ্গে তুলনা করে তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ও কর্মকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তার বক্তব্য প্রদান করেন। সুধীজনেরা বিমুগ্ধ চিত্তে শুনছিলেন সে বক্তব্য।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন
সাইমুম সরওয়ার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে অনুপম বলে উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও আদর্শকে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু স্থাপন করতে পারবে, এই আশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান। দুই দেশের জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের মূল পর্বের সূচনা করা হয়। মোহাম্মদ ইমরান অনুষ্ঠানকে ব্যতিক্রমী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানিয়ে আয়োজকেরাই ধন্য হলেন।
সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন এস এম কামাল হোসেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দূতাবাস কাউন্সেলর শহীদুজ্জামান ফারুকী। আরও ছিলেন অধ্যাপক নুরুন নাহার হুদা, ড. জিনাত রেজা খান, জাহাঙ্গীর কবির বাপ্পিসহ ইলেকট্রন এবং প্রিন্ট মাধ্যমের সাংবাদিকেরা। মঞ্চে অতিথিদের মধ্যে আরও ছিলেন অধ্যাপক আবু তাহের, উত্তম হাওলাদার, মোহাম্মদ ইসমাইল, ইকবাল হোসেন ও আবুল হোসেন প্রমুখ। এ ছাড়া জেদ্দা থেকে এসেছিলেন আজিজুল হক।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংসদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কবিতা পরিষদসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন অনুষ্ঠানের বিশেষ পর্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করেন। তারা তাদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন, পরিয়ে দেন বিজয় মাল্য এবং সেই সঙ্গে উত্তরীয়।
অনুষ্ঠানে মীর আনিসুল হাসানের পত্র পতনশীল হাওয়া কাব্যের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। কবি একাত্তরের বিশেষ মুহূর্তকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সময় তিনি সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যক্ষ ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর কাব্য প্রীতির কথা উল্লেখ করেন।
বক্তব্যে রেজা খান দেশের রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তিনি দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলকে ক্ষমতায় আনার ব্যাপারে সবার আন্তরিকতা কামনা করেন। এ ক্ষেত্রে মাঠ কর্মীরা সদা সতর্ক থাকবেন বলেও তিনি আশা পোষণ করেন।
ড. হাবিব উল হক খন্দকার অনুষ্ঠান আয়োজনকে অনন্য হিসেবে অভিহিত করেন। ড. রায়হান জামিল সিলেট হাওর অঞ্চলের অভাবী মানুষদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানোর আহ্বান জানান।
সমাজের বিশিষ্টজন আবদুল মোতালেব উদ্যোক্তাদের অভিনন্দন জানান। বঙ্গবন্ধু পরিষদের শওকত আকবর তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অভিবাদন জানান মুক্তিযোদ্ধাদের। বিজনেস কাউন্সিলের আয়ুব আলী বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা জাতির গর্ব।
মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি উল্লেখ করে বলেন, তিনি না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। মুক্তিযোদ্ধা সন্তান বিলায়েত হোসেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁরা হলেন; আ ক ম আবুল হাশেম, এ কে এম আজিজুল হক, জাকের হোসেন, নুরুল আফসার, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, হরিপদ দে, নুরুল আলম, মোহাম্মদ জহুরুল আলী, মাহবুবুল হক ও তোফায়েল আহমেদ।
সংগঠনের পক্ষ থেকে এর কর্মকাণ্ডের ওপর বিশেষ প্রবন্ধ পাঠ করা হয়। সঞ্চালকই বলেন, এক যুগ আগে একঝাঁক তরুণের উদ্যোগে প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর জন্ম। সামাজিক এই প্রয়াসের মাধ্যমে দেশে সিডরসহ বিভিন্ন বিপর্যয়ে ত্রাণ কার্য পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া একই ধারাবাহিকতায় দুস্থ নারীদের মধ্যে সেলাই মেশিন এবং ছাত্রদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণের মতো গর্বের কর্মসূচিও রয়েছে এই সংগঠনের।
মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতেও আজকের একদল যুবক আট মাস ধরে নিরলস পরিশ্রম করেছেন। নজরুল ইসলাম, শামসুল হুদা, শামীম আহসান, এরশাদুল আলম, আবদুল করিম, জাকির হোসেন, সৈয়দ রাশেদুল আলম ও মোহাম্মদ ইলিয়াস এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ৪৬ বছরের ইতিহাসে এই দেশে এই প্রথম জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।
স্বাগত বক্তব্য দেন শেখ সেলিম উদ্দিন। সভাপতির বক্তব্যের আগে গোটা অনুষ্ঠানটির ওপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদের ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্র থেকে খবর সম্প্রচার করা হয়। সংবাদ পড়েন নিমাই সরকার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মাহাবুব হাসান হৃদয়। প্রীতিভোজের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়।
● নিমাই সরকার


