আব্বার জন্য তাসবিহ

আব্বার জন্য তাসবিহ

আব্বার জন্য তাসবিহ

আদিল মাহমুদ ● সকাল। সূর্য উদয় হয়েছে মাত্র—তেমন তেজ নেই। চারিদিকে ঘোলাটে পরিবেশ। ঝিরঝিরে মৃদু বাতাস। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। বুক বিদীর্ণ—চোখ বিশীর্ণ। হৃদয়ে শূন্যতার হাহাকার। আজ আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী। ফজরের নামাজের পর কবর জিয়ারত করে এসেছি। এখন শুধু আব্বার কথা মনে পড়ছে—বার বার মনে পড়ছে। আব্বার কথা মনে পড়তেই বুকের ব্যথাটা— ‘যা আব্বার মৃত্যুর পর থেকেই মৃদু মৃদু অনুভূত হচ্ছিলো, সেটা এখন অসহনীয় পর্যায়ে উপনিত হয়েছে।’

আব্বা! খুব জানতে ইচ্ছে করে—এখন আপনি কোথায় আছেন? কেমন আছেন? মনে কি পড়ে না আমাদের কথা? মায়ের কথা? আজকাল বড্ড বেশী মিস করি আপনাকে—দেখতে ইচ্ছে করে। কতটা না কষ্ট করছেন আমাদের জন্য। বিনিময়ে কি কিছুই দিতে পেরেছি আপনাকে? পারিনি! জানি—আপনি কোন কিছু পাবার আশাও করেননি আমাদের কাছে।

আপনাকে যে দিন সাদা কাফন পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো গ্রামের লোকজন, সে দিন অনেক কেঁদেছি—কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছি। ওই কান্নাটুকু ছাড়া আপনাকে দেবার মতো কি ই বা ছিল সে দিন—

ক্যান্সার নামক ভয়ানক এক দানব হুঙ্কার দিয়ে আপনাকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিল। মৃত্যু শয্যায় আপনার যন্ত্রনাকীষ্ট মুখখানি দেখার ও সৌভাগ্য হয়নি। আপনাকে এই জগৎ সংসারে কেউ টিকিয়ে রাখতে পারি নাই আব্বা। আপনি চলে গেলেন মালিকের ডাকে সাড়া দিয়ে। কষ্ট লাগছে খুব—খুব কষ্ট। বুকের ভেতর কান্নাগুলো চেপে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আর কিছুতেই পারছি না আব্বা—বিশ্বাস করো আব্বা। সে দিনই হয়তো শান্তি পাবো, যে দিন আপনার পাশে শুয়ে আমি বলতে পারবো— ‘আব্বা, আপনাকে ভালোবাসি।’

আব্বার প্রতি যতটা না ভালোবাসা কাজ করতো, তার চেয়েও অনেক বেশি কাজ করতো শ্রদ্ধা। আমরা সবাই আব্বাকে প্রচণ্ড ভয় পেতাম। কক্ষনো তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস কারোই হয়নি—স্পর্ধাও দেখাইনি। আব্বা যা ই বলতেন, আমাদের ভাই-বোনদের কাছে তাই ছিলো আইন।

সবারই অনেক মজার স্মৃতি থাকে তাদের আব্বাকে নিয়ে। যেমন— ‘আব্বার কাঁধে চড়ে মেলায় যাওয়া, আঙ্গুল ধরে স্কুলে যাওয়া, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, ইত্যাদি।’ আমারও এসব স্মৃতি আছে। তবে কিছু স্মৃতি এমন আছে, যেগুলো এখনো জ্বলজ্বল করে চোখের সামনে। যে স্মৃতিগুলো শুধুই আব্বাময়।

আব্বা-আব্বু-বাবা-বাজান আরো কত রকম ভাবেই না সম্বোধন করা হয় নিজের জন্মদাতাকে। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে হয়—তৃষ্ণা মিটিয়ে ডাকি, আব্বা! আব্বা! আব্বা! ও আব্বা! আব্বা! বলে—

মনে হয় এ ডাকের ভেতরেই আছে পৃথিবীর সকল শান্তি। আব্বাদের প্রতি সাধারণত মেয়েদের ভালোবাসা বেশি থাকে। ছেলেদের সে তুলনায় কম থাকে। ছেলেরা কোন কিছুই আব্বাকে বলতে সাহস পায় না। তাদের মনের কথা বা তাদের চাওয়া পাওয়া কোন কিছুই আব্বাকে বলতে সাহস হয়ে ওঠে না। আব্বাকে ছেলেরা সাধারনত ভয় পায়। তাদের সব আবদার আম্মাদের কাছে।

আব্বাদেরকে নিয়ে কখনো গল্প লেখা যায় না, যেটা লেখা যায় সেটা হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা। সব ছেলেদের আম্মাদের প্রতি ভালোবাসা বেশি কিন্তু আমার বেলায় ভিন্ন, আমার আব্বার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, ভয়, সম্মান বেশি কাজ করে। সেটা কেন? কি কারণে আমি জানি না—হয়তো তার উত্তর কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন—

আমি আমার আব্বাকে নিয়ে কিছু লিখতে পারি না। চেষ্টা করলেও পারি না—ব্যর্থ হই। এমনকি দুআ করার সময়ও আব্বার জন্য কিছু চাইতে পারি না—বলতে পারি না। শুধু আব্বার চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কেবলই অশ্রু ঝরে। তবে আর কিছু না পারলেও সবসময় এটুকু লেখি—এটুকু বলি— ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ঈয়ানী সাগিরা।’

আব্বার জন্য এটাই আমার তাসবিহ—

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *