স্মৃতি । আহমেদ রিয়াজ
আমাদের প্রিয় সেই আলম তালুকদার
সম্ভবত ১৯৯৬-৯৭ সাল। মিহির কান্তি রাউত দাদা সহ পল্টনে দেখা হলো এক সহকারী সচিবের সঙ্গে। তবে তাঁকে সচিব চোখে নয়, ছড়াকার হিসেবেই দেখি। নিয়মিত পানাহার (পান+আহার) করেন। পানাহারের কারণে মুখটা সবসময় টুকটুকে লাল। তো সচিব মহোদয়সহ আমরা ঢুকলাম পল্টনের বিখ্যাত নোয়াখালী হোটেলে। বিকেলের দিকে নোয়াখালী হোটেলে কচুর সবজি হয়। খেতে দারুণ। কচুর সবজি দিয়ে নানরুটি খেলাম আমরা তিনজন। বিল দেবে কে? আমি আর মিহিরদা চেষ্টা করলাম। কিন্তু সচিব মহোদয়ের কারণে ব্যর্থ হলাম দুজন। আমাদের ঠেলেঠুলে দশাসই শরীর বাগিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন ক্যাশ কাউন্টারে। আমরা পিছনে পড়ে গেলাম। কর্কশ শব্দে বেল বেজে উঠল। আমাদের ঠিক পিছন থেকেই খাবার পরিবেশনকারী চেঁচিয়ে উঠল, ৫২টাকা।
বিল দেওয়ার পর অনেকেই দুচার-টাকা টিপস দেয়। সেই টিপসের আশায় এবার খাবার পরিবেশনকারী আমাদের ঠেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। আমাদের পাশ কাটিয়ে গিয়েও আবার পিছিয়ে এলো। অবাক হলাম। তাহলে কি সে টিপস নেবে না? তখনই কানে এলো সচিব মহোদয়ের সঙ্গে ক্যাশ কাউন্টারে বসা লোকটির দরকষাকষি। সচিব মহোদয় অনুনয় করে বলছেন, ৫২ টাকা বিল তো, ৫০ টাকা রাখেন!
ক্যাশের লোকটি অবাক হয়ে তাকালেন সচিব মহোদয়ের দিকে। নিপাট ভদ্রলোক। ইনকরা শার্ট, জুতোস্থ। হাতে ব্রিফকেস। তবে ওই ব্রিফকেসে কী থাকে সেটা আমরা অনেকেই জানি। লেখা আর নানান পত্রিকায় ঠাসা।
যাই হোক, খাবারের বিল নিয়ে যে মানুষ দরকষাকষি করতে পারে, তার কাছ থেকে টিপস পাওয়ার আশা করা যায় না। উল্টো যদি কম দেওয়া দুটাকা নিজের থেকে দিতে হয়? হয়ত সে কারণেই খাবার পরিবেশনকারী পিছিয়ে এলো। শুধু পিছিয়ে এলো তা-ই নয়, আমাদের ঠেলে এবার আমাদের অনেক পিছনে চলে গেল।
আমি আর মিহিরদা খুব মজা পেলাম বিষয়টায়। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে সচিব মহোদয় সেই পরিবেশনকারীকে বাইরে ডেকে নিলেন। তারপর টিপস দিলেন। এই ছিলেন আলম তালুকদার। সহজ সরল হাসিখুশি মানুষ। কোথাও লেখা ছাপা হলে ভীষণ খুশি হতেন।
আরেকটা ঘটনা। কিশোর বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্বারকগ্রন্থ প্রকাশ হবে। আমি লেখকদের নামসহ তালিকা দিলাম সম্পাদক সাহেবের কাছে। সম্পাদক সাহেব সেখান থেকে বাছাই করে দিলেন কার কার লেখা নিতে হবে। তো বাদ গেলেন আমার প্রিয় এক লেখক সুজন বড়ুয়া। যেদিন শিশুএকাডেমীতে স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন হলো, সেদিন আলম তালুকদার বললেন, সুজনের লেখা নেও নাই কেন? সুজন তো তোমার উপর বিল্লা খায়া আছে।
স্বারকগ্রন্থে আলম তালুকদারের লেখা ছিল কি না মনে নেই। আলম তালুকদার ছড়াকার হিসেবে আমাদের কাছে যতখানি প্রিয় ছিলেন, তারচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন সরেস কথাবার্তার কারণে। তবে তাঁর লেখার মধ্যেও ব্যক্তি আলম তালুকদারের একটা সরলতা আছে। অগ্রণীব্যাংক-শিশুএকাডেমী পুরস্কার পাওয়ার পর কী খুশিটাই না হয়েছিলেন!
শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলে আলম তালুকদারের চেয়ে আমরা অনেকেই অনেক খুশি হতাম। কিন্তু…
অনেক বছরই তো শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয়নি। আলম তালুকদার সেই কোনো এক বছরে পুরস্কারটা পেলে কী কারো ক্ষতি হতো! বরং একজন সৎ মানুষকে সম্মানিত করা হতো। হায়! কাউকে সম্মানিত করার বেলায় আমরা এত কৃপণ কেন?
লেখক : শিশু সাহিত্যিক


