- আব্দুর রহমান রাশেদ
পরিবারের প্রতি আমার তেমন টান নেই, আকর্ষণ নেই, ভালোবাসাও তেমন নেই। পারিবারিক সয়-সম্পত্তিসহ কোন কিছুতেই আমার আগ্রহ নেই। পরিবারে কারো খুশিতে আমার চিত্তে উচ্ছাসের কোন ঢেউ খেলে না, কারো বেদনার্ত ঘটনায় আমার গণ্ডদেশ বেয়ে দুফোঁটা অশ্রুজল গড়িয়েছে এমন বিশেষ কোন স্মৃতি এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না।
আমরা সাত ভাই, এক বোন। মাঝে মাঝে কেউ যখন পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা জানতে চায়, আমি বলি আমরা সাত ভাই-বোন। আমি খেয়াল করেছি, উত্তর শুনে অনেকের চোখ কপালে উঠে যায়। কিছুক্ষণ নীরবতা প্রশ্নকর্তা ও উত্তরদাতার মাঝে নীরব আধিপত্য চালায়। আমি খানিকটা বিব্রতবোধ করি। শেষে তিনি নিরবতা ভেঙে বলেন ‘ও…’।
পরিবারের প্রতি, পরিবারের সদস্য ও তাদের সুখ দুঃখে আমার অনীহার প্রধান কারণ হতে পারে ছোটবেলা থেকেই মাদরাসায় আবাসিক থেকে লেখাপড়া করা, মাদ্রাসায় থেকে পরিবারের আদর, সোহাগ, মায়া-মমতা, স্নেহ-প্রীতির থেকে দূরে, বহুদূরে আমার সঙ্গীহীন একাকী বেড়ে উঠা। যেখানে ছিল না মায়ের মমতা মাখানো ডাক, আদর-সোহাগ মিশ্রিত শাসন, ভাইয়ের স্নেহময় আদর-যত্ন, বোনের আবেগপূর্ণ গল্পকথা। হয়োত এ কারণেই পরিবারের প্রতি আমার অনীহা, অনাগ্রহ। বলো, কীসের দাবীতে, কীসের ভিত্তিতে টান, আকর্ষণ সৃষ্টি হবে?
আমার যখন বয়স বারো-তেরো হলো, এসব বিষয়গুলো আমাকে গভীরভাবে ভাবাতো। আমার ভেতরটাকে উইপোকার মতন আস্তে আস্তে শেষ করে দিচ্ছিল। আমিও নির্জীব কাষ্টখণ্ডের ন্যায় নিজেকে ইউপোকার ধ্বংসলীলায় সোপর্দ করে দিয়েছিলাম। তাতেও যদি আমার ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের খানিকটা প্রায়শ্চিত হয়। দিন দিন বড় হচ্ছি আর আমার ভেতরটার অবস্থা শোচনীয় হচ্ছে। অদৃশ্য সে অবর্ণনীয় ধ্বংসলীলা কেবল আমি অনুভব করতে পারি। বোমায় উড়িয়ে দেয়া ধ্বংস্তুপের বাড়িটির ন্যায় আমার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের অবস্থা।
পরিবারের খুশিতে এখনকার আমিতে মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া উট খোঁজে পাবার পর মরুযাত্রীর অব্যক্ত আনন্দ ও উচ্ছাসের ন্যায় গভীর জয়োল্লাস পর্যবেক্ষণ করি আমার হৃদয়ে।
পড়ালেখার জীবনের অন্তে আমি কিছুটা অনুধাবন করলাম আমাকে কী করতে হবে! পরিবারের থেকে দূরে দূরে আমার অবস্থানই এই শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী। তাই পরিকল্পনা করি, পড়ালেখা শেষ করার পর এক বছর বাড়িতে মা-বাবা, ভাই-বোনদের সাথে থাকবো। তাদের সাথে সুখ-দুখ ভাগাভাগি করবো। একই পাতিলের ভাত খাবো, একই কড়াইয়ের তরকারির ঝোল, মাছ, গোস্ত, ডিম, ডালের স্বাদ নেবো। একই উনুনের আগুনে তৈরী চা-কফি পান করবো। এক ছাদের নীচে রাত্রি যাপন করবো। একই সাবানে ফেনা তুলবো। একই মগ- বালতিতে পানি ঢালবো। তাতেও যদি মায়া মুহব্বাত কিঞ্চিৎ বাড়ে।
কথার ব্যতিক্রম করলাম না। পাক্কা এক বছর বাড়িতে থাকলাম। মা-বাবা, ভাই-বোনদের সাথে অনেক সোনালী মুহুর্ত কাটলো। তাতে মরুর তপ্ত বালির মতো আমার কঠিন অন্তরটাও উর্বর সোনালী মৃত্যিকার ন্যায় হয়ে গেল। নানাবিধ বৃক্ষ জন্মালো। স্মৃতি নামক বৃক্ষে ধীরে ধীরে ডালপালা মেলল, বসন্তের পত্র-পল্লবে সুষভিত, সুসজ্জিত হলো আমার হৃদায়াঙ্গিনা।
এক বছর পর চাকরির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমালাম। এখনকার আমি আর আগের আমিতে ঢেড় ব্যাবধান ধরতে পারি আমি। এখনকার আমিতে পরিবারের জন্য, ভালোবাসা, ত্যাগ, মায়া-মমতা, সহমর্মিতার বিশেষ অস্তিত্ব খোঁজে পাই। পরিবারের খুশিতে এখনকার আমিতে মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া উট খোঁজে পাবার পর মরুযাত্রীর অব্যক্ত আনন্দ ও উচ্ছাসের ন্যায় গভীর জয়োল্লাস পর্যবেক্ষণ করি আমার হৃদয়ে। পরিবারের দুঃখে বর্ণনাতীত অসহ্য যন্ত্রনায় গলাকাটা মুরগীর ন্যায় ধরফড় করতে দেখেছি এখনকার আমিকে।
এক রাতের কথা। যে রাতে মাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখলাম। শেষে একটা স্বপ্ন দেখলাম যেটার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। দেখলাম, আমার অন্তরের প্রশান্তি, আমার চোখের তৃপ্তি, খোদার পক্ষ থেকে আমার সবচাইতে বড় নেয়ামত, আমার মা ইহকালে পাড়ি জমিয়েছেন। আমি স্বপ্নের মধ্যেই আকাশ থেকে পড়লাম। স্বপ্নের মধ্যেই মুহুর্তে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। কিছুক্ষণ পর ঘুম থেকে উঠলাম, জেগেও আমি অনেকক্ষণ কাঁদলাম।
আগে কখনো আমার এমন হয়নি, এমন করে কান্নাও আসেনি….!
আরও পড়ুন: একটি কুকুরের অপেক্ষা


