আমি আল-আকসার মুসল্লি, এটা আমার জন্য মর্যাদার ব্যাপার

আমি আল-আকসার মুসল্লি, এটা আমার জন্য মর্যাদার ব্যাপার

আমি আল-আকসার মুসল্লি, এটা আমার জন্য মর্যাদার ব্যাপার

আবদুল্লাহ মুয়াল্লাফ। ৩৩ বছরের ফিলিস্তিনি যুবক। পরিবারসহ বাস করেন জেরুজালেমে। আল-আকসা মসজিদের অদূরে তাঁদের বাড়ি। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অভিযোগে একাধিকবার গ্রেপ্তারও হয়েছেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ একটি সময় কেটেছে কারাগারে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিতর্কিত ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ঘোষণা করার পর আরব অঞ্চলে নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ফিলিস্তিন নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন তরুণ আলেম বেলায়েত হুসাইন। আরবি ভাষায় নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভাষান্তরও করেছেন তিনি। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে নিজের ছবি প্রকাশে অপারগতা প্রকাশ করেছেন এই ফিলিস্তিনি যুবক। সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ তুলে ধরা হলো পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য-

প্রশ্ন : পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনের নাগরিক হিসেবে আপনার অনুভূতি কী?
উত্তর : ফিলিস্তিন প্রকৃতার্থে কোনো মৌলিক রাষ্ট্র নয়; সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া একটি অঞ্চল। সাইকস-পিকট কর্তৃপক্ষ এর নাম দিয়েছে ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্র’। সুতরাং আমরা ফিলিস্তিনি নাগরিক নই। আমার পূর্বপুরুষরা ছিলেন সিরিয়ার অধিবাসী। আল কুদস আল আকসার শহর—এখান থেকে মহানবী (সা.)-এর মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। সম্মান বিবেচনায় ইসলামের তৃতীয় পবিত্র ভূমি আল কুদস। আলহামদুলিল্লাহ! আমি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করি যে তিনি আমাকে এই শহরের বাসিন্দা করেছেন। আমার গর্ব, আমি আল আকসার মুসল্লি, এটা আমার জন্য অনেক মর্যাদার ব্যাপার।

প্রশ্ন : আল কুদস নবী-রাসুলদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। তাঁদের কোনো স্মৃতিচিহ্ন বা তাঁদের কোনো বংশধারা এখনো টিকে আছে?
উত্তর : আল আকসার চেয়ে বড় স্মৃতিচিহ্ন আর কী আছে! মহানবী (সা.)-এর বংশধারা আজও আল কুদসে বসবাস করে। অন্য নবী-রাসুলের বংশের ব্যাপারে কোনো তথ্য আমার জানা নেই। আল্লাহর প্রশংসা! আমাদের বংশধারা মিসর বিজেতা আমর ইবনুল আস (রা.)-এর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আল আকসার চৌহদ্দির মধ্যে ছোট-বড় সব মিলিয়ে অন্তত ২০০ প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে।

প্রশ্ন : পৃথিবীর বহু মানুষ সোনালি গম্বুজবিশিষ্ট ‘কুব্বাতুস সাখরা’-কে আল আকসা মনে করে। বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক গণমাধ্যমে সেটাকেই আল আকসা হিসেবে দেখানো হয়। বিষয়টি আপনারা কিভাবে দেখেন?
উত্তর : প্রথমে আমাদের আল আকসা চিনতে হবে। আল্লামা ইবনে তাহমিয়া (রহ.) আল আকসার চমত্কার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর নবী সুলাইমান (আ.)-এর তৈরি সম্পূর্ণ ইবাদতস্থলটির নামই হলো মসজিদুল আকসা।’ এই মসজিদের চারপাশে নির্দিষ্ট একটি চৌহদ্দি আছে। চৌহদ্দির ভেতরের সম্পূর্ণ জায়গা সুলাইমান (আ.) কর্তৃক নির্ধারিত। চৌহদ্দি ও তার ভেতরে অবস্থিত পুরো স্থানটি আল আকসার অন্তর্ভুক্ত। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পরে মিরাজকে স্মরণীয় করে রাখতে চৌহদ্দির মধ্যে আরো দুটি স্বতন্ত্র নামাজের স্থান নির্মাণ করা হয়। মিরাজের রাতে বোরাক বাঁধার স্থানে নির্মিত হয় বোরাক মসজিদ এবং যে স্থান থেকে মহানবী (সা.) সরাসরি আকাশে পরিভ্রমণ করেছিলেন—সেখানে নির্মিত হয় মারওয়ানি মসজিদ। এটাই পরবর্তীকালে কুব্বাতুস সাখরা বা ডোম অব দ্য রক হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। সুতরাং মুসলমানের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদ বলতে কিবলি মসজিদ (ধূসর গম্বুজবিশিষ্ট মূল আল আকসা), মারওয়ানি মসজিদ (কুব্বাতুস সাখরা) ও বোরাক মসজিদ—এই তিনটি ইবাদতস্থলের সম্মিলিত স্থানকে বোঝায়। কুব্বাতুস সাখরা নির্মাণ করেন উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান। ৬৯১ সালে এই সুদৃশ্য স্থাপনার নির্মাণ সমাপ্ত হয়।

প্রশ্ন : ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে আপনি একাধিকবার বন্দি হয়েছেন। আপনার জেল-জীবনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
উত্তর : আমি, আমার পরিবার; বলতে গেলে আল কুদসের প্রতিটি মুসলিম পরিবারের প্রায় সব সদস্য অসংখ্যবার গ্রেপ্তার হয়েছে। আমার মা-বাবাও অস্থায়ীভাবে কয়েকবার আটক হয়েছিলেন। ইসরায়েলবিরোধী মার্চে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আমার মাকেও ছয় বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। নির্যাতন সহ্য করতে করতে ফিলিস্তিনিরা সাধারণ অত্যাচারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো নির্যাতন ফিলিস্তিনিদের তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবি থেকে সরাতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ!

প্রশ্ন : ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলিম উম্মাহর কাছে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
উত্তর : আমাদের প্রত্যাশা মুসলিম উম্মাহ এই ন্যায়সংগত আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে থাকবে। এটি শুধু ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা আন্দোলন নয়; মুসলিম উম্মাহর সম্মান ও মর্যাদার প্রশ্নটিও এখানে জড়িত। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় বিশ্বের সামনে ফিলিস্তিন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সুতরাং আমরা সারা বিশ্বের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনি কোনো ধারণা রাখেন?
উত্তর : ফিলিস্তিনের ন্যায়সংগত দাবির পক্ষে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ জোরালো সমর্থন দিয়ে আসছে। এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। এ ছাড়া কাকরাইল মারকাজের নাম শুনেছি। আমার কয়েকজন বন্ধু ও পরিচিতজন ঢাকার ওই মারকাজে গেছেন এবং দ্বিনের দাওয়াত নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশ সফর করেছেন। তাঁদের মুখে বাংলাদেশি মানুষের প্রশংসা শুনেছি এবং ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন আছে বলে জেনেছি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *