কাউসার মাহমুদ একজন কবি, লেখক ও কারুকার্যশীল অনুবাদক। সৌদি আরব প্রবাসী। নানা রকম অভিজ্ঞতায় গুজরানো সময়গুলোকে ‘আরবের দিনলিপি নামে’ অক্ষরবৃত্তে তুলে ধরেছেন পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকমে’র পাঠকদের জন্য। সেই ধারাবাহিকতার আজ ৫ম পর্ব।
আরবের দিনলিপি (পর্ব-৫)
ভাই এলো। গত পরশু এই বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে পৌঁছল আমার অনুজ সহোদর শাওন। কী এক দীর্ঘ যাত্রা পেরিয়ে যে ও এলো, তা বলার শক্তি নেই। বিগত তিনটি বছর ঘুরতে ঘুরতে, নানা তদবীর করে শেষতক আসতে পারলো। এই পুরোটা সময় কী ভীষণ উৎকণ্ঠায় যে আমাদের কেটেছে, তা আর স্মরণ করতে চাই না। ফলে ভাইটি এসেছে তাতেই আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া। আমাদের পরিবারে ওর প্রতি সকলেরই বিশেষ এক মমতা আছে। শৈশবে ওর ভয়াবহ অসুখ। অন্তহীন সময়ের চিকিৎসা। ক্রমশ স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং বছরের পর বছর ক্লান্তিকর অবসর। অতঃপর সবকিছু ছাপিয়ে স্বাভাবিক জীবন। তাই বুঝি ওর দিকে তাকালে আমার এক যোদ্ধার কথাই মনে হয়। এমন যোদ্ধা—যার জীবন সম্বন্ধীয় কোনও জ্ঞানই নেই। কিন্তু ধৈর্য্যে অসীম। যার যুদ্ধের কোনও কৌশলই রপ্ত নেই। তবু সমস্ত বৈরিতাকে অবচেতনেই মোকাবেলা করে ফেলেছে। যে জানেও না, জীবনের পথে তার যে দুর্দম অতিক্রমণ—তা কতোটা বীরত্বের। ফলে যেসব নির্মম দিন আর শৈশব-কৈশোর পেছনে ফেলে এসেছে, যুবা বয়সের এই প্রারম্ভে বোধকরি সেসবের সামান্য স্মৃতিই মনে আছে ওর। কেননা, যে বয়সে শিশুরা বাড়ির আঙিনায় খেলা করে, যে বয়সে কিশোর বনেবাদাড়ে উদ্যাম ঘুরে বেড়ায়, সে বয়সের পূর্ণ সময়টাতে তো নানা হাসপাতালেই ঘুরে-ফিরে কাটিয়েছে ও। অজস্র চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে শরীরে। মহান প্রভুর অশেষ কৃপায় পরীক্ষার মতই যা উতরে গেছে । ফলে নান্দনিক স্মৃতির বিপরীতে প্রভূত চিকিৎসাই ওর স্মৃতিতে থাকার কথা। স্বভাবতই যা শিশুরা ভুলে যায়৷ কিশোরেরা কিয়দংশ মনে রাখে। পরিণতারা সমস্ত জীবন ধরে সে স্মৃতিই বয়ে বেড়ায়। সে হিসেবে আমার ভাইটিও ওসব ভুলে গেছে নিশ্চয়। কিংবা আবছা আলোর মত এখনও বোধহয় ওর মানসে রয়ে গেছে কিছু চিহ্ন। যা ওকে জীবনের পথে আরও অদম্য করে তুলেছে। যেন মানুষ যে আসন্ন ভয় ও দুশ্চিন্তার বোঝা সারাটাজীবন বয়ে বেড়ায়, বয়সের আগেই ও তা দেখে ফেলেছে। যদিও নিজের মনস্তাত্ত্বিক এ পর্যায়কাল এবং এর পরিণাম সম্বন্ধে নূন্যতম সংবেদ ওর নেই, তবে তা ঠিকই লক্ষ করেছি আমি। আতশিকাচের নীচে ওর বহু ক্রিয়াকর্মই পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি যে, আমাদের তুলনায় বেশি উচ্চাকাঙ্খী। অধিকতর পরিশ্রমী। সংযমী ও নির্ভীক। সমস্যার মুখোমুখি কিংবা আচমকা আঘাত পেলে ভেঙে পড়ে না। বিপরীতে তা নিরসনে আরও তৎপর হয়ে ওঠে। নইলে জীবনের যে আলো শৈশবে হারিয়েছে, যৌবনে ওকে তা উদ্দীপ্ত করবে কেন? কেন সংসারের দিকে চেয়ে পেটে-পিঠে শল্যচিকিৎসার সেলাই নিয়ে এই দূরদেশে আসবে?
হ্যাঁ, এ সত্যি যে আমাদের বহু সীমাবদ্ধতা আছে। সংসারে আমাদের অনটন নেই, তবে পাহাড়সম ঋণ আছে। তা পরিশোধে দিনরাত্রি খেটেখুটে আমি যে বিলীন হয়ে যাচ্ছি, আমার ভাইটি নিশ্চয় তা লক্ষ করেছে। নিজের যাপনের সম্পূর্ণ চিত্র যদিও আড়ালে রেখেছি, তবু বুদ্ধিমানের মত ঠিকই তা হাতড়ে নিয়েছে। সেকারণেই সম্ভবত ওর এই সিদ্ধান্ত। প্রবাস যাপনের আগ্রহ। নইলে ওর প্রতি বস্ততপক্ষেই কোনও বলপ্রয়োগ ছিল না আমাদের। বিশেষত আমার।
ভাই, ভাইয়ের বুকে এসেছে ঠিক। কিন্তু পরদেশে যে করুণ অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, প্রথমদিকে নিত্যই যে বিভীষিকাময় দুরবস্থা এসে মনে ও শরীরে হানা দেয়—আমার ভাই তা উতরে যেতে পারবে তো?
অতএব, যেহেতু এ মরুর দেশে এলোই, অভ্যস্থ জীবন থেকে বেরিয়ে আনজান এক জীবনের পথে হাঁটলোই—তাতে কিঞ্চিৎ বেদনার উদ্রেক হলেও, ওর প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। বিশ্বাস করি, এই যাত্রাতেও ওর জয় হবে। যে আশা নিয়ে এই দেশে এসেছে তা সম্পূর্ণ করবে। সর্বোপরি ইতোপূর্বে যে পরিশ্রমী মনোভাব ওর মাঝে প্রোথিত ছিল, তার পুনঃপুন প্রকাশ যদি ঘটাতে পারে—তাহলে নিশ্চয় সাফল্য পদচুম্ববন করবে। সাফল্য বলতে অবশ্যই আর্থিক স্বচ্ছলতা উদ্দেশ্য। সমস্ত সঙ্কট কাটিয়ে জীবনের প্রাচুর্যতা। যা অর্জন করতে পারলে জগতের সবচেয়ে সুখী হব আমি।
যে সুখ সম্বন্ধে মাঝেমাঝে ভাবি, মানুষ নানাভাবে আশীর্বাদপুষ্ট হয়। টাকাকড়ি, ধনদৌলত, সন্তানসন্ততি ইত্যকার বস্তু ও বিষয়আশয় সে আশীর্বাদের কারণ হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রভু আমায় সৌভাগ্যবান করেছেন আমার পিতামাতা আর দুটি ভাই দিয়ে। তাতে জীবনের এই পর্যায়ে এসে এখন আরও প্রবলভাবে বাঁচতে ইচ্ছে করে। বাঁচতে ইচ্ছে করে বাবা-মা, ভাইদের জন্য। তাঁদের যাবতীয় আহ্লাদ, বাসনা পূরণের যে তীব্র সাধ ভেতরে নিয়ে হাঁটি, পথেরা সে কথা জানলে প্রশস্ত হয়ে যেত। নগরীর সমস্ত ফটক আপসেই উন্মুক্ত হয়ে রত। পার্থিব আনন্দরা উন্মুখ হয়ে থাকত, কবে তাদের ছোঁব এই আশায়। যেন বেলুনের মত হাওয়ায় উড়িয়ে উড়িয়ে তাদের পৌঁছে দেব আমার পরিবারের কাছে।
সে যাহোক, আমার সহোদর দুজনও নিশ্চয় আমার মতই ভাবে। আমার মতই ওরা ভাতৃত্ব আর বাবা-মাকে নিয়ে কল্পনা করে। সে কল্পনা থেকেই তো মেজোটার এই দেশে আসা। ফলে যবে থেকে ও এখানে এসেছে, ওর দিকে তাকালেই গভীর এক উদ্বেগমাখা আনন্দের অনুভূতি হচ্ছে। ভাই, ভাইয়ের বুকে এসেছে ঠিক। কিন্তু পরদেশে যে করুণ অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, প্রথমদিকে নিত্যই যে বিভীষিকাময় দুরবস্থা এসে মনে ও শরীরে হানা দেয়—আমার ভাই তা উতরে যেতে পারবে তো? পারবে জানি। তবু কী এক অদৃশ্য ভয় যে সবসময় তাড়া করে আমায়, তা কি আর কাউকে বোঝাতে পারি? হয়তো এ আমার দুর্বলচিত্তের দুর্গতি। কিংবা সহোদরের প্রতি অধিক মমতা। ফলত, যখন এই লেখা লিখছি, তখন খুব করে মনে পড়ছে ব্রিটিশ কবি রবার্ট উইলিয়ামের ‘Little Brother’ কবিতাটি। তাতে প্রথম স্তবকে তিনি ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলছেন :
Wars have been and wars will be
Till the human race is run;
Battles red by land and sea,
Never peace beneath the sun.
I am old and little care;
I’ll be cold, my lips be dumb:
Brother mine, beware, beware . . .
Evil looms the wrath to come.
সম্পূর্ণ কবিতাটিতে যদিও কবি তাঁর ভাইকে এমন এক পৃথিবীর সতর্ক করছেন, যা গোলমেলে। ভয়ংকর, হিংস্র আর যুদ্ধগ্রস্থ। তবু আমি তাঁর প্রথম দুটি পঙক্তিই নেব। প্রবাস যাপনের এই সূচনালগ্নে ভাইকে বোঝাব, যুদ্ধ ছিল, যুদ্ধ থাকবে। যুদ্ধ হয়েছিল, যুদ্ধ হবে। যতদিন পৃথিবীতে হিউম্যান রেস থাকে। তাই প্রজ্ঞার সাথে এই পথ পাড়ি দাও৷ হৃদয় স্থির করো। বিবাদ এড়াতে সর্বদা কৌশলী হও। কর্মে নিমগ্ন থাকো। যেখানে এসেছো, সেখানে তোমার একমাত্র অবলম্বনই হলো সততা। সাফল্য হলো ক্রমাগত পরিশ্রম, পরিশ্রম আর পরিশ্রম।
১৩ অক্টোবর শুক্রবার, ২০২৩
(চলবে…)
লেখক: কবি, গদ্যশিল্পী ও অনুবাদক
এই ধারাবাহিকের পূর্বের লেখাগুলো পড়ুন:


