পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম: বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নেওয়া সংস্কার-কার্যক্রম মোটা দাগে সঠিক পথেই এগোচ্ছে। চলমান সংস্কারের এই কার্যক্রম আর্থিক খাতে দুর্বলতাগুলোর প্রতি নিবদ্ধ হওয়া উচিত, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে তদারকি, তত্ত্বাবধান ও সুশাসনে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এমনটাই উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ওয়াশিংটনে আইএমএফের প্রধান কার্যালয়ে মঙ্গলবার সংস্থাটির নির্বাহী পর্ষদের বৈঠকে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের বিষয়টি অনুমোদন করেছে আইএমএফ। অনুমোদনের পর সংস্থাটির দেওয়া বিবৃতিতে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, রিজার্ভ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হবে। মধ্য মেয়াদে অন্তত চার মাসের আমদানি দায় মেটানোর মতো রিজার্ভ থাকবে বলে প্রত্যাশা আইএমএফের। বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও প্রভাবিত হয়েছে।
স্বল্প মেয়াদে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে মুদ্রানীতির রাশ টেনে ধরার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। এর সঙ্গে সহায়ক নীতি হিসেবে নিরপেক্ষ রাজস্ব নীতি ও মুদ্রার বিনিময় মূল্যের ক্ষেত্রে আরও নমনীয় হওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি। তবে মুদ্রানীতির কাঠামো আরও আধুনিকায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে আইএমএফ। মুদ্রানীতি আধুনিক হলে তার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির প্রভাব জোরদার হবে। মুদ্রার একক বিনিময় হার গ্রহণের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে আইএমএফ এক্ষেত্রে ধাপে ধাপে আরও নমনীয় হওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। তারা মনে করে, অর্থনীতির বহিস্থ ধাক্কা মোকাবিলায় এটি জরুরি।
বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে ৬৮ কোটি ৯৮ লাখ মার্কিন ডলার ছাড় করেছে আইএমএফ। বর্ধিত ঋণসহায়তা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সহায়তা (ইএফএফ) ও রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ) এ তিনটি ভাগে ঋণ দিচ্ছে আইএমএফ। এবার ইসিএফ বা ইএফএফের আওতায় ৪৬ কোটি ৮৩ লাখ ডলার এবং আরএসএফের আওতায় ২২ কোটি ১৫ লাখ সব মিলিয়ে ৬৮ কোটি ৯৮ লাখ ডলার ঋণ ছাড় করেছে আইএমএফ।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের ছয় শতাংশ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমতির দিকে থাকলেও রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। কঠোর মুদ্রানীতি ও নিরপেক্ষ রাজস্ব নীতির কল্যাণে মূল্যস্ফীতির হার আগামী অর্থবছরের শেষ নাগাদ ৭.২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। রাজস্বঘাটতি জিডিপির ৪.৬ শতাংশের মধ্যে থাকবে।
উন্নয়নের জন্য দেশে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এ বাস্তবতায় আইএমএফ মনে করে, আর্থিক খাতের সংস্কার জরুরি। ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমাতে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি পুঁজি পুনরুদ্ধারে বিশেষ কৌশল প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখী বাহ্যিক আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইএমএফের পরিচালকেরা মনে করেন, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সংস্থাটির শর্ত পরিপালনে বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে পথচ্যুত হয়নি। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ যেসব সংশোধনমূলক ব্যবস্থা হাতে নিয়েছে এবং জরুরি সংস্কার বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে, তাকে স্বাগত জানিয়েছে সংস্থাটি।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন আইএমএফসহ বিভিন্ন উত্স থেকে চলতি ডিসেম্বর মাসে ১.৩১ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শুক্রবারের (১৫ ডিসেম্বর) মধ্যে আইএমএফ থেকে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার পাওয়া যাবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকেও ৪০ কোটি ডলার এ মাসেই পাওয়া যাবে। এছাড়া ৯ কোটি ডলার পাওয়া যাবে সাউথ কোরিয়া থেকে। এর বাইরে অন্যান্য উৎস থেকে আরও ১৩ কোটি ডলার পাওয়া যাবে।
মেজবাউল হক বলেন, বর্তমানে আমাদের রিজার্ভ বিপিএম-৬ অনুযায়ী ১৯ বিলিয়নের মতো। এসব ঋণসুবিধা পাওয়ার পর আমাদের রিজার্ভ বাড়বে। তবে এ মাসে বড় পরিমাণে ডলার খরচ হবে আকু (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) বিল পরিশোধ বাবদ। সেখানে রিজার্ভ থেকে খরচ হবে এক বিলিয়নের মতো।


