আল্লাহ কারো সম্পত্তি না, আল্লাহ সবার

আল্লাহ কারো সম্পত্তি না, আল্লাহ সবার

আল্লাহ কারো সম্পত্তি না, আল্লাহ সবার

মুহাম্মাদ আইয়ুব :: শাকিলকে আমি চারমাসে বহুবার নামাজের দাওয়াত দিয়েছি। রাস্তাঘাটে, বাজারে এমনকি বাড়িতে যেয়েও। কিন্তু শুক্রবার ছাড়া সে কোনদিন আমার ডাকে সাড়া দেয়নি। একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে যোহরের নামাজে হাজির শাকিল।

নামাজের পর আমাকে নিরিবিলি পেয়ে বলল, হুজুর! আমাকে একটু সময় দিতে পারবেন? কিছু কথা ছিল। শাকিলকে হাতের মুঠোয় পেয়ে আমি তো ভীষণ খুশি। বললাম, তোমার জন্য আমার সারাদিন সারারাত বরাদ্দ। তুমি কখন আসতে পারবে? বলল, আজ এশার পরে আসি? বললাম, ওকে, রাতে কিন্তু আমার সাথেই খাবার খাবে।

এশার পর রুমে আসতেই শাকিল আমার হাত ধরে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। তার এ কান্নার কোন হেতু বুঝতে পারলাম না। মনের ভিতর অনেক কষ্ট জমা আছে ভেবে ওকে কাঁদার অবাধ সুযোগ করে দিলাম। কেঁদে কেঁদে মনটা হালকা করুক। অনেকক্ষণ হাউমাউ করে কান্নার পর বলল, হুজুর! আমাকে আপনি পবিত্র করুন। আমার মত নিকৃষ্ট কেউ এই জমিনে নাই।

– শাকিল! শান্ত হও। খুলে বল কি হয়েছে?

– হুজুর! অনেকদিন ধরে ভাবছি আপনার কাছে আসব কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে আমি খুব শরম পাচ্ছিলাম যে, আপনার কাছে কিভাবে বলব? কিন্তু মনের ভিতর দাউদাউ করে জ্বলা অশান্তির আগুন আমাকে আপনার কাছে আসতে বাধ্য করেছে।

– তুমি চাইলে নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে আমাকে বলতে পার। মনে হয় আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা আস্থা আছে বিধায় তুমি আমার কাছে এসেছ।

– জ্বি হুজুর! আমি হয়ত আপনার দাওয়াতে মসজিদে আসতাম না কিন্তু বন্ধুদের বলতাম এই হুজুরের মত হুজুর হয় না। আমরা তার কাছে যাই না অথচ তিনি বারবার আমাদের কাছে আসে, দাওয়াত দেয়।

– এবার তুমি তোমার সমস্যার কথা বল।

– হুজুর! আমি আজ অনেক বছর ধরে মোবাইলে দিন-রাত অশ্লীল ভিডিও দেখি। এবং এটা আমার কাছে নেশার মতো হয়ে গেছে। রাতে এগুলো না দেখলে আমার ঘুম আসে না।

– শাকিল! আজ কত বছর যাবত এগুলো দেখ?

– এই ধরেন ছয় বছর।

– সপ্তাহে কতদিন দেখ?

– এটা তো হিসাব করি না তবে দিনে অন্তত তিন থেকে চারবার দেখি।

– কত ঘন্টা যাবত দেখ?

– রাতে বেশি সময় দেখি। তিন থেকে চার ঘন্টা। প্রথম প্রথম আধাঘন্টা একঘন্টা দেখতাম তারপর হস্তমৈথুন করতাম। আর এখন তিন চার ঘন্টা দেখলেও শরীর উত্তেজিত হয় না।

আগে হুজুর, বন্ধু বান্ধব সবাইকে নিয়ে খুব আনন্দ উল্লাস করতাম, মজা করতাম, খেলাধুলা করতাম আর এখন কেমনে যেন এই নেশায় ঢুকে জীবনের সব আনন্দ বেদনায় কোন অনুভূতি, অনুভব আসে না। এগুলো আমি বুঝি কিন্তু রাত যখন আসে তখন নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারি না। আপনি যে আমাদের তাবলীগে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তখন বাসা থেকেও আমাকে অনুমতি দিয়েছিল কিন্তু ভাবলাম তাবলীগে যেয়ে তো আমি দেখতে পারব না তাই আপনার কাছে মিথ্যা বলে আমি যাইনি।

– তুমি তো বিয়ে করতে পার?

– হুজুর! বিয়ে শাদি ঝামেলার কাজ তাছাড়া ক্যাশপাতি ও তো নাই যে, সংসার চালাব!

– তোমার বন্ধুদের কি অবস্থা?

– একই অবস্থা হুজুর।

আমরা যখন পরস্পর একত্রিত হই তখন আমাদের গল্পের বা কথাবার্তার অধিকাংশ বিষয় থাকে এই পর্নো সম্পর্কে। আমার এক দোস্ত আছে তুহিন নামে। ও আজ তিন বছর হয়েছে বিয়ে করেছে। ওর একটা মেয়েও আছে অথচ রাতে ও ওর বউকে ঘুম পাড়িয়ে এসব অশ্লীল ভিডিও দেখে! অথচ ওর বউটাকে পরীর মতো দেখায়।

একথা শুনে আমি এক নাগাড়ে শাকিলের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম। মনে পড়ে গেল রাসূল সা. এর সেই হাদিসখানা যেখানে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন যে, কিয়ামতের পূর্বক্ষণে নগ্নতা ও অশ্লীলতার ব্যাপক প্রচার ঘটবে।

হাদিস শরিফে এসেছে, নিশ্চয়ই এসব কিয়ামতের আলামত যে একসময় কৃপণতা ও অশ্লীলতা প্রকাশ পাবে। খিয়ানতকারীকে আমানতদার মনে করা হবে। আমানতদারকে খিয়ানতকারী মনে করা হবে। নারীদের নতুন নতুন পোশাকের উদ্ভব ঘটবে, যেগুলো পরিধান করে নারীরা বস্ত্রাবৃত হয়েও নগ্ন থাকবে। নিকৃষ্ট লোকেরা অভিজাত লোকদের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। (তাবরানি আওসাত, হাদিস : ৭৪৮৯)

অন্য হাদিসে এসেছে, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, জাহান্নামিদের মধ্যে দুটি দলকে আমি দেখিনি। (কিয়ামতের আগে তাদের আবির্ভাব ঘটবে) এক দলের কাছে গরুর লেজের মতো চাবুক থাকবে, সেগুলো দিয়ে তারা মানুষকে প্রহার করতে থাকবে। আরেক দল হলো, এমন সব নারী, যারা কাপড় পরিহিত হবে অথচ তারা প্রকৃত অর্থে নগ্ন থাকবে। তারা পুরুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইবে, নিজেরাও পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হবে। তাদের চুলের খোঁপা উটের চুট ও কুঁজের মতো একদিকে হেলে থাকবে। তারা জান্নাতে যাবে না। জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ বহুদূর থেকে পাওয়া যাবে। (মুসলিম শরিফ : ৪/২১৯২)

অথচ অশ্লীলতা আল্লাহ পাক একদম পছন্দ করেন না।আর যারা এগুলো করে ও মুসলমানদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চায় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাক কঠিন হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, ‘যারা ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার পছন্দ করে, তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ১৯)

– হুজুর! তাছাড়া এই নেশায় জড়ানোর পর থেকে আমার ছাত্র জীবন শেষ। আয় রোজগারে কোন উন্নতি নাই। সবসময় ঋণ আর ঋণ। আব্বা মা কত কিছু বলে কিন্তু ওসব আর গায়ে লাগে না।

– শাকিল! আমি এখন তোমার কি উপকার করতে পারি?

– হুজুর! আপনারা হইলেন আল্লাহর লোক, দয়া করে আল্লাহর থেকে একটু মাফ এনে দেন।

– দেখ শাকিল! আল্লাহ পাক কারো একার সম্পত্তি না। আল্লাহ পাক সবার সুতরাং তুমি চাইলে হবে না আর আমি চাইলে হবে বিষয়টা এমন না। তুমি আল্লাহকে নিজের মনে করে হৃদয় থেকে একটা ডাক দাও। দেখ আল্লাহ তোমার ডাকে অবশ্যই সাড়া দিবেন। আর তুমি যখন আমার চেম্বারে আসছই। সুতরাং আমি তোমার ট্রিটমেন্ট করব তবে শর্ত হচ্ছে যে ঔষধ দিব সেটাকে পূর্ণ করতে হবে।

– হুজুর! এর জন্য আবার কি ঔষধ?!

– মানুষের রোগ দুই ধরনের; এক. শারীরিক দুই. আত্মিক। শারীরিক আমরা টের পাই। হাজার হাজার টাকা খরচ করে ডাক্তারের কাছে যাই। আর আত্মিক রোগে ৯৯.৯৯% মানুষ আক্রান্ত অথচ বুঝমান ছাড়া খুব কম মানুষই আধ্যাত্মিক চিকিৎসা করায়। আমরা কোন আলেম, আল্লাহর ওলীর কাছে যাই না তবে শর্টকাটে আত্মিক রোগ থেকে মুক্তি পেতে কেউ কেউ গলায় ফাঁস নেয়, ছুরি নেয়, বন্দুকের গুলি খায় অথচ এর কোনটাই চূড়ান্ত সমাধান তো নয়ই বরং চূড়ান্ত শাস্তির ব্যবস্থা। তাই এখন আমি তোমাকে তোমার পর্নাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রাথমিক কিছু ঔষধ দিচ্ছি। আজ কি বার?

– রবিবার।

– তোমাকে আমি এক সপ্তাহের ঔষধ দেব।

১. তুমি আগামী শুক্রবার আছরের নামাযের আগে আগেই দশ হাজার বার এক মনে এক ধ্যানে দোয়ায়ে ইউনুস পড়বে। ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায জোয়ালিমীন’ প্রতিবার পড়ার সময় ধ্যান করার চেষ্টা করবে যে, তুমি অথৈ সাগরে ডুবে যাচ্ছ। আল্লাহ ছাড়া এখান থেকে বাঁচানোর আর কেউ নেই।

২. এই ছয়দিন সাধ্যানুযায়ী দান সদকা করবে এবং মনে মনে নিয়ত করবে যে, আল্লাহ আমি হেদায়েত পাওয়ার আশায় দান সদকা করছি আপনি কবুল করে নিন।

৩. যথাসম্ভব এই কয়দিন ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে দূরে থাকবে।

৪. শুক্রবার আছর থেকে মাগরিবের আজানের আধঘন্টা আগ পর্যন্ত দুরুদ শরীফ পড়বে। তারপর আল্লাহর কাছে হাত তুলে আজকে যেমন কান্না করেছ সেইরকম ভাবে কান্না করবে।

এশার নামাজের পর এই এক সপ্তাহে তোমার মনের অবস্থা কেমন হয়েছে সেটা জানাবে। তারপর দ্বিতীয় ধাপে ঔষধ দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *