‘আমি তো তোমাকে বিশ্ব জগতের প্রতি শুধু রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি’
চৈত্রের কাঠফাটা রোদে বৃষ্টির জন্য যেমন কৃষক আসমানে ঘন ঘন তাকায় ঠিক তেমনি ৫৭১ খৃষ্টাব্দের আগের সময়কার মানুষরাও একজন মানবদরদী মানুষের অপেক্ষায় যুগ যুগ পার করে দিয়েছিল, ঘন ঘন আসমানে তাকাত যে, কবে আসমানওয়ালা তাদের প্রতীক্ষিত মানব ধরার বুকে পাঠাবেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পালা শেষ হল ৫৭১ খৃষ্টাব্দে মহানবীর ভূমিষ্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে। আর আল্লাহ পাক ঘোষণা দিয়ে দিলেন, ” আমি তো তোমাকে বিশ্ব জগতের প্রতি শুধু রহমত রূপেই প্রেরণ করেছি( সূরা আম্বিয়া-১০৭)
মহানবী বিশ্ববাসীর জন্য যে রহমত স্বরূপ এর নমুনা রাসূলে পাক সাঃ এর সীরাত মুবারক। সংক্ষিপ্ত এ লেখায় তা চিত্রায়িত করা অসম্ভব। তবে কয়েকটি ঘটনায় আমি চমক দেখাতে পারি। তাহলে দেরি কেন? চলুন তাহলে মহানবীর (সাঃ) রহমতের কয়েক ঝলক আপনাদের দেখাই। শুরুতেই আমরা চলে যাবে সরাসরি খন্দক যুদ্ধের পটভূমিতে হযরত জাবের (রাঃ) এর কাছে। এবং তাঁর মুখ থেকেই শুনব মহানবীর(সাঃ) ভালবাসার, মানবতার, স্বজাতীর প্রতি সজাগ খেয়ালের গল্প।
জাবের রাঃ বলেন, খন্দক যুদ্ধের প্রাক্কালে আমরা পরিখা খনন করছিলাম, এমন সময় একটা শক্ত পাথর দেখা দিল। তখন সঙ্গীরা রাসূল সাঃ এর কাছে বলল, পরিখা খনন কালে একটা শক্ত পাথর পাওয়া গেছে। তিনি বললেন, আচ্ছা আমি নিজেই পরিখার ভিতর নামব। অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন। সে সময় তাঁর পেটে পাথর বাঁধা ছিল। আর আমরাও তখন তিনদিন পর্যন্ত কিছু খেতে পাইনি। রাসূল সাঃ কোদাল হাতে নিয়ে পাথরটির উপর আঘাত করলে তা চূর্ণ- বিচূর্ণ হয়ে বালুকণায় পরিণত হয়।
জাবের রাঃ বলেন, আমি আমার স্ত্রীর নিকট এসে বললাম তোমার কাছে খাওয়ার কিছু আছে কি? আমি রাসূল সাঃ কে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখলাম! তখন সে চামড়ার পাত্র হতে এক সা’ পরিমাণ যব বের করল। আমাদের একটি মোটাতাজা বকরীর বাচ্চা ছিল, তা আমি জবাই করলাম আর আমার স্ত্রী জব পিষল। অবশেষে আমরা হাঁড়িতে গোশত চড়ালাম। এদিকে আমি চুপিচুপি রাসূল সাঃ এর কাছে এসে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমরা একটি বকরীর বাচ্চা জবাই করেছি। আর এক সা’ জব ছিল, আমার স্ত্রী পিষেছে। সুতরাং আপনি আমার মেহমান, সাথে কয়েকজনকে নিয়ে আমার বাড়িতে চলুন।
মায়ার নবী, মমতার নবী সঙ্গীদের উচ্চস্বরে ডেকে বললেন, জাবের তোমাদের জন্য খাবার তৈরী করেছে তাড়াতাড়ি চল। জাবের রাঃ বলেন, রাসূল সাঃ আমাকে বললেন, তুমি বাড়িতে যাও। আর আমি না আসা পর্যন্ত গোস্তের হাঁড়ি নামাবেনা এবং খামির থেকে রুটিও তৈরী করবেনা।
এরপর মহানবী (সাঃ) সাহাবাদের (রাযিঃ) নিয়ে আমার বাড়িতে উপস্থিত হলেন। তখন আমার স্ত্রী খামিরাগুলো রাসূল (সাঃ) এর সামনে দিলে তিনি তাঁর লালা মোবারক তাতে মিশিয়ে বরকতের দোআ করে দিলেন। এবং বললেন, তুমি তোমার সাথে আরো রুটি প্রস্তুতকারীনীদের ডাক যারা তোমার সাথে রুটি বানাবে। আর আমাকে বললেন, (জাবের রাঃ) চুলার উপর থেকে ডেকচি না নামিয়ে তুমি তা থেকে তরকারি বিতরণ কর।
জাবের রাঃ বলেন, সাহাবিদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। আমি আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, সকলে তৃপ্তি সহকারে আহার করার পরও ডেকচি ভর্তি তরকারি ছিল। এবং আটার খামিরাও যেই সেই।
(বুখারী ও মুসলিম, মেশকাত শরীফ হাদিস নং ৫৮৭৭)
দয়ালু মনের এমন আরো একটি ঘটনা এখন হযরত আবু হুরাইরা রাঃ এর কন্ঠে শোনা যাক। কারণ? এতে আমাদের ভেতরের মানবাত্মাগুলো ধীরে ধীরে জেগে উঠবে ইনশাআল্লাহ। যদি আমরা নবীজীর (সাঃ) ভেজাল উম্মত না হয়ে থাকি।
“একদিন প্রচন্ড ক্ষুধায় টিকতে না পেরে রাস্তায় বের হলাম। দেখলাম, হযরত আবু বকর রাঃ আসছেন। সরাসরি ক্ষুধার কথা কিভাবে বলি? তাই কুরআনের একটি আয়াত জিজ্ঞেস করলাম। আয়াত জানাটা মূলত উদ্দেশ্য ছিলনা, উদ্দেশ্য ছিল মলিন আর ক্ষুধার্ত চেহারা দেখে তিনি আমার ক্ষুধার ব্যাপারটা আঁচ করতে পারবেন। কিন্তু না,আবু বকর কিছুই বুঝলেন না। উত্তর দিয়ে সোজা চলে গেলেন।
একটু পর এলেন হযরত ওমর রাঃ। তাঁকেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলামনা। একটি আয়াতের ছুতোয় তাঁরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলাম। কিন্তু তিনিও উত্তর দিয়ে চলে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর দেখলাম রহমতের নবী আসছেন। এবার আমার মনে আশা জাগল, ক্ষুধার্ত মলিন চেহারাটা একটু উজ্জ্বল হল। তাঁরা দুইজন বুঝতে না পারলেও পেয়ারা নবী আমার চেহারা দেখে মনের কথা বুঝে ফেললেন। মুচকি হেসে বললেন, আবু হুরায়রা!
: লাব্বাইক ইয়া রাসুলুল্লাহ।
: চলো আমার সাথে।
নবীজীর পিছে পিছে চলতে লাগলাম। নবীজী গৃহে প্রবেশ করলেন। অনুমতি নিয়ে আমিও। নবীজী দেখলেন ঘরে এক গ্লাস দুধ। জিজ্ঞাসা করলেন কোত্থেকে এল? ভেতর থেকে উত্তর এল, অমুকে আমাদেরকে হাদিয়া দিয়েছে।
নবীজী আমাকে বললেন, মসজিদে আসহাবে সুফফার যারা আছে সবাইকে ডেকে আনো। এ কথা শুনে ভিতরে ভিতরে আমি একটু দমে গেলাম। এক পেয়ালা দুধ! আবার সবাইকে ডাকতে বলছেন!! আবার আমাকেই বলবেন, সবাইকে পান করাও!!! শেষে আমি?! যত যাই হোক এত আমার মনিবের নির্দেশ।
আকাশের মত হৃদয় দরকার নাই; আপনি এখন যে রুমে আছেন, সে রুমের ছাদ পরিমাণ দয়া ও যদি আপনার ভিতর থাকে তাতেও বোধহয় আশপাশের কেউ না খেয়ে থাকবেনা ইনশাআল্লাহ।
আমি সবাইকে ডেকে আনলাম। নবীজী বললেন এবার সবাইকে পান করাও। আমি একজন একজন করে সবার কাছে পেয়ালাটা নিয়ে গেলাম এবং সবাই তৃপ্তি সহকারে পান করল, এই দেখে আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল, এই বুঝি শেষ হয়ে যায়! কিন্তু না, সবাই তৃপ্তি সহকারে পান করার পরও দুধ শেষ হল না। এবার আমি পেয়ালা নবীজীর হাতে দিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, আবু হুরাইরা!
আর কে বাকি, আমি আর তুমি?
-বললাম, জ্বি ইয়া রাসুলুল্লাহ!
– আচ্ছা বস, আগে তুমি পান কর।
আমি পান করলাম। নবীজী বললেন, আরো পান কর।
আমি আরো পান করলাম।
নবীজী আবারও পান করতে বললেন,আমি পান করলাম। নবীজী আবারও বললেন, এবার আর পারলাম না। আমার ফাইনাল কথা। ইয়া রাসুলুল্লাহ! ঐ সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আমি আর পারছিনা।
কী বিস্ময়কর! এত মানুষ পান করার পরও পেয়ালায় যতটুকু দুধ ছিল ততটুকুই রয়ে গেল।
নবীজী বললেন, এবার আমাকে দাও। নবীজী পেয়ালা হাতে নিলেন এবং তাতে চুমুক দিলেন।’
(বুখারী শরীফ, হাদিস ৫৩৭৫,৬২৪৬,৬৪৫২৷ তিরমিযী শরীফ, হাদিস ২৪৭৭)
প্রিয় পাঠক! কি বুঝলেন? চাল-ডাল, তেল-পিয়াজ, আলু ইচ্ছামত কিনে গুদামজাত করতে হবে। প্রতিবেশী আর আত্মীয়-স্বজনরা না খেয়ে মরে যাক তাতে আমার কি? মানসিকতা যদি এমন হয় তাহলে কোনদিন ও নিজেকে মানবতার নবী, দয়ার নবী, রাহমাতুল্লীল আ’লামীনের উম্মত দাবী করবেন না প্লিজ! নইলে আপনার মুখে থুতু পড়বে আর পিছনে ডান্ডা। সাবধান!
আকাশের মত হৃদয় দরকার নাই; আপনি এখন যে রুমে আছেন, সে রুমের ছাদ পরিমাণ দয়া ও যদি আপনার ভিতর থাকে তাতেও বোধহয় আশপাশের কেউ না খেয়ে থাকবেনা ইনশাআল্লাহ।
পৃথিবীর এখন একটু মানবতা দরকার। আমার আপনার অংশীদারিত্বে সে শূন্যস্থান পূরণ হতে পারে, বেঁচে যেতে পারে অনেক প্রাণ। পেতে পারি অজস্র নেক দোআ আর হতে পারি আমরা কালের সাক্ষী। তাহলে দেরি কেন? আসুন না এগিয়ে যাই, মানবতার তরে হাতটা বাড়িয়েই দিই।
লেখক : খতিব, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।


