গাজীপুর প্রতিনিধি ● টঙ্গী-গাজীপুরবাসীর শোক স্মৃতির দিন আজ ৭ মে, রোববার। এইদিনেই ঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল একজন আদর্শ শিক্ষক, জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শ্রমিকদের পরমবন্ধু স্থানীয় সংসদ সদস্য শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে। ঘাতকের বুলেট তাকে পৃথিবী থেকে কেড়ে নিয়ে গেলেও তিনি রয়ে গেছেন কোটি মানুষের অন্তরে। প্রতি বছরের এ দিনে সকলের চোখ গড়িয়ে পড়বে অশ্রু। অথচ এই মানুষটিই ১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর থেকে ২০০৪ সালে ৭ মে পর্যন্ত জীবনের বেশিরভাগ সময় মানুষের চোখের অশ্রু মোছার জন্য নিরন্তন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান এই নেতার ১৩তম শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষে আবারও দাবি উঠেছে দ্রুত ঘাতকদের ফাঁসির রায় বাস্তবায়নের। সাধারণ মানুষ দ্রুতই এ হত্যাকাণ্ডের রায় বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
শাহাদাৎবার্ষিকী পালন উপলক্ষে টঙ্গী-গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে আলোচনাসভাসহ নানান কর্মসূচী পালন করা হবে। এ ব্যাপারে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছোটভাই ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. মতিউর রহমান মতি বলেন, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন টঙ্গী ও গাজীপুরের মানুষের হৃদয়ের মণি। মূলত রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লুটার জন্য ঘাতকরা তাকে খুন করেছে। খুনিদেরকে খুব শ্রীঘ্রই ফাঁসির কাঠগড়ায় দেখতে চায় এলাকাবাসী। ১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর আহসান উল্লাহ মাস্টার গাজীপুর সদর উপজেলার হায়দারাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল কাদির পাঠান ও মা বেগম রোসমেতুননেছার ঘর আলোকিত করে তাদের প্রথম সন্তান হিসেবে তিনি পৃথিবীর আলো দেখেন। ছয় ভাই ও বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দুই পুত্র এক কন্যা সন্তানের জনক।
২০০৮ সালের ৭ মে টঙ্গীর এক জনসভায় পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার সন্ত্রাস নির্ভর রাজনীতিকে পেছনে ফেলে ছুটেছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে। সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়েই তিনি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্রবাজির বিরুদ্ধে। এসব কারণে আহসান উল্লাহ মাস্টার হয়ে উঠেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ অবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ পথের কাঁটা দূর করতেই নির্মম হত্যাকা- ঘটায়। সেদিন (২০০৪ সালে ৭ মে) টঙ্গী থানার রেল জংশন রোডের নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন তিনি। দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একদল সশস্ত্র ঘাতক পর্দার সামনে ও পিছন থেকে এলোপাথারি গুলি করে মঞ্চে থাকা নেতাদের লক্ষ্য করে। তখনই আহসান উল্লাহ মাস্টার মঞ্চের পেছন দিকে ঘুরে অস্ত্রধারীদেরকে কঠিনভাবে ধমক দিলে তার বুকে ও পিঠে বেশ কয়েকটি গুলিবিদ্ধ হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন গাজীপুরের প্রিয় নেতা। এরপর তাকে উদ্ধার করে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ঢাকা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসাপাতালে(সিএমএইচএ) নিয়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে।
এ ঘটনায় আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছোট ভাই মতিউর রহমান মতি বাদী হয়ে টঙ্গী থানায় ১৭ জনকে আসামি করে ৮ মে মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ঢাকা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আদালত-১-এর বিচারক শাহেদ নুরুদ্দিন ২০০৫ সালে প্রধান আসামি নূরুল ইসলাম দীপু ও কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা নূরুল ইসলাম সরকারসহ মোট ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। বর্তমানে নূরুল ইসলাম সরকারসহ ১৬ জন কারাগারে এবং প্রধান আসামি নূরুল ইসলাম দীপুসহ ১০ জন পলাতক রয়েছে। এ ছাড়া কারাগারে থাকা অবস্থায় ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ডদেশপ্রাপ্ত আসামি ছোট রতন মারা গেছে। এ ব্যাপারে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছেলে ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, পিতার আদর্শ নিয়ে মানবসেবায় কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু পিতার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক এটা এখন সময়ের দাবি।
মামলার রায় ভিন্ন দিকে নেওয়ার জন্য আসামি পক্ষ মহামান্য হাইকোর্টের রায় থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা তথ্য প্রদান করছে। আমাদের পরিবারের দাবি অচিরেই যেন বাবার হত্যার ঘাতকদের ফাঁসির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এদিকে মামলার বাদী মতিউর রহমান মতি বলেন, আমাদের পরিবারের মতো গাজীপুরবাসীর দাবি অচিরেই যেন হত্যা মামলা আসামিদের ফাঁসি দেয়া হয়। খুনিদের সুষ্ঠু ও সুন্দর বিচার দেখতে চায় গাজীপুরবাসী। আসামিপক্ষের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।


