উন্নত হচ্ছে না শিক্ষার মান

উন্নত হচ্ছে না শিক্ষার মান

বিশেষ প্রতিবেদক ● দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার মান বেশ নি¤œপর্যায়ে। মূলত প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে মানসম্মত শিক্ষকের অভাব খুবই প্রকট। অথচ শিক্ষার গুণগত মান অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষকের যোগ্যতা ও দক্ষতার ওপর। সেজন্য শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকারী শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। কারণ, মাধ্যমিক স্তরেই জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সাথে শিক্ষার্থীর বোঝাপড়ার পর্ব অনেকটাই সম্পন্ন হয়। কিন্তু এদেশের দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম চলছে প্রায় ৩০ শতাংশই অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক দিয়ে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সূত্র মতে, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ে দেশের প্রায় ৪১ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারে না। তার মধ্যে ২৩ দশমিক ৭২ শতাংশ বিদ্যালয় অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করে। আর ১৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বিদ্যালয় বাইরে থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষা নেয়। বর্তমানে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় পাঠদানরত মোট শিক্ষকের সংখ্যা ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৩ জন। তার মধ্যে ৭১ হাজার ৭০২ জন শিক্ষক কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন। ওই হিসাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ শিক্ষক এখনো অপ্রশিক্ষিত। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার মান হতাশাজনক হওয়ার জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবকেই প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা।

সূত্র জানায়, শিক্ষাই হচ্ছে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। সেজন্য শিক্ষার প্রতিটি ধাপেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গ্রহণ অত্যাবশ্যক। আর শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। পাশাপাশি নিয়োগের পরও শিক্ষকদের ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কেননা শিক্ষা প্রতি মুহূর্তেই আপগ্রেড হয়। তাছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন কোনো পদ্ধতি চালু হলে সে বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হয়। কারণ শিক্ষক নিজে না বুঝলে শিক্ষার্থীদের কী পড়াবেন? তাছাড়া এদেশে মাধ্যমিক শিক্ষায় ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের হিসাবেও দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৫, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। সেক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভুটান। দেশটিতে প্রতি ১৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। তার বাইরে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত ৩১:১, নেপালে ২৯:১, পাকিস্তানে ১৯:১ ও শ্রীলংকায় ১৭:১। সূত্র আরো জানায়, পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে অনেক সময়ই শিক্ষার্থীদের যথাযথ পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারায় মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রাথমিকে ভর্তি হওয়া শিশুদের ২০ শতাংশই পঞ্চম শ্রেণী শেষ করার আগে ঝরে পড়ে। মাধ্যমিকে গিয়ে ঝরে পড়ার ওই হার দাঁড়ায় ৪০ শতাংশেরও বেশি। আর উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন না করে ঝরে পড়ছে প্রায় ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী। ওই হিসাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ঝরে পড়ার হার সবচেয়ে বেশি মাধ্যমিক পর্যায়ে। বতমানে দেশে মোট মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২০ হাজার ৪৪৯টি। ওসব বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৬৪। তবে দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। ওসব বিদ্যালয় আর্থিক সংকটের কারণে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে না। উপরন্তু নিয়োগকৃত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনাও ওসব বিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে বিভিন্ন সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এসএম ওয়াহিদুজ্জামান জানান, মাধ্যমিক শিক্ষায় যতোটুকু উন্নয়ন প্রয়োজন ততোটা করা সম্ভব হয়নি। তবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমাতে সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটেও ওই বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আশা করা যায় ওসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যা অনেকটাই কমে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *