উপবৃত্তির মাধ্যমে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বপ্ন পূরণ করছে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা

উপবৃত্তির মাধ্যমে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বপ্ন পূরণ করছে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ● দারিদ্র কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধিতা- কোনটাই আর শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধা নয়। সরকারের শিক্ষা সহায়ক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে শিক্ষার সুযোগ। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি কর্মসূচি শুরু হয়।

সমাজসেবা অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এ কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৪১ জন এবং বার্ষিক বরাদ্দ ছিল ৬ কোটি টাকা। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার এবং বার্ষিক বরাদ্দের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত নয় বছরে প্রতিবন্ধী উপকারভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৫ গুণেরও বেশি। একই সময়ে বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৮ গুণ।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের ছয়ছির গ্রামের রায়হান মিয়া (২২) ছয় ভাই-বোনের মধ্যে চতুর্থ। যথাসময়ে পোলিও টিকা না দেয়ায় দেড় বছর বয়সে শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হন। দারিদ্রের কারণে অল্প বয়সেই তিন বোনের বিয়ে হয়ে যায়। মাধ্যমিকের গ-ি পেরুতে পারেননি অন্য দু’ভাইও। মাধ্যমিক শেষ করার আগেই বাবা আবদুস সালাম মারা যান। অনেক কষ্টে স্থানীয় জাঙ্গালিয়া হাইস্কুল এন্ড কলেজ থেকে ২০০৯ সালে মানবিক শাখায় এসএসসি পাশ করেন রায়হান। এরপর ভর্তি হন একই প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখায়। কিন্তু কেবল টিউশনি করে সংসার এবং পড়াশোনার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় ২০১০ সাল থেকে অর্থ সহায়তা পাচ্ছেন রায়হান। বর্তমানে পাকুন্দিয়া ডিগ্রি কলেজে বিএ (পাস) শেষ বর্ষে পড়ছেন। টিউশনির পাশাপাশি স্থানীয় ফুলকলি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে খন্ডকালীন শিক্ষকতা করে মা ছেলের সংসার চলে।

রায়হান বলেন, কলেজ পর্যায়ে সরকারী উপবৃত্তির টাকা না পেলে এতদূর আসা সম্ভব হতো না।

পাকুন্দিয়া ডিগ্রি কলেজের প্রিন্সিপাল কফিল উদ্দিন বলেন, সহযোগিতা পেলে প্রতিবন্ধীরাও নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে। রায়হান তা করে দেখিয়েছে। তিনি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় সরকারের পাশাপাশি সমাজের স্বচ্ছল ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

প্রীতম চন্দ্র পাল, পঞ্চম শ্রেণি, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ সংযুক্ত হাইস্কুল। সাদা মলাটের ওপর প্রীতম নিজেই লিখেছে শব্দগুলো। গোটা গোটা হাতের অক্ষর দেখে বোঝার উপায় নেই কলম ধরার জন্য পর্যাপ্ত আঙুল প্রীতমের নেই! দুই পা এবং হাতের অপরিণত আঙুল নিয়ে জন্ম প্রীতমের। নিজের অদম্য চেষ্টায় ডান হাতের অস্বাভাবিক আঙুলের ফাঁকে কলম ধরা শিখে নেয় প্রীতম। প্রীতমের বাবা সমীর চন্দ্র পাল ওষুধের দোকানে কাজ করেন। একমাত্র ছেলেকে বিশেষায়িত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর সামর্থ্য নেই তার। কিন্তু প্রীতমের মেধা আর পড়াশুনার প্রতি আগ্রহের কাছে হার মানে এই অক্ষমতা। সমাজসেবা অধিদফতরে যোগাযোগ করে সরকারের উপবৃত্তির আওতাভুক্ত হয় প্রীতম। চতুর্থ শ্রেণি থেকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা পেয়ে আসছে প্রীতম। নিয়মিত উপবৃত্তির টাকা পাওয়ায় পড়াশোনার খরচ নিয়ে এখন আর ভাবতে হয় না পরিবারের।

দরিদ্র বাবার ক্রোধের শিকার বৃষ্টি আক্তার (১৪) দায়ের কোপে খুব অল্প বয়সেই ডান হাত হারিয়ে স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়। বৃষ্টির মাকে তালাক দিয়ে বাবা আরেকটা বিয়ে করেন। ছোটবেলা থেকেই বৃষ্টির স্বপ্ন; অনেক পড়াশুনা করবে, বড় হয়ে মায়ের কষ্ট দূর করবে। মেয়েকে পড়ানোর সামর্থ ছিল না দরিদ্র মায়ের। সে এখন স্থানীয় হোসেনপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির (ভোকেশনাল শাখা) ছাত্রী। সরকারের উপবৃত্তির আওতায় পড়াশোনার খরচ বাবদ প্রতি মাসে ৬০০ টাকা পায়।

হোসেনপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেগম জিন্নাত আক্তার জানালেন, বৃষ্টির ডান হাতের কব্জি নাই। বাম হাতে লেখালেখি করে। পড়াশুনার প্রতি বৃষ্টির দারুণ আগ্রহ। অন্য সাধারণ শিক্ষার্থীর মতোই স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষায় সে ভালো ফল করে আসছে। বৃষ্টিকে নিয়ে আমরা খুবই আশাবাদী।

বৃষ্টি আক্তার, রায়হান মিয়া এবং প্রীতম চন্দ্র পালের মতো এমন দরিদ্র, অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের শিক্ষার অধিকার ও স্বপ্ন পূরণে কাজ করছে এই শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচি। বদলে গেছে তাদের জীবন চলার গতি।

সমাজসেবা অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক ও শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচির পরিচালক সৈয়দা ফেরদাউস আক্তার বলেন, দরিদ্র, অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তার জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি একটি। সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিবন্ধীদের সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে চায়। তিনি জানান, দেশব্যাপী প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণে জরিপ কাজ চলছে। ভবিষ্যতে উপকারভোগীর সংখ্যা ও বরাদ্দের পরিমাণ আরও বাড়বে।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তি বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০১৩ অনুযায়ী উপজেলা/শহর সমাজসেবা অফিস দেশজুড়ে উপবৃত্তি প্রদানের কাজে নিয়োজিত। সমাজসেবা অধিদফতরের জরিপভুক্ত, শনাক্তকৃত ও নিবন্ধিত এবং সরকার স্বীকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী; যাদের পারিবারিক বার্ষিক গড় আয় সর্বোচ্চ ৩৬ হাজার টাকা তারাই প্রাথমিকভাবে উপবৃত্তির জন্য বিবেচিত হন। প্রতিবন্ধী বলতে জন্মগতভাবে/রোগাক্রান্ত হয়ে/দুর্ঘটনায় আহত হয়ে/অপচিকিৎসায়/অন্য কোন কারণে দৃষ্টি, শারীরিক, শ্রবণ, বাক, বুদ্ধিসহ বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতাকে বুঝানো হয়। উপবৃত্তি প্রার্থীকে নির্ধারিত ফরমে উপজেলা/ শহর সমাজসেবা অফিসার বরাবরে আবেদন করতে হয়। নীতিমালা অনুসারে যাচাই বাছাই করার পর প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তিভোগী নির্বাচন করা হয়। নির্বাচিত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান বা অভিভাবককে অবহিত করে বৈধ অভিভাবকের নামে মাত্র ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলা হয় উপবৃত্তির টাকা তোলার জন্য। নতুন বরাদ্দ প্রাপ্তির তিন মাসের মধ্যে ভাতাভোগী নির্বাচন করে সাত দিনের মধ্যে নিয়মিত ভাতাভোগীর হিসাবে ভাতা স্থানান্তর করা হয় ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আর্থিক সহায়তা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম নির্বিঘœ করতে সহায়তা করছে। তবে গ্রাম ও শহরের শিক্ষা ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ পুনঃনির্ধারণ করলে শহরের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা আরও বেশি উপকৃত হতেন। বর্তমানে সারাদেশে স্তরভিত্তিক উপবৃত্তির পরিমাণ সবার জন্য একই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *