- মুহাম্মাদ আইয়ুব
আমাদের আজকের গল্পটা খুবই বেদনাবিধুর। মোটা দাগে এটাই হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে করুণ ঘটনা। তবে গল্পের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে অসাধারণ কিছু নববী শিক্ষা। তাই চলুন বেদনাকে সঙ্গী করে পুরো ঘটনা পড়ে আসি এক পলকে। ১১ হিজরির ২৬ সফর রোজ সোমবার। হুজুর (সাঃ) এর নির্দেশে জিহাদের জন্য প্রস্তুত হযরত উসামা ইবন যায়দ (রাঃ) এর বাহিনী। আর এটাই হচ্ছে হুজুর (সাঃ) এর তত্বাবধান ও নির্দেশে সবশেষ ইসলামি বাহিনী। হুজুর (সাঃ) হযরত উসামা ইবন যায়দ (রাঃ) কে ডেকে বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন।
বলেন, তুমি সর্বপ্রথম তোমার পিতার শাহাদাতস্থল ‘উবনায়’ যাবে। খুব দ্রুত সফর করবে এবং শত্রুরা প্রস্তুত হওয়ার আগেই ক্ষিপ্র গতিতে হামলা চালাবে। নবীজীর (সাঃ) বড্ড অসুস্থ হওয়া সত্বেও স্বহস্তে যুদ্ধের ঝাণ্ডা বাঁধলেন এবং হযরত উসামা (রাঃ) এর হাতে দিয়ে বললেন, আল্লাহর নামে আল্লাহর পথে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর”
হযরত উসামা (রাঃ) আপন বিশ্বস্ত সঙ্গী বুরাইদা ইবনুল খুসাইব (রাঃ) এর হাতে ঝাণ্ডা অর্পণ করেন। তারপর বাহিনী নিয়ে মদীনা থেকে বের হয়ে জুরফে ছাউনি ফেলেন যেন সৈন্যরা সবাই এখানে একত্রিত হতে পারেন। এদিকে হুজুর (সাঃ) মুহাজির ও আনসারদের নেতৃস্থানীয় সকলকে এ বাহিনীতে শামিল হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।
যারা আজ উসামার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে তারাই কিন্তু ইতিপূর্বে তার বাবা যায়েদের সেনাপতি হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলো।
আনসার ও মুহাজিরদের বড় বড় নেতৃস্থানীয় সাহাবীদের উপস্থিতিতে ২০ বছরের এক নওজোয়ানের কাছে সেনাপতির দায়িত্ব হস্তান্তর করায় কারো কারো কাছে ব্যাপারটি বেশ ঠেকছিল। উত্থাপিত প্রশ্ন ও আপত্তি নবীজীর (সাঃ) পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এতে নবীজী (সাঃ) খুবই মর্মাহত হলেন। প্রচণ্ড অসুস্থতা নিয়ে মাথায় পট্টি বেঁধে গায়ে চাদর জড়িয়ে মসজিদে যান। মিম্বারে উঠে ঘোষণ দেন- যারা আজ উসামার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে তারাই কিন্তু ইতিপূর্বে তার বাবা যায়েদের সেনাপতি হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলো।
খোদার কসম! যায়েদ সেনাপতি হওয়ার যোগ্য ব্যক্তি ছিল এবং তার পুত্রও সেনাপতি হওয়ার উপযুক্ত। সে আমার প্রিয় একজন সহচর যেমন প্রিয় ছিল তার পিতা। সুতরাং তোমরা উসামার ব্যাপারে আমার এ সঠিক সিদ্ধান্ত মেনে নাও, সে তোমাদের মাঝে উত্তম ব্যক্তি। বক্তৃতা শেষে হুজুর (সাঃ) ঘরে চলে গেলেন।
এদিকে অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়। হুজুর (সাঃ) এর নির্দেশ অনুযায়ী হযরত উসামা (রাঃ) জুরফে চলে যান। মুসলিম সদস্যরা একত্রিত হতে হতে এক বিরাট বাহিনী তৈরী হয়ে যায়।
১১ হিজরির ১০ রবিউল আউয়াল বিশেষ ব্যক্তিবর্গরা জিহাদে যাওয়ার জন্য নবীজীর (সাঃ) কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জুরফে পৌঁছে যান।২য় দিন হযরত উসামা (রাঃ) ও নবীজীর সাঃ অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও বিদায় নিতে আসেন। হুজুর (সাঃ) তাকে দেখে খুব খুশি হলেন কিন্তু অত্যাধিক অসুস্থ হওয়ায় মুখে কিছুই বললেন না। বারবার হাত আসমানে উঠাচ্ছিলেন এবং তাঁর শরীরে বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।হযরত উসামা (রাঃ) বলেন যে, আমি বুঝতে পারলাম হুজুর (সাঃ) আমার জন্য দোয়া করছেন।
তারপর তিনি বিদায় নিয়ে বাহিনীর নিকট চলে আসেন। ১২ রবিউল আউয়াল সফরের ঘোষণা দিয়ে দেন। পরদিন বাহনে আরোহন করবেন ঠিক সে মুহূর্তে তাঁর মা হযরত উম্মে আয়মান (রাঃ) এর বার্তাবাহক এসে সংবাদ দিল যে,নবীজীর (সাঃ) অবস্থা গুরুতর। হৃদয়বিদারক সংবাদ শুনে হযরত উসামা হযরত ওমর ও হযরত আবু উবাইদা (রাঃ) তৎক্ষনাৎ মদীনায় চলে আসেন।
দেখলেন, হুজুর (সাঃ) তাঁর বরকতময় জীবনের শেষ মুহূর্তে উপনীত। সেদিনই দুপুর বা বিকেলের দিকে মহানবী (সাঃ) নশ্বর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে রফিকে আ’লার পরম সান্নিধ্যে চলে যান।
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন”।
নবীজীর (সাঃ) ইন্তেকালের সংবাদ পেয়ে গোটা বাহিনী মদিনায় চলে আসেন। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) যখন খেলাফতের মসনদে সমাসীন হয়ে তখন কিছু লোকের বিরোধিতা সত্ত্বেও রবিউল আউয়াল মাসের শেষ দিন বাহিনী তৈরী করে পাঠিয়ে দেন। হযরত উসামা (রাঃ) ‘উবনা’য় পৌঁছেন, রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। মুসলিম বাহিনী বিরাট জয় লাভ করেন। হযরত উসামা (রাঃ) তাঁর পিতার হত্যাকারী ও অন্যান্য কাফেরদের হত্যা করেন।অবশেষে গণিমত বিপুল পরিমাণ সম্পদ নিয়ে ৪০ দিন পর মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।
উপসংহার
এই ঘটনা থেকে আমরা কয়েকটি বিষয়ে শিক্ষা নিতে পারি বরং অবশ্যই নেওয়া দরকার-
এক. কারো অভিযোগ কানে আসলে তার সম্পর্কে মন্দ ধারণা মনে মনে না পুষে বরং সত্যটা সবার সামনে স্পষ্ট করে দেয়া।
দুই. যে যোগ্য তাকে অন্যের কথায় প্রত্যাখ্যান না করে নিজের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করা।
তিন. সিদ্ধান্ত নেয়া কোন বিষয়ে অন্যের কথায় কর্ণপাত করে ভণ্ডুল না করে বিপুল উদ্দীপনায় সামনে এগিয়ে যাওয়া।
আজকের সমাজ যদি মহানবী সাঃ এর এ-সব যুগোপযোগী সিদ্ধান্তকে আশীর্বাদ জানিয়ে গ্রহণ করে এবং সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) এর সাহসী মনোবল ধরে রেখে এগিয়ে যায় তাহলে অনেক সফলতা আপনাআপনি ধরা দিবে আর বন্ধ হবে বহু অনিষ্টের দ্বার।
লেখক: শিক্ষক, অনুবাদক ও মাদরাসা পরিচালক


