একটি মৌলবাদ বিরোধী মিছিল
মুহাম্মাদ আইয়ুব :: গত শনিবার [১৩.১২.২০] দুপুরের কথা; এক মুসল্লী এসে বললো, হুজুর কি আজকের মিছিলের বিষয়ে কিছু জানেন?
বললাম না। নিত্যদিনে আশপাশে অনেক কিছুই তো ঘটে কিন্তু সেসব খবরের পিছনে পড়লে তো আর দিন যাবে না।
মাগরিবের নামাজের পর সেক্রেটারি মহোদয় বললো, আজ উলপুর বাজারে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতির নেতৃত্বে হুজুরদের বিরুদ্ধে দশ বারো জনের একটা ঝটিকা মিছিল হয়েছে। খুবই হাস্যকর ব্যাপার। কোন দুনিয়ায় যে হুজুর আছি বুঝবেন না। দুনিয়াটার যে কি হয়ে গেল!
পরদিন বিষয়টি নিয়ে বাজারের কয়েক দোকানদারসহ স্থানীয় অনেকের সাথে কথা বলেছি কিন্তু কাউকেই আমি মিছিলের স্বপক্ষে পাইনি। সবার কথা হচ্ছে যারা তোদের জন্মের পর দুই কানে আযান দেয়, তোদের কুরআন শিখায়, বিপদাপদে দোয়া দুরুদ করে, তোদের মৃত্যুর পর কাফন পরায়, জানাযা পড়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোন সাহসে মিছিল করলি!
অবাক করা বিষয় হলো, যিনি মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি আমার জুম্মার নিয়মিত মুসল্লী। তার সাথে আমার যতবার দেখা হয় ততবারই মুচকি হাসিসহ একটি সালাম যেন আমার পাওনা হয়ে আছে। তাঁর নাতিপুতিরা আমার কুরআনের ছাত্র ছাত্রী। বাজারে দেখা হলেই অনেকটা জোর করে চা বিস্কুট খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। তাই হুজুর বিরোধী মিছিলে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে অনেকটা ধন্ধে পড়ে গেলাম।
এক সকালে হাসিমুখে প্রশ্ন করলাম, ব্যাপার কি? বিষয়টি তিনি বুঝে ফেললেন। শান্তশিষ্ট গলায় ধীরস্থির ভাবে বললেন, হুজুর, বসুন! বিষয়টা আসলে সেরকম নয় যেটা আপনারা ভাবছেন। আজকাল দেশব্যাপী আমাদের মিছিল হুজুরদের বিরুদ্ধে নয় বরং যারা ইসলামের নাম ভাঙিয়ে উগ্রবাদ জঙ্গিবাদকে সমর্থন দিচ্ছে, একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামাত শিবিরের সাথে তলে তলে আঁতাত করে দেশের শান্তি শৃংখলার পরিবেশ নষ্টের পাঁয়তারা করছে, এই মিছিল সেই সব লেবাসধারী হুজুরদের বিরুদ্ধে। ঢালাওভাবে একচেটিয়া হুজুরদের বিরুদ্ধে মিছিল করব এমন বেকুব আমরা নই! আমাদের ও কবরের ভয় আছে, কেয়ামতের ভয় আছে।
হুজুর! এদেশে যারাই আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ করে খোঁজ নিয়ে দেখবেন এদের নব্বই ভাগের জীবন শুরু হয় কুরআনের সাথে মক্তবের সাথে। সুতরাং ঢালাওভাবে যারা আমাদের নাস্তিক কাফের ও তাদের দোসর বলে ক্লাসে ছাত্রদের মগজ ধোলাই করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করে; আমি মনে করি তাদেরকে হুজুর বললে আমাদের ধর্মের অবমাননা হয়, নবীজীকেও অসম্মান করা হয়। তাই এদের বিরুদ্ধে যদি আমরা এখনই সোচ্চার না হই তাহলে একসময় দেখা যাবে কালিমা পড়ে মরে যাব, কিন্তু স্থানীয় এক কাঠমোল্লার সাথে আগে আগে সালাম না দেওয়ার বিরোধের জেরে প্রচার হয়ে যাবে তোফায়েল মিয়া বেঈমান হয়ে দুনিয়া ছেড়েছে! কি ভয়ংকর ব্যাপার হবে তখন! আপনি কিভাবে বুঝলেন যে, এখানে জামাত শিবিরের সাথে হুজুরদের আঁতাত হয়েছে?
হুজুর! হতে পারে আমি সামান্য ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি কিন্তু আজ ৪৫ বছর যাবত রাজনীতি করি। আওয়ামীলীগ বিএনপির মত আমলাতান্ত্রিক দল নয় বরং মাঠে ময়দানে, তৃণমূলে মানুষের অধিকার সংগ্রামের জন্য লড়তে লড়তে রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়া দল। সুতরাং এদেশে রাজনীতি আওয়ামীলীগ থেকে ভালো বুঝে এমন দল নেই বললেই চলে।
কিছুদিন আগে যে হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি হলো এ নিয়ে আমাদের অনেক কথা আছে; আজকের হেফাজতে হুজুর বেশে অনেক রাজাকার ও ঢুকে গেছে। এবং এরাই দেশকে অস্থিতিশীল করতে কৌশলে জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করছে। কত্ত বড় সাহস বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নাকি টেনে হিঁচড়ে ভেঙে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিবে!
এ ধরনের কথা শুনলে আমরা কি ঠিক থাকতে পারি বলেন হুজুর? যার কারণে আজ স্বাধীন দেশে বসে জোর গলায় কথা বলছ সেই তার ভাস্কর্য ভেঙ্গে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে?! তারপরও আমরা ধৈর্য্য সহকারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছি। উনি ইসলামপ্রিয় মানুষ বিধায় এখনো বাবুনগরী আর মামুনুল হক্বের মতো কাঠমোল্লাদের কিছু বলেননি।
এ দেশে তো স্বৈরাচার জিয়ার ভাস্কর্যও আছে কিন্তু কই তখন মামুনুলরা কই ছিল? তখন কি দেশে মুফতী আর ফতোয়া ছিল না? সবই ছিল ছিল না শুধু সাহস। তখনকার রাজনৈতিক হুজুররা খালেদার ভয়ে ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে বলতে ভয় পেত। আর আওয়ামীলীগ সরকার গণতন্ত্রের পথে হেঁটে বাক স্বাধীনতা দিয়েছে বিধায় আজকে মামুনুল হক্বের মতো শিবিরের দোসররা কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। আপনারা তো মামুনুল হক্বরে নিয়া গর্ব করেন কিন্তু সে যে হেফাজত আর জামাতকে এক করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেটা হয়ত আসমান থেকে জিব্রাইল আ. এসে বললেও আপনারা বিশ্বাস করবেন না। আপনাদের মেইন সমস্যা হলো আপনারা অন্ধভক্ত।
মামুনুল আর বাবুনগরী যে আপনাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার পাঁয়তারা করছে তা আপনারা বুঝতে পারছেন না। কিন্তু যখন সময় হবে তখন ঠিকই আমার কথা মনে পড়বে। আপনারা একবার যাকে ভক্তি করা শুরু করেন তার পাদেও আপনারা সুঘ্রাণ পান।
শোনেন হুজুর! আমরা রাজনীতি করি, মাদ্রাসা না পড়লে কি হবে কিছু তো বুঝি। আল্লাহ একেবারে ছাগল বানিয়ে দুনিয়াতে পাঠায় নাই। হুজুর! আপনাকে আপন মনি করি বিধায় অনেক কিছুই বললাম, আমার কোন কথায় কষ্ট পেলে, বেয়াদবি হলে মাফ করে দিয়েন। স্লামলাইকুম।
লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক


