একাত্তরের বন্ধু ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী রহ.

একাত্তরের বন্ধু ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী রহ.

একাত্তরের বন্ধু ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী রহ.

আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: গেল ৬ ফেব্রুয়ারি। ইসলামে দিবস পালনের কোন অনুমতি নেই। এধরনের কোন নিয়ম- নীতি ইসলাম সমর্থন করেনা। তবে স্মৃতির মণি কোঠায় ভেসে ওঠে, মনে পড়ে যায় ২০০৬ সনের এই দিনের কথা। দিল্লির এ্যাপোলো হসপিটালে একটানা তিনমাস সঙ্গাহীন থাকার পর ইনতেকালের পূর্ব মুহূর্তে চেতন হয়ে “আল্লাহ” “আল্লাহ” জিকির এর মাধ্যমে পুরো হাসপাতালের কক্ষ মুখরিত করে শেষ বিদায় নিয়েছিলেন যিনি। সেই মহান ব্যক্তি হলেন, ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ.।

তাঁর স্মৃতি, তাঁর বক্তৃতা, ইসলাহী বয়ান, তাঁর ভ্রমণ এবং আন্তর্জাতিক খেদমত, বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। উম্মতের ইসলাহী মিশনে বিরামহীনভাবে ছুটে চলা বারবার স্মরণ হয়।

অনেক ছোটকাল থেকে প্রিয় আসআদ মাদানীকে দেখতাম। মালিবাগ জামেয়ার মসজিদের দ্বিতল ভবনে কতবার যে তাঁর উর্দু- হিন্দি মিশ্রিত ভাষণ শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। পবিত্র কুরআনের আয়াত পড়ে, যখন হিন্দি ভাষায়, উর্দু ভাষায় তরজমাগুলো করতেন, হৃদয়টা ভরে যেত। কথাগুলো মানুষের মন কেড়ে নিত।

আসআদ মাদানীর মজলিসের বৈশিষ্ট্য ছিল সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি। কেউ বাদ যেতনা তাঁর বয়ান থেকে। আলেম- উলামা, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক- ছাত্র, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী, সর্বস্তরের মানুষের সমাগম হত সেখানে। সর্ব শ্রেণির মানুষ উপকৃত হয়েছে তাঁর মজলিস থেকে।

ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী রহ. তো এমন এক ব্যক্তির সন্তান, যিনি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার, বীর মুজাহিদ, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, কুতুবুল আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানীর সাহেবজাদা। যে পিতা ছিলেন বিশ্ববরেণ্য। ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মহানায়ক। এদেশের মুক্তির জন্য, জালিম শাহীকে চিরবিদায় দেওয়ার জন্য তিনি নিজের জান কুরবান করে দিয়েছেন। সেই মহান ব্যক্তির সন্তান আসআদ মাদানী রহ.।

ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন তিনি। একদম পিতার ফটোকপি। শায়েখ মাদানী রহ, যেরকম মেধা, ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন, ঠিক স্বীয় পিতার মতোই ছিলেন তিনি। নিজের মায়ের কাছে শিক্ষা লাভের পর, পিতার খলিফা ক্কারী আসগার আলী সাহেবের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া করেন। এরপর ভর্তি হন দারুল উলুম দেওবন্দে। দারুল উলুমে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে লেখা পড়া সমাপ্ত করেন। লেখা পড়া শেষ করার পর মদীনা শরীফে রিয়াজত মুজাহাদায় সময় পার করেন।

সাইয়্যেদ আসআদ মাদানী ১০৭০ হিজরী সনে মদীনা থেকে ফিরে দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষক নিযুক্ত হন। দারুল উলুমে একটানা ১২ বছর অত্যন্ত সুনামের সাথে অধ্যাপনা করেন।

সুলুকের লাইনে নিজ পিতা সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানীর কাছে তিনি বায়াত গ্রহণ করেন। ইলমে তাসাউফের সবকগুলো আত্মস্ত করে অনেক বড় রুহানী মাকাম তৈরী করে ছিলেন তিনি। শায়খুল ইসলাম মাদানী রহ.-এর হায়াত কালে একদা মদীনায় অবস্থানকালীন আসআদ মাদানী সাহেব পিতার চিঠি পান। তাতে সুস্পষ্ট ঈঙ্গিত বহন করে যে তিনি ইযাজতের যোগ্যসম্পন্ন হয়েছেন।
হুসাইন আহমাদ মাদানীর ইন্তেকালের পর, জানাযায় শায়েখ জাকারিয়া রহ.-এর উপস্থিতিতে শায়খুল ইসলাম মাদানীর খলিফাগণসহ সকলে মিলে আসআদ মাদানীকে খেলাফত প্রদান করেন।
আত্মশুদ্ধির মেহনত ছিল আসআদ মাদানী সাহেবের বিশ্বব্যাপি। ইউরোপ, আফ্রিকা, অষ্ট্রেলিয়া, এদিকে এশিয়ার সর্বত্র, বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আরব দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের পিছনে তিনি আত্মশুদ্ধির মেহনত করেছেন। অগণিত মানুষ তাঁর এই খেদমতে উপকৃত হয়েছে।

রাজনীতির ময়দানে তিনি ছিলেন এক মর্দে মুজাহিদ নেতা। জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের দীর্ঘ দিন সেক্রেটারী এর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭৩ সাল থেকে ইন্তিকালের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি জমিয়তের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মত সংগঠনের দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজ দেশসহ বিশ্বব্যাপি রাজনীতি এবং সামাজিক খেদমতের আঞ্জাম দিয়েছেন।

ভারতে উগ্র হিন্দুবাদের সৃষ্ট সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা মোকাবেলায় আসআদ মাদানী সাহেব এক বিশাল ভূমিকা রেখেছিলেন। মুসলিম মিল্লাতের স্বার্থ সংরক্ষণ, বিভিন্ন কালো আইন পাসের বিরোধিতা, অমুসলিম কাদিয়ানীদের অপতৎপরতা বন্ধ, নবী সাহাবাদের দুশমন, মওদুদীবাদের মুখোশ উন্মোচনসহ বহু কর্মকাণ্ডে তিনি অবদান রেখেছিলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর খেদমত অপরিসীম। ফিলিস্তিন সমস্যা, ইরান- ইরাক যুদ্ধ বন্ধ, শিয়াদের অপতৎপরতা রোধে তাঁর বড় অবদান ছিল।

আসআদ মাদানী সাহেবের অনেক অবদান আমাদের এই বাংলাদেশেে জন্য। ১৯৭১ সনে পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতন হয়েছিল নিরীহ বাঙালিদের ওপর, সে নির্যাতন বন্ধে, এবং এই দেশের স্বাধীনতার জন্য তার অনেক কোরবানী ছিল।

প্রায় তিনশত মিছিল মিটিং করেছিলেন পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন বন্ধের জন্য।এমনকি, আমেরিকা যখন পাকিদের সাহায্যের জন্য সপ্তম নৌবহর পাঠায়েছিল, তখন আসআদ মাদানী সাহেব, দিল্লিতে অবস্থিত আমেরিকার দূতাবাস ঘেরাও করেছিলেন হাজার হাজার জনতা নিয়ে।

সেই মহান ব্যক্তি, আমাদের প্রিয়, যার অবদান ভোলার নয় কোনদিন। তিনি ২০০৬ সনের ৬ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন।

বড্ড স্মরণ হয় তাঁকে। আজকের এই ক্রান্তিকালে বড় প্রয়োজন ছিল ওরকম মর্দে মুজাহিদ মানুষের। মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতে সুউচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *