স্বাস্থ্য। ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী
এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ও আমাদের ভবিষ্যৎ
এখন বর্ষাকাল, সাথে আছে বৃষ্টিজনিত ঠাণ্ডাজ্বর, সর্দি, কাশি। এমন অবস্থায় আগের বারের জ্বরে ডাক্তার যে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছিলেন, এবারের জ্বরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সে ওষুধ সেবন- এমন ইচ্ছা মাফিক এন্টিবায়োটিক খাওয়া আর নিজেকে চিকিৎসক ভেবে জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। সিজনাল ঠাণ্ডা-সর্দি কাশি ছাড়াও এখন সারা বিশ্বে বিরাজ করছে করোনা মহামারি। এ সাথে আছে ডেঙ্গু। এই দুই ক্ষেত্রেই জ্বর থাকে। করোনাতে সিজনাল ফ্লু এর মতো কাশি-ঠাণ্ডাও থাকে। কিন্তু করোনা বা ডেঙ্গু কোনোটাই ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ নয়, এগুলো ভাইরাসজনিত রোগ। তাই এন্টিবায়োটিক এদের উপর কোনো কাজই করতে পারে না কারণ এন্টিবায়োটিকই ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগে কাজ করে, ভাইরাসের ক্ষেত্রে নয়। কিছু কিছু গবেষণায় মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করার জন্য কিছু এন্টিবায়োটিকের প্রভাব দেখা গেছে, কিন্তু তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কিন্তু আজকাল সাধারণ সর্দি কাশি, এমনকি করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকেও হর-হামেশা এসব এন্টিবায়োটিক খেতে দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ভয়ের ব্যাপার হলো, কিছু দিন পর রোগ ভালো হয়ে গেলে কোর্স শেষ না করেই এন্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করে দেয়ার ফলে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মত আশংকা থেকে যাচ্ছে। এ বিষয়গুলিতে সকলকে সচেতন হতে হবে, কারণ পরবর্তীতে ঐ কোর্স শেষ না করেই এন্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করে দিলে ঐ এন্টিবায়োটিকে আর কাজ হয় না। এন্টিবায়োটিক থাকায় যেসব রোগকে আমরা সাধারণ রোগ বলে মনে করি, এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট তৈরি হলে সেই সাধারণ রোগেই মৃত্যু ঘটতে পারে। নতুন নতুন এন্টিবায়োটিক প্রতিনিয়ত তৈরি হয় না বলে এন্টিবায়েটিকে রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়ে মৃত্যুও আশঙ্কাও খুব বড়ো একটি বিষয়। করোনা বিষয়ে জনগণ যাতে বিভ্রান্ত না হয়, এজন্য সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে করোনা চিকিৎসার জন্য গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে এবং তা প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অনেক সময় চিকিৎসকদের কিছু রোগে বিশেষ এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই রোগীর অবস্থা, রোগের সংক্রমণ, এান্টিবায়োটিক আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তা না বুঝেই আমরা নিজেরা আবার কখনওবা ওষুধের দোকানদারের পরামর্শে এন্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করি। অযথা এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ভয়াবহতা জানা না থাকায় হর-হামেশাই আমরা তা ব্যবহার করে চলেছি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে। ফলে শরীরে তৈরি হচ্ছে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, যা আমাদের এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আমাদের দেশে বর্ষাকালে ডায়রিয়ার রোগী অহরহ দেখা যায়। সাধারণত ডায়রিয়া হলে শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টি হয়। যদিও পানি শূন্যতারোধে ওরালস্যালাইনই যথেষ্ট, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে অতি সাবধানতার জন্য প্রয়োজনীয়তা না থাকা সত্ত্বেও এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে, বিশেষ করে কোর্স শেষ না করলে রোগীর শরীরের ব্যাকটেরিয়া শক্তিশালী হয়ে টিকে থাকতে ও বিস্তার লাভ করতে সহায়তা পায়। এতে রোগীর রোগ সারতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে এন্টিবায়োটিকের সহজলভ্যতাই এজন্য দায়ী। এন্টিবায়োটিক কিনতে এখন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের প্রয়োজন হয়না। ওষুধের দোকানে কোনো রকমে নাম বলতে পারলেই বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দোকানদার রোগীর বর্ণনা শুনে নিজের অভিজ্ঞতায় এন্টিবায়োটিক সরবরাহ করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দোকানদারের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় সুবিধা-অসুবিধা চিন্তা না করেই উচ্চমাত্রার এন্টিবায়োটিক ক্রেতাকে সরবরাহ করে, যা রোগীর জন্য অধিক ক্ষতির কারণ।
এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানসম্মত ওষুধের পাশাপাশি ওষুধের নির্দিষ্ট মাত্রার বিষয়টিও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো ব্যাকটেরিয়া নিধনে যদি ৫০০ মিলিগ্রাম ডোজ নির্দিষ্ট হয়, আর ওষুধে ৫০০ মিলিগ্রাম লেখা থাকা সত্ত্বেও যদি ওষুধটি ৪০০ মিলিগ্রাম হয়ে থাকে, তবে তা ব্যবহারেও এন্টিবায়োটি রেজিস্টান্স তৈরি হয়ে যেতে পারে, যা রোগীর জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। তাই ওষুধ কোম্পানিগুলোর মানসম্মত ওষুধ তৈরি ও বাজার জাতকরণের নিশ্চয়তা খুবই প্রয়োজন, যদিও বাংলাদেশ সরকারের ঔষধ প্রশাসন এ ব্যাপারে তদারকি করছেন। আবার, কৃষিক্ষেত্রে মৎস্য, হাঁস-মুরগিও গবাদি পশু পালনে খাবারেও স্বল্প মাত্রায় এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়। এরমধ্যে টেট্রাসাইক্লিন, পেনিসিলিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, স্ট্রেপটোমাইসিন ইত্যাদি মানুষের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক কিন্তু উন্নত বিশ্বে এখন এগুলো ব্যবহারে দ্বিমত পোষণ করা হচ্ছে। দেশের শিশু হাসপাতালে এক শিশুর শরীরে সব ধরনের এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পাওয়া গেছে। ফলে কোনো ইনফেকশনেই এন্টিবায়োটিকগুলো আর কোনো কাজে আসবে না। শিশুটির মৃত্যু ঝুঁটি এ অবস্থায় অত্যন্ত বেশি। এ দায় আমরা এড়াতে পারি না। শিশুস্বাস্থ্যের এ দিকটি শিশুর মাকেই সর্বাগ্রে চিন্তা করতে হবে।
সাধারণভাবে কোনো এন্টিবায়োটিক জীবাণুর ওপর কাজ করে জীবাণুকে মেরে ফেলার কথা, তা যদি না করতে পারে, তাহলে ওই রোগীর শরীরের ব্যাকটেরিয়াগুলোর ওপর ওই এন্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং এক সময় পুরোপুরি লোপ পায়। পরে সেই রোগীর শরীর থেকে অন্য মানুষের শরীরে সেসকল জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে তাহলে ওই এন্টিবায়োটিক আর আক্রান্তদের শরীরে কাজ করে না। এটাও এক ধরনের ‘এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ পরিস্থিতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অপ্রয়োজনে যে হারে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ সাধারণ ইনফেকশনেও এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা থাকবে না। বিশ্বে রোগীদের চিকিৎসায় এক ক্রান্তিকালের সূচনা হবে। রোগী মারা যাবে, কারণ তখন আর কোনো কার্যকর এন্টিবায়োটিক থাকবে না। তাই সচেতন হয়ে সঠিক রোগে, সঠিক সময়ে, নির্দিষ্ট মাত্রায়, নির্দিষ্ট সময় অন্তর ও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এন্টিবায়োটিক ব্যবহার নিশ্চিত করার শপথ নেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন, তা এখন সময়ের দাবী। বাংলাদেশ সরকার প্রণীত ঔষধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা রয়েছে। তবে সচেতনতার অভাবে তা মানা হচ্ছে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। সরকারি সেবা ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন” থেকেও এ ব্যাপারে জনগণকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ নানা সংস্থা থেকে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার যথেচ্ছ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। এটি নিঃসন্দেহে সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের বিষয়ে প্রচার প্রচারণা আরো বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনে যথেচ্ছ এন্টিবায়োটিকের বিক্রয় ও ব্যবহারে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
সাধারণ মানুষ, ওষুধের দোকানদার, স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক থেকে শুরু করে আমাদের সকলের সঠিক প্রয়োজন ব্যতিরেকে যথেচ্ছভাবে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ করা উচিত। এ বিষয়ে সরকারের ভালো উদ্যোগে আমাদের সহায়তা করা কর্তব্য। এতে আমি, আপনি সবাই এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের আওতার বাইরে থেকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ পাব। পাশাপাশি, পরিবেশ থেকে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশুর খাবার এবং কৃষিক্ষেত্রে চাষবাসে স্বল্পমাত্রায় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার বর্জন করি। সুন্দর আগামীর জন্য, আমাদের বসবাস-উপযোগী একমাত্র পৃথিবীকে রোগ মুক্ত রাখতে এবং রোগাক্রান্তদের সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সকলে মিলে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে আরও সতর্ক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট


