এবার পোলট্রি খাতে হানা দিল বার্ড ফ্লু

এবার পোলট্রি খাতে হানা দিল বার্ড ফ্লু

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : করোনাভাইরাস উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের অবস্থা বিপর্যস্ত-ই বলতে গেলে। এরি মধ্যে আরও নানান সমস্যা দেখা দেচ্ছে দেশে।

কয়েক বছর ধরেই খামারে উন্নত মানের লেয়ার মুরগি উৎপাদন করে আসছিলেন সাভারের হেমায়েতপুরের খামারি মো. আজিজ মিয়া। গত বছরের শেষ নাগাদ তার খামারে লেয়ারের সংখ্যা উন্নীত হয় প্রায় চার হাজারে। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। গত দুই মাসে তার খামারের প্রায় তিন হাজার মুরগি মারা গেছে।

কেরানীগঞ্জের ভাকুর্তা এলাকার আরেফিন পোলট্রি খামারি মো. আরেফিন ইসলাম। তার খামারে মুরগি ছিল প্রায় ১ হাজার ৭০০টি। গত এক মাসে এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজারই মারা গেছে বার্ড ফ্লুতে।

শুধু সাভার বা কেরানীগঞ্জেই নয়, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত দুরবস্থার মধ্যে সারা দেশেই খামারিদের জন্য বাড়তি মাথাব্যথা হয়ে দেখা দিয়েছে লো-প্যাথোজেনিক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এলপিএআই)। দেশের খামারগুলোয় কয়েক বছর ধরেই দেখা দিচ্ছে এইচ৯এন২ হিসেবে চিহ্নিত একটি ভাইরাসের সংক্রমণজনিত রোগ এলপিএআইয়ের প্রাদুর্ভাব। এ রোগে মুরগির মৃত্যুহার কম হলেও সম্প্রতি তা বেড়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রতিষেধক ব্যবস্থা বা প্রতিরোধের উপায় নেই খামারিদের হাতে। খামারের মুরগি কমে গেলেও কোনো চিকিৎসা দিতে পারছেন না তারা। কারণ দেশে এর প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন এখনো খামারিদের হাতের নাগালে আসেনি।

দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্পে সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল খাত হচ্ছে পোলট্রি। সবচেয়ে কম মূল্যে প্রাণিজ আমিষের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা হচ্ছে পোলট্রি খাত। দেশে মাংসের মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি জোগান দিচ্ছে খাতটি। এলপিএআইয়ের প্রাদুর্ভাব থেকে খাতটিকে বাঁচানোর জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের তথ্যমতে, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু সংক্রমণের আগে থেকেই দেশে লো-প্যাথোজেনিক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের উপস্থিতি ছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ব্রিডার ও কমার্শিয়াল লেয়ার, সোনালি ও ব্রয়লারে এইচ৯এন২ ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে। এতে করে মুরগির উৎপাদনশীলতা কমার পাশাপাশি খামারিদের ব্যয় বেড়েছে ৫৯ শতাংশ। বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদন খরচ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএলআরআইয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ফর এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার পরিচালক ডা. মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, এলপিএআইয়ের কারণে মুরগির উৎপাদনশীলতার মারাত্মক ক্ষতি হয়। এটিতে মৃত্যুহার কম থাকলেও উৎপাদনশীলতা কমার কারণে খামার অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয় না। আবার দীর্ঘদিন মুরগির শরীরে এটি অবস্থান করলে তা মহামারীতে রূপ নিতে পারে। সে বিবেচনায় আমরা একটি টিকার পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই-বাছাই করেছি। সেটির ফলাফল ভালো এসেছে। এগুলো মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত এটির অনুমোদন পাওয়া যাবে।

ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি) এবং ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের (ওআইই) তথ্যমতে ২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫৫৫টি সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। গত দুই বছরে তা আরো বেড়েছে। এ ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে দেশের পোলট্রি শিল্পে ক্ষতি হয়েছে ১০-১২ হাজার কোটি টাকার। টিকা বা ভ্যাকসিনের অনুমোদন পাওয়া গেলেই খাতটিকে এ সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। বাড়বে ডিম ও মুরগির মাংসের উৎপাদন।

এ বিষয়ে পোলট্রি খাতের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, এইচ৯এন২ বিষয়ক তথ্য-উপাত্তগুলো কোনোভাবেই যাতে ধামাচাপা দেয়া না হয়। এটি কোনো নাটিফায়েবল ডিজিজ নয়, সেজন্য টিকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুমতি নেয়ারইবা প্রয়োজন পড়বে কেন? তার পরও সংশ্লিষ্টদের উচিত দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে এটির দ্রুত অনুমতি দেয়া। কারণ উচ্চ-প্যাথোজেনিক ভাইরাসের ভ্যাকসিন আমদানি ও ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। লো-প্যাথোজেনিক ভাইরাসের ভ্যাকসিন আমদানি বা ব্যবহারের অনুমতি না দেয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। কালক্ষেপণ না করে টিকা ব্যবহারের অনুমতি দেয়া প্রয়োজন। প্রতিরোধহীনতার কারণে দিন যতই যাচ্ছে, এ জীবাণু আরো শক্তিশালী হচ্ছে। মাঝখান থেকে খামারিরা লোকসানে পড়ছে।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) মহাপরিচালক ডা. আবদুল জব্বার শিকদার বলেন, আমাদের কাছে তথ্য এসেছে লো-প্যাথোজেনিক এভিয়ান ইনফু্লয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে। তাই ভ্যাকসিনের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করছি। এ বিষয়ে সরকার ইতিবাচক। তবে বিদেশী ভ্যাকসিনের বাজার তৈরি না করে দেশেই ভ্যাকসিন তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে দেশের মানসম্মত ওষুধ কোম্পানি রয়েছে, তারা এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। আমরা সবগুলো সুযোগ ও সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *