ওয়াজ মাহফিলে বাঁধা, দায়ী কারা?
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: ওয়াজ মাহফিলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাঁধা আসছে। কিছু অবুঝ লোক সরাসরি মাহফিলের ষ্টেজে ওঠে যাচ্ছেন, আর বক্তাকে ওয়াজ করতে বাঁধা দিচ্ছেন!! আর সেটা নিয়ে ওয়াজের ময়দানে তুলকালাম কান্ড ঘটে যাচ্ছে। এরপর সেই সব ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনলাইনে তুমুল আকারে সমালোচনা হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে একদম ধুয়ে ফেলা হচ্ছে।
বিশেষ করে আমরা আলেমরাই সবচেয়ে বেশী সমালোচনা করছি। ঠাট্রা- বিদ্রুপ করছি। একজন সাধারণ মানুষকে, অজ্ঞ- মুর্খ মুসলমানকে যেভাবে হেয় করে আমরা লেখালেখি করছি, তাতে মনে হয় এখন মুসলমান আর গায়রে মুসলমানের কোন তফাৎ নেই।
বড় আফসোস! বড় দুঃখ হয়, আমরা ওসকল অবুঝ লোকদের দিকে এমন ভাবে তেড়ে যাচ্ছি, যেটা বর্ননার ভাষা নেই। বিশেষ করে ওয়াজের ময়দানে যেভাবে আরেক মুসলমানকে হুমকি- ধমকি দেওয়া হচ্ছে, আরেকজনের ব্যাপারে বিষোদগার করা হচ্ছে, তাতে দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমাদের হেকমত, কৌশল, মাওয়ায়েজে হাসানা জানা আছে বলে মনে হয় না।
ওরা অবুঝ লোক, তারা যদি আমাদের গালি দেয়, তাহলে আমরাও তাদের গালি দিচ্ছি। ওরা যদি আমাদের কোন বিষয়ে ভুল ধরিয়ে দেয়, তাহলে আমরা তাদেরকে এমন ভাবে হেয় করছি, অনলাইনে তাদের দোষ ত্রুটি বের করে দিচ্ছি, যেটা সম্পুর্ণ শিষ্টাচার বহির্ভুত।
বর্ননার ভাষা নেই। বলার কোন সুযোগ নেই। আমি যদি এখন ঐসকল লোকদের সম্পর্কে কিছু বলি, তাহলে আমার উপরে তেড়ে আসবে একদল লোক। ওরা আদাজল খেয়ে লাগবে আমার পিছনে। এজন্য কেউ কিছু বলতেও পারছিনা।
তাছাড়া এটা কোন সিষ্টেম হল, ওয়াজের ষ্টেজে ওঠেই আরেকজনের বিরুদ্ধে বলতে হবে। আবার এমন ব্যক্তিদের কথা কেন উপস্হাপন করতে হবে, যেটা বললে বিশৃংখলা হবে, আরেকজনের কথা স্পষ্ট করে বলার দরকারটা বা কি জন্য?
কিছু বক্তা মনেহয় ইচ্ছেকৃত ভাবে এগুলো করছে। ওরা চায় নিজেদের ভাইরাল করতে। তা নাহলে বারবারই একই ভুল করছেন একই ব্যক্তি। জেনে শুনে কেন বারবার ওয়াজ মাহফিলের মত পবিত্র অঙ্গন কে কলুষিত করে যাচ্ছেন।
এক সময় জামাত নেতা সাঈদী সাহেবকে দেখতাম,তিনি ওয়াজের ষ্টেজে বসে অপরপক্ষকে ধোলাই করতেন। অথচ সে সব লোকগুলো মুসলমান ছিল। লাগামহীন ভাবে তিনি আরেকজনের বিরুদ্ধে বলে যেতেন। যে কারণে বহু জায়গাতে সাঈদী সাহেবের মাহফিল বন্ধ হয়েছিল। অনেক জায়গাতে বাঁধা আসত তখন। সাঈদীর আসার রাস্তা বন্ধ থাকত।
সাঈদী সাহেব অগোচরে ওয়াজের মাহফিলে হাজির হতেন। ঠিক বতর্মান সময়ে কিছু লোক যেন সেই তরিকা অবলম্বন করেছেন। ওয়াজের ষ্টেজে ওঠে ওনারা হুমকি- ধমকি ছাড়া যেন আর কোন ওয়াজ পারেন না। মানুষকে উত্তেজিত করা ছাড়া যেন কোন ওয়াজ আর ওনাদের যেন মুখস্হ নেই।
এই হুমকি- ধমকির ওয়াজ করে কি ফায়দা হচ্ছে? জনগণের কোন ফায়দা হয়েছে? মানুষকি ইসলাহ হতে পারছে?
হুমকি – ধমকির ওয়াজে বক্তার ভাইরাল হওয়া এবং পকেট ভারী হওয়া ছাড়া আর কোন ফায়দা হচ্ছে বলে মনে হয় না। কেননা, দাওয়াতের সিষ্টেম কিন্তু হুমকি দেওয়া নয়। জ্বালাও -পোড়াও- ভাঙচুর কোন পদ্ধতি নয়। বরং মানুষকে সহী রাস্তায় আনতে হলে চাই, মিষ্টি কথা। হেকমত- কৌশল জরুরী। গালিগালাজ করা, আরেকজনের বিরুদ্ধে বেপরোয়া বক্তৃতা করা দাওয়াতের পদ্ধতি হতে পারেনা।
দেওবন্দী আলেমগণের ওয়াজ মাহফিল বন্ধ হতে দেখিনি আমরা। কেননা, ওলামায়ে কেরাম অনেক হেকমত- প্রজ্ঞার সাথে সব কিছু মোকাবেলা করেন। কিন্তু এখন আমাদের কিছু কওমী ঘরানার লোক ঐ সাঈদী সাহেবদের তরিকা ধরেছে মনে হয়। এখনও তারা মঞ্চে বসে আরেকজনকে হুমকি দিতে থাকে।
দেখুন! একটি সংগঠনের সকলে খারাপ হয়না। দু একজনের কারণে পুরো গোষ্ঠিকে খারাপ বললে এতে হিতে বিপরীত হয়। একচেটিয়া ভাবে সকলকে দোষারোপ করা মোটেও ঠিক নয়। এর দ্বারা তারা কিন্তু জেদী হয়ে ওঠে।
বহু দ্বীনদার মুসলমান আছে সরকারী দলের মধ্যে। সে দলের অনেকেই কিন্তু আলেম- উলামা ভক্ত। তারা আলেমদের ভালবাসে। নিয়মিত মাহে রমজানে রোজা রাখেন। এমনি ভাবে তারা হজ্জ করেন, যাকাত আদায় করেন। কিন্তু আমরা আজকাল ওয়াজ মাহফিলে এমন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছি, যার দ্বারা ঐ সকল দ্বীনদার লোকেরা বিব্রতকর অবস্হায় পড়ছেন।
এজন্য দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে সব সময় হেকমত – কৌশল অবলম্বন করা চাই। জমানার স্রোতে গা না ভাসিয়ে কুরআন – সুন্নাহ এর আলোকে মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌছাই।
মনে রাখতে হবে, কোন অবুঝ লোক হয়ত গালি দিতে পারে, নানান কথা বলতে পারে। ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করা চাই। উত্তেজিত হওয়া কোন আলেমের সিফাত নয়।
এ প্রসঙ্গে আমাদের উলামায়ে দেওবন্দের সুর্য সন্তান, ফেদায়ে মিল্লাতের খলিফা বলেন, ‘আলেম হবে শীতল মস্তিস্কের অধিকারী’। ঠিক তাই, বর্তমান হালাতে ধৈর্য্যের সাথে মোকাবেলা করা চাই। অধৈর্য হওয়া যাবেনা। মাওয়ায়েজে হাসানা এর মাধ্যমে মানুষ দ্বীনের লাইনে আনার চেষ্টা করুন। আল্লাহ আমাদের রহম করুন। আমিন ছুম্মা আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট


