কওমী নিয়ে আমার লেখা যখন পাগলের প্রলাপ

কওমী নিয়ে আমার লেখা যখন পাগলের প্রলাপ

ডাক দিয়ে যাই । লাবীব আব্দুল্লাহ

কওমী নিয়ে আমার লেখা যখন পাগলের প্রলাপ

আমি সাধারণত ফোন কম ধরি৷ এটি আমার বাজে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে৷ মোবাইলে কথা যখন দশ টাকা মিনিট তখন বেশী কথা বলতো না মানুষ৷ কথা বলতো হিসাব করে৷ আমার পরিবারে ছোট ভাই থাকতো সৌদী আরবে৷ মিনিটে ২৫ টাকা খরচ হতো৷ তখন আমি মোবাইলে বেশী কথা বলতাম৷ এখন মোবাইল আমার জন্য বিড়ম্বনার যন্ত্র৷ তাছাড়া করোনাকালে বাংলাদেশে 20% কথা বলা হচ্ছে৷ তবে মিডিয়ার ক্যামেরা সামনে পেলে আমাদের দেশের রাজনীতি ময়দানের নেতারা কথা একটু বাড়তি বলেন৷ সব দলেই এই সমস্যা৷ আমি কে রাবিশ বলতো কে বাবরীয় ভাষায় কথা বলে তা বলতে পারি কিন্তু করোনাকালে কাউকে দোষ দিতে বা দোষ চর্চা করতে চাচ্ছি না৷

মোবাইল ধরি না এই অভিযোগ বা বদনামের সঙ্গে আমার আরেকটি দোষ রয়েছে, আমি কওমী মাদরাসার বিরুদ্ধে লেখালেখি করি৷ সেই ফেবুতে কওমীর ভালো মন্দ দিক আলোচনা করে আপতত খসড়া প্রস্তাব শিরোনামে ১০০ প্রস্তাব লিখেছিলাম৷ সেই প্রস্তাবগুলো লিখতে আমার ভাবতে হয়েছে৷ লিখতে জীবনের মূল্যবান পূজি-সময় খরচ হয়েছে৷ অনেক সময় আমার এম বি থাকে না এবং পর্যাপ্ত টাকা পয়সাও থাকে না তবুও এম বি কিনে সেই লেখাগুলো পোস্ট করেছি৷ এর বিনিময়ে আমি লাভ ও ফায়দা হিসাবে লকব পেয়েছি “লাবীব সাহেব কওমীবিরোধী”৷

আমি কওমীর সরকারি সনদের আগেও বিরোধী এখনও এবং আগামীতেও থাকার ইচ্ছে৷ তবে বেফাক ও হাইআপন্থী কিছু লোক আমার লেখাকে বলে “পাগলের প্রলাপ! তাছাড়া আমাকে আরও কিছু সনদ ও লকব দেওয়া হয়৷ আমি এই লকব পেয়ে অনেকটা গর্বিত বলা চলে৷

এই দেশে কোনো আলেমকে পছন্দ না হলে সোজাসাপ্টা বলে দেবে তিনি গোমরাহ৷ তিনি আহলে হাদীস৷ তিনি দালাল৷ তিনি জামাতের দালাল৷ তিনি আওয়ামী দালাল৷ তিনি বিএনপির দালাল!

আমি আবার কার দালাল তা না জানলেও কেউ কেউ আমাকে নানাজনের দালালও বলে! মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবকে একবার আল্লামা শাহবাগী লেখায় হযরতের ভক্তরা আমাকে ঘৃণা করল৷

হযরতের সঙ্গে এক মাহফিলের মেহমানখানায় নিরাপত্তা রক্ষী এবং ভক্তপরিবেষ্টিত অবস্থায় দেখে দূর থেকে সালাম দিলাম৷ তিনি হেসে বললেন, “লাবীব সাহেব, লিখে যান, লেখা বন্ধ করবেন না৷ নিয়মিত লিখছেন তো?”

ভক্তরা অবাক৷ অবাক আমিও ৷ আমি বলি আল্লামা শাহবাগী আর তিনি বলেন, লিখে যান! আমি ভেবেছিলাম পুলিশকে বলে একটা ঠ্যাংগানির ব্যবস্থা করবেন আমাকে সামনে পেয়ে! এই বাজে অভ্যাসটা মনে হয় আল্লামার কম৷ ইচ্ছে করলেই এই কাজটা ক্ষমতা প্রয়োগ করে করতে পারেন৷ আমার জানা মতে তিনি আলেমদের এই হয়রানি করেন না৷

এই কথাও কি আবার দালালি হলো কি না? আমি মাসিক পাথেয় মাসিক ম্যাগাজিনে টুকটাক লিখতাম অনেক আগে৷ মাসিক রাহমানী পয়গামসহ আরও মাসিক পত্রিকাতেও লিখতাম৷ পাথেয় তখন মুদ্রিত হতো কাগজে৷ অনলাইনে আমার কোনো কোনো লেখা দেয় পাথেয় পরিবার৷ কেন আমি পাথেয় অনলাইনে লিখি তাই আমি পাথেয় দালাল!

আমি চরমোনাই ঘরানার মাসিক কাবার পথে এলোমেলো ভাবনা শিরোনামে দীর্ঘ পাঁচ বছর কলাম লিখেছি৷ আমি কিন্তু চরমোনাইরও বিরোধী কোনো কোনো ভক্তদের কাছে৷ আমার সৌভাগ্য পীর সাহেব চরমোনাইয়ের জীবিত থাকলে বার্ষিক মাহফিলে মঞ্চে বসে বসে বয়ান শুনেছি এবং দরবারে মেহমান হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিলাম৷ আমার নাযেমে তালীমাতকালীন এক মাদরাসায় একবার তিনি বোখারীর একটি দরসও দিয়েছিলেন৷ আমি ছিলাম আয়োজক৷ কিছুদিন আগে শায়খে চরমোনাই মাওলানা ফয়জুর কারীমের সঙ্গে একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদকের পরিচয়ে একান্তে প্রায় আড়াই ঘণ্টার আলাপর্ব চলে৷ যথারীতি কিছু মুরীদ ক্ষ্যাপা কেন আমি হযরতকে বললাম আপনার নামে অভিযোগ রয়েছে আপনি আওয়ামী দালালি করেন! তিনি হেসে হেসে উত্তর দিলেন৷

আমি ভেবেছিলাম হুজরাখানা থেকে আমাকে বের করে মুরীদদেরকে পিটাতে বলবেন! প্রিয় দেলোয়ার হোসাইন সাকী ভাই ছিলেন কাছেই৷ ছিলেন অধ্যক্ষ ইউনুস সাহেবও তিন্তু মুরীদ বা নেতৃবর্গ আমাকে কিছু করেন নি৷ এক কাপ কফি পরিবেশন করেছেন বৈঠকে এক খাদেম৷ আমি শায়খের পড়ালেখা, বাচ্চাদেরকে কীভাবে পড়ালেখা করাচ্ছেন এবং জীবন নির্বাহের জন্য কী কী ব্যবসা বাণিজ্য করেন সে আলাপ করলাম এবং বিস্মিত হলাম আমাকে বন্ধুর মতো মনে করে গল্প করলেন৷ এটি চরম সহনশীলতা ছাড়া সম্ভব নয়৷ আমার নামে সম্ভত অভিযোগ পৌঁছানো হয়েছিলো লাবীব সাহেব চরমোনাইয়ের হেলিকপ্টার নিয়ে ফেবুতে পীর সাহেবের ছবিসহ পোস্ট দিয়েছে! আরও মজার এ মধুময় দালালির ঘটনা রয়েছে আমার জীবনে৷

আজকের লেখাটি মুহতামিমদের দালালি সংক্রান্ত৷ ফেবুতে করোনাকালে মুহতামিমদের বেতন দেওয়া না দেওয়া নিয়ে কেউ কেউ লিখছেন৷ সব লেখা তো দেখা সম্ভব হয় না৷ দুই জন মুহতামিম বললেন, চাপে আছি৷ আপনি কিছু লিখুন। আমি বললাম, আমি তো কওমীবিরোধী ভাইজান৷ তাছাড়া গত ২৯ বছর ধরে আমি সাধারণ শিক্ষক বা উস্তায৷ আমি তো সব সময় শিক্ষকের পক্ষে এবং যথা সময়ে তাদের অজিফা পেয়ে যাবেন সেটির পক্ষে কথা বলি এবং বলবো৷
মাঝে আমি মুহাতামিমও ছিলাম কয়েকটি মাদরাসার৷ আমি মুহতামিম ও উস্তাযদের সমস্যাগুলো কাছ থেকে জানি৷ আমি যখন স্থায়ী সম্পদের ব্যবস্থার কথা বলি বা শিক্ষকদের সহায়তা ফান্ডের কথা লিখি বা আপদকালীন ফান্ডের কথা লিখেছি তখন আমাকে তাওয়াক্কুলবিরোধী ও দুনিয়াদার বলে গালি দেয়া হয় এবং গোমরাহর সনদ ট্যাগ দেয়া হয়৷ এখন অনেকেই লিখেন আমি দর্শক গ্যালারিতে৷

নানা কাহিনী লিখলে লম্বা হবে লেখা৷ এখন একটা দালালি করি মুহতামিমের পক্ষে, হে প্রিয় আসাতাযায়ে কেরাম আপনারা ফেবুতে হযরত মুহতামিমদের বিরুদ্ধে লেখা না লিখে সরাসরি কথা বলুন৷ লিখলে টাকাও পাবেন না খেদমতটাও যাবে মনে হচ্ছে আমার কাছে৷ তাছাড়া মানবিক কারণে বা আপনাদের লেখার বদৌলতে হযরত মুহতামিমগণ করোনাকালে বিকাশে আপনাদের অজিফা পাঠাচ্ছেন বা ফিকির করছেন৷ সবাই এক পাল্লার নয় মুহতামিম সাহেবান৷ আমাদের মধ্যে যারা শিক্ষক মুহতামিম বা মাদরাসার অজিফার উপর নির্ভর না করে বিকল্প অর্থ আয়ের বা উপার্জনের জন্য কোশেশ করেন৷ গোমরাহ বললেও করেন৷ হালাক হয়ে যাবেন বলে লকব দিলেও করেন৷

করোনাকালে কেউ কাউকে গায়েল করা নয়৷ পরস্পরে সহযোগী হই আমরা৷ করোনা উত্তরকালে বহছ মোবাহাছা হতে পারে৷ বিশেষ করে খায়েন মুহতামিমদের মাদরাসা থেকে খেদাও আন্দোন হবে আপাতত একটু সবর করে পরস্পরে সহযোগিতা করি৷ এই কথা কার দালালি হলো জানি না৷

লেখাটি শুরু করেছিলাম ফোন ধরা নিয়ে৷ আমি করোনাকালে ফোন ধরি নির্ধারিত সময়ে বা অসময়ে৷
উস্তায বা মুহতামিমের বা কোনো ভাইয়ের৷ ইনবক্সে যোগাযোগ করি৷ কে কখন মরে যাবে ওপারের ডাক আসবে বলা যায় না৷ সবাইকে মাফ করে সবার কাছে মাফ নিয়ে রাখলে ভালো৷ এই মহাসংকটে কথা দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া যায়, সাহস দেয়া যায়৷ আমি সেই চেষ্টা করি৷

গতকাল আমার আহলিয়া বলল, কেউ টাকা পেলে ডায়েরিতে লিখে রাখেন! কেউ টাকা পাইলে আমার কাছে প্রকাশ্যে জানাতে পারেন বা ইনবক্সে৷ জীবনসাথীর কথায় আমিও ভয়ে মৃত্যুর চিন্তা করছি৷ করোনা ভাইরাস সময় দেয় না৷ লেনদেন ক্লিয়ার করে মরতে পারলে ওপারে আছান হবে৷

কওমী মাদরাসার শিক্ষকতা বা মুহতামিম হওয়া এটি সাধারণ কোনো বিষয় নয়৷ পৃথিবীর দেশে দেশে শরনার্থী বা রোহিঙ্গা ভাইদের কথা মাথায় রেখে খেদমতে জড়িত থাকতে হয়৷ শরনার্থীদের মতোই যাদের জীবন৷

সরল সহজ কুরবানির জীবন৷ ত্যাগের জীবন৷ উদ্বাস্তু জীবন৷ ওপারে ভোগ এপারে ত্যাগ এর নাম কওমী মাদরাসার খেদমত৷ সরকারি সহযেগিতার আশাও করেন না পরওয়া করেন না৷ অনেকেই তো সারা জীবন অজিফা বা বেতন ছাড়াই দীনি ইলমের খেদমত করে যান৷ যারা মাদরাসার টাকা খেয়ানত করে সে হোক কমিটি মুহতামিম বা উস্তায সে তো জাহান্নামের আগুন ভক্ষণ করে৷ সবশেষ মুহতামিম ও উস্তায এক পরিবার৷ সুখ দুঃখ পরস্পরে ভাগ করে নিবে বিশ্বব্যাপী কোভিড- ১৯ এর মহাসংকটকালে৷ রুহামাউ বাইনাহুম হোক আমাদের পরিচয়৷

ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট
০৪.০৪.২০২০

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *