কমিউনিটি ক্লিনিক বাঁচায় প্রাণ

কমিউনিটি ক্লিনিক বাঁচায় প্রাণ

দেশ ভাবনা । নিহার রঞ্জন সরকার

কমিউনিটি ক্লিনিক বাঁচায় প্রাণ

গ্রামীণ জনপদের অসহায় দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এখান থেকে বিনামূল্যে শুধু স্বাস্থ্যসেবাই নয়, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। সুবিধা বঞ্চিত মানুষেরা সহজেই স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। কমিউনিটি ক্লিনিক হবার কারণে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য দূর দূরান্তে ছুটতে হয় না। সব বয়সী মানুষ বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েরা বিশেষ সুবিধা হচ্ছেন।

স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিক বিশ্বের বিশ্বের অনেক দেশের কাছে রোলমডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে সরকারের সেরা অর্জন দেশব্যাপী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন। বিগত ২০০০ সালের ২৬ এপ্রিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতী ইউনিয়নে প্রথম কমিউনিটি ক্লিনিক উদ্বোধনের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সারাদেশে ১৩ হাজার ৮ শত ৬১টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে এবং ১ হাজার ২৯টি কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক গর্ভবতী মা, নারী ও শিশুসহ সব বয়সী মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে। ২০১৮ সালে জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৭১তম সম্মেলনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদশের কমিউনিটি ক্লিনিক। (ডব্লিউএইচও) এর মহাপরিচালক কমিউনিটি ক্লিনিকের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন, তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কমিউনিটি ক্লিনিক যে সফলতা দেখিয়েছে তা বিশ্বের অনেক দেশের জন্য অনুসণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

১৯৯৬ সালে বর্তমান সরকার প্রথম বারের মতো ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কমিউনিটি ক্লিনিক বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করে। প্রতি ৬ হাজার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি করে মোট ১৩ হাজার ৫০০ ক্লিনিক তৈরির পরিকল্পনা ছিল। ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ক্লিনিকের নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং ৮ হাজার ক্লিনিক চালু করা সম্ভব হয়। ২০০১ সালে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে। শত শত কমিউনিটি ক্লিনিক পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্য খাতের অগ্রাধিকার দিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করে।

দেশের সকল জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল লক্ষ্য। এ কর্মসূচির আওতায় গর্ভবতী মায়েদের মাতৃত্বকালীন যাবতীয় সেবা নিশ্চিত করা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার সব ধরনের সেবা প্রদান করা, জন্ম, মৃত্যু নিবন্ধন, নব বিবাহিত দম্পতি ও গর্ভবতী মায়েদের নিবন্ধন করা, মা ও শিশুর পুষ্টি বিষয়ে সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা বিষয়ে পরামর্শ প্রদান এবং জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার জন্য উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে প্রেরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে মাসে গড়ে ৯৫ লাখ মানুষ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা এবং বিনামূল্যে ৩০ প্রকারের ঔষধ পেয়ে থাকে। কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হওয়ার পর থেকে উপজেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক কমেছে।

বাংলাদেশ ২০১০ সালে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে জাতিসংঘের এমডিজি এ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছিল। স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে যে অভাবনীয় উন্নতি করেছে, এর মূলে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। এটি সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া নিশ্চিত করেছে। ফলে নবজাতক ও শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু এবং প্রজনন হার নিয়ন্ত্রণসহ ১০টি সূচকে সন্তোজনক অগ্রগতি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনেও গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় এ মডেল কার্যকর অবদান রাখবে।

সেভ দ্য চিলড্রেন এর ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালে গত দুই দশকে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে। চারটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি অর্জন করেছে, যেখানে ভুটানের শিশু মৃত্যুর হার কমেছে ৬০ শতাংশ, নেপালে ৫৯ শতাংশ এবং ভারতের ৫৭ শতাংশ। আর বাংলাদেশে শিশু মৃত্যু হার কমিয়েছে ৬৩ শতাংশ। সরকার মাতৃ ও শিশু মৃত্যুরোধে সকল সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। আর এই কারণেই দেশে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু উভয়ই কমেছে। ২০১৭ সালে গর্ভকালীন মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ছিল ১৭৬ জন, বর্তমানে তা ১৭২ জন। ২০১৫ সালে প্রতি হাজার নবজাতকের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ২০ জন, বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে ১৮ দশমিক ৪ ভাগে দাঁড়িয়েছে। ২০০৯ সালে ৪৩ শতাংশ শিশু (ছয় মাস বয়স পর্যন্ত) শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করত। বর্তমানে এ হার বেড়ে হয়েছে ৬৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় কম ওজনের শিশুর জন্ম ৪১ শতাংশ থেকে কমে ২৮ শতাংশ হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মায়েদের গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা কমপক্ষে চারবার নিতে হবে।

সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক, পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, উপজেলা হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, মাতৃ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই সেবা বিনা মূল্যে প্রদান করা হচ্ছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে জরুরি প্রসূতিসেবার লক্ষ্যে স্ত্রীরোগ, প্রসূতিবিদ্যা ও ধাত্রীবিদ্যায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা ইউনিসেফ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সহায়তায় সরকার পরিচালনা করে থাকে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২৪ ঘন্টা ডেলিভারির সুযোগ রয়েছে। গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের কী কী করণীয় এবং তাদের পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হচ্ছে সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো থেকে। গর্ভবতী মায়েদের সেবা কোনো ভাবেই যাতে ব্যহত না হয় সে লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নার্স ও চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

গর্ভবতী মায়েদের প্রসবকালীন এবং প্রসব পরবর্তী সময় ডাক্তার বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। কমিউনিটি ক্লিনিকের ফলে গ্রামাঞ্চলের মায়েরা সহজেই এ সুযোগ পাচ্ছে। প্রয়োজনীয় টিকা দেয়া, বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়াসহ প্রসবকালীন খাবার দাবার ও সেবাযত্নের ব্যাপারে স্বাস্থ্যকর্মীরা পরামর্শ ছাড়াও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সচেতন করছে। সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা এবং স্বাস্থ্যখাতে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ঐকান্তিক শ্রমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমানো, টিকাদানে অভূতপূর্ব অর্জন সম্ভব হয়েছে।

টিকাদানের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়- এমন একটি সফল কর্মসূচির নাম হচ্ছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। এই কর্মসূচির আওতায় ১০টি রোগের বিরুদ্ধে ছয়টি টিকা দেওয়া হয় শূন্য থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের। রোগগুলোর যক্ষ্ম, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি, হাম, রুবেলা, পোলিও ও নিউমোনিয়া। উল্লেখ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশকে পোলিও মুক্ত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এছাড়া সরকার বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ এবং শিশুমৃত্যু রোধে বছরে দু’বার সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচির আয়োজন করা হচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের ১টি করে নীল রঙের এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ১টি করে লাল রঙের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। বাংলাদেশে প্রায় শতভাগ শিশু টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এসেছে। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ভ্যাকসিন হিরো’র অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। পাশাপাশি এ কর্মসূচির আওতায় ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রজননক্ষম নারীদেরও টিটি টিকার পাঁচটি ডোজ দেওয়া হচ্ছে।

করোনা পরিস্থিতিে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘জয় বাংলা টেলিমেডিসিন অ্যাপ’ চালু করেছে বর্তমান সরকার। এর মাধ্যমে ভিডিওকল করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছ থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ নেওয়া যাবে। এছাড়া জরুরি তথ্য ও সেবা ৩৩৩ এবং স্বাস্থ্য বাতায়ন হেল্প লাইন ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ পাওয়া যাবে।

স্বাস্থ্যসেবাকে আরো জনবান্ধব করতে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রভাইডার নিয়োগ ও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গাইনি ও এনেসথেশিয়া বিভাগের চিকিৎসকদের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পদায়ন করা হচ্ছে। এতে এদিকে কমিউনিটি ক্লিনিকের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে গর্ভবতী মা ও শিশুসহ সব শ্রেণির মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। এ সবই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বের ফসল। এতে অবদান রয়েছে গণমানুষের সহযোগী মনোভাবেরও। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত এগিয়ে যাচ্ছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে।

লেখক : কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *