করোনায় ভয় নয় প্রয়োজন সচেতনতা

করোনায় ভয় নয় প্রয়োজন সচেতনতা

এই সময়। ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী

করোনায় ভয় নয় প্রয়োজন সচেতনতা

২০২০ সালের শুরু থেকেই সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক বিরাজ করছে, তা নয় কোনো মারণাস্ত্র বা বিশ্বযুদ্ধ অথবা রাজনৈতিক সংকট; এ আতঙ্কের নাম ‘করোনা ভাইরাস’। খালি চোখে তো দূরের কথা, সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রেও এ ভাইরাস দেখা না গেলেও কার্যত তা স্তব্ধ করে দিয়েছে সমস্ত পৃথিবীকে। এর আগেও বিভিন্ন সময় ভাইরাসটির আরো বেশ কিছু প্রজাতি পাওয়া গিয়েছিলো পৃথিবীতে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০০৩ সালে ‘SARS-CoV’, ২০১২ সালে ‘MERS-CoV’ ইত্যাদি। সর্বশেষ ২০১৯ সাল চীনে ‘SARS-CoV 2’ পাওয়া যায়, যা প্রথমে নোভেল করোনাভাইরাস (nCoV-19) নামে পরিচিত ছিলো। রোগটির নাম ‘COVID-19’।
২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান শহরে করোনাভাইরাসের এ প্রজাতির সংক্রমণ দেখা দেয়। ২০২০ সালের পহেলা জুলাই পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ১ কোটি ৮ লাখের বেশি মানুষ COVID-19-এ আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৫ লাখ ১৯ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে এবং ৬০ লাখের বেশি রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে আক্রন্ত রোগীদের ৯৫ শতাংশই মৃদু সংক্রমণে রয়েছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো চলছে মৃত্যুর মিছিল। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে আক্রান্তের হার দ্রুত বাড়ছে।

COVID-19 সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সৃষ্ট বায়ুকণা (Respiratory Droplets) থেকে ছড়ায়। এছাড়া সংক্রমিত ব্যক্তির জীবাণু হাঁচি-কাশির কারণে বা জীবাণুযুক্ত হাত দিয়ে স্পর্শ করার কারণে পরিবেশের বিভিন্ন বস্তুর পৃষ্ঠতলে লেগে থাকলে এবং সেই ভাইরাসযুক্ত পৃষ্ঠতল অন্য কেউ হাত দিয়ে স্পর্শ করে নাকে-মুখে-চোখে হাত দিলে করোনাভাইরাস নাক-মুখ-চোখ দিয়েও শরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত হওয়ার ২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়; গড়ে ৫ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা যায়।

২০২০ সালের প্রারম্ভেই রোগটি বিশ্বব্যাপী পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০১৯-২০২০ করোনাভাইরাস এর আক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করেছে। ব্যাধিটির সাধারণ উপসর্গ হিসেবে জ্বর, শুকনো কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। কিছুক্ষেত্রে মাংসপেশীর ব্যথা, গলায় ব্যথা, সর্দি, পেটের পীড়া দেখা যেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপসর্গগুলো নমনীয় আকারে দেখা যায়, কিন্তু কিছু গুরুতর ক্ষেত্রে ফুসফুস প্রদাহ (নিউমোনিয়া) এবং বিভিন্ন অঙ্গের বিকলঙ্গতাও দেখা যায়। সাধারণত RT-PCR-এর মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা হয়। সংক্রমিত হবার পর বিশ্বব্যাপী এ ব্যাধিতে মৃত্যুর হার গড়ে ৩.৪ শতাংশ, যেখানে ২০ বছরের নিচের রোগীদের মৃত্যুর হার ০.২ শতাংশ এবং ৮০ বছরের ঊর্ধ্বে রোগীদের প্রায ০. ১৫ শতাংশ।
ঈঙঠওউ-১৯ প্রতিরোধের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা এবং বিশেষ করে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা। ঘনঘন সাবান-পানি বা ৬০ ভাগ এলকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ থেকে বিরত থাকা এবং যথাসম্ভব ঘরে থাকা করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে কাজ করে। ফলে বর্তমান প্রেক্ষিতে করমর্দন বা কোলাকুলি থেকে বিরত থাকতে হবে।

করোনাভাইরাস কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ ছাড়াই দুই সপ্তাহ সময় ধরে যে কোনো ব্যক্তির দেহে তার অজান্তেই বিদ্যমান থাকতে পারে। এজন্য করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে অথবা বিদেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে (উপসর্গবিহীন ব্যক্তিদের আলাদা রাখা) থাকতে হবে এবং করোনা ভাইরাস উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করাতে হবে। হাঁচি-কাশির সময় টিস্যু পেপার ব্যবহার করে হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে। টিস্যুপেপার না থাকলে কনুইয়ের ভাঁজে মুখ ঢেকে হাঁচি-কাশি দিতে হবে। মুখ না ঢেকে হাঁচি-কাশি দিলে করোনাভাইরাস তার আশেপাশের ১ থেকে ২ মিটার পরিধির মধ্যে বাতাসে কয়েক ঘন্টা ভাসমান থাকতে পারে। সাধারণ ও সুস্থ ব্যক্তির সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করা উচিৎ, আর আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন এমন ব্যক্তি এবং তাদের পরিচর্যায় থাকা সেবাদানকারীদের সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার অপরিহার্য। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি স্বল্প রোগ প্রতিরোধক্ষম ব্যক্তিদের বেশি সাবধান থাকতে হবে, কারণ তাদের আক্রান্তের আশংকা বেশি। COVID-19 -এর কোনো টিকা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক নেই। উপসর্গুগলোর চিকিৎসা, সহায়ক যত্ন, আইসোলেশন (উপসর্গযুক্ত ব্যক্তিদের আলাদা রাখা) এবং পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণই একমাত্র করণীয়।

ডাক্তার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য, বিশেষত যাদের COVID-19 রোগীর সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা আছে, তাদের জন্য PPE (Personal Protective Equipment) বাধ্যতামূলক, কারণ তা না হলে তিনি নিজে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি বিশাল জনগোষ্ঠীকেও আক্রান্ত করে ফেলবেন। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেন এক রোগী থেকে আরেক রোগী বা অন্য যে কোনো ব্যক্তির দেহে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হতে না পারে, সেজন্য সেখানে কর্মরত সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীকে রোগীকে স্পর্শ করার আগে, পরিষ্কারকরণ বা জীবাণুমুক্তকরণ পদ্ধতি প্রয়োগের আগে, রোগীর দেহজ রস বা তরল গায়ে লাগার সম্ভাবনা থাকলে, ঠিক তার পরপর, রোগীকে স্পর্শ করার পর এবং রোগীর আশেপাশের পরিবেশ স্পর্শ করার পর অবশ্যই হাত ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এছাড়া WHO, সরকার, IEDCRসহ বিভিন্ন স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান আমাদের সকলকে যে পরামর্শ দিচ্ছে, তা পালন করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, নিজেকে এবং অন্যকে বাঁচাতে সহায়তা করতে হবে।

বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়। IEDCR-এর তথ্যমতে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে এখন পর্যন্ত (৩১ মে) মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৭ হাজার ১৫৩ জন, যার মধ্যে মারা গেছেন ৬৫০ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৯ হাজার ৭৮১ জন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। ইতিমধ্যে সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং গণপরিবহন স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দেয়া হয়েছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী যেন করোনাকালীন বিপদে না পড়ে এবং দ্রব্যমূল্য যেন বৃদ্ধি না পায়, এজন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী তৈরি করছে এবং দেশব্যাপী তা সরবরাহের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সময়োপযোগী উদ্যোগ-পদক্ষেপ নিচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। দেশের মানুষ ও অর্থনীতি সুরক্ষার করোনাযুদ্ধে সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী এই সংকটের সময় মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতি সুরক্ষার লক্ষ্য নিয়ে বর্তমান সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। কৃষি জমি যেন পতিত না থাকে, কলকারখানার চাকা যেন স্তব্ধ হয়ে না যায় এবং কোনো মানুষ যেন খাদ্যে কষ্ট না পায় এসব বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রাখার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ পর্যন্ত এক লাখ এক হাজার ১১৭ কোটি টাকার ১৮টি প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। করোনা সংক্রমণের চিকিৎসা সেবাকে আরও গতিশীল করতে ২ হাজার চিকিৎসককে জরুরি নিয়োগ দিয়েছে সরকার। আরো ২ হাজার চিকিৎসককে নিয়োগ দেয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া সিনিয়র স্টাফ নার্স পদে ৫ হাজার ৫৪ জনকে নিয়োগ দিয়েছে সরকারি কর্মকমিশন। করোনা সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহ ও হাসপাতালে ভেন্টিলেটরের পরিমানও বাড়ানো হয়েছে, বাড়ানো হয়েছে টেস্ট ল্যাবের সংখ্যা।

গণমাধ্যমগুলি করোনা ভাইরাস ও গুজব প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের পরামর্শগুলো আমাদের অবশ্যই মেনে চলতে হবে। গুজবে কান দেওয়া যাবে না। ডাক্তার এবং এ সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের সুরক্ষা আমাদের হাতেই রয়েছে। IEDCR-এর হটলাইন নম্বর খোলা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে সেখানে ফোন করে সাহায্য নেয়া যায়। পরিবারের সবচেয়ে সংবেদনশীল মানুষটির প্রতি বেশি নজর দিতে হবে। আমাদের সচেতনতা পরিবারকে এবং সর্বোপরি দেশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখবে। ১৯৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবিলা করে বিজয়ী হয়েছি। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এবারের যুদ্ধেও আমরা জয়ী হবো। প্রয়োজন শুধু সকলের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সচেতন থাকা। পিআইডি নিবন্ধ

লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *