করোনা; তরুণদের সংক্রমণের বলি হচ্ছেন বয়স্করা

করোনা; তরুণদের সংক্রমণের বলি হচ্ছেন বয়স্করা

করোনা; তরুণদের সংক্রমণের বলি হচ্ছেন বয়স্করা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর সময়কার মতো এখনো অপেক্ষাকৃত তরুণ বা ২০-৪০ বছর বয়সীরাই বেশি সংক্রমিত হচ্ছেন; কিন্তু মৃতদের মধ্যে বেশির ভাগই বয়স্ক। এখন পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর ৫৫ শতাংশই অপেক্ষাকৃত তরুণ। আর এ পর্যন্ত যারা মারা গেছে তাদের মধ্যে পঞ্চাশোর্ধ্ব ৭৭.২৩ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের সংক্রমণের বলি হচ্ছেন এই বয়স্ক মানুষরা। কারণ পরিবারের অন্যদের মাধ্যমেই ঘরে থাকা বয়স্করা আক্রান্ত হন এবং একপর্যায়ে প্রাণ হারান। অবশ্য শিশুরাও সংক্রমিত হওয়ার কারণ ওই অপেক্ষাকৃত তরুণরাই।

আইইডিসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে যারা পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে তাদের বয়স বিবেচনায় ১-১০ বছরের ৩ শতাংশ, ১১-২০ বছরের ৭ শতাংশ, ২১-৩০ বছরের ২৮ শতাংশ, ৩১-৪০ বছরের ২৭ শতাংশ, ৪১-৫০ বছরের ১৭ শতাংশ, ৫১-৬০ বছরের ১১ শতাংশ এবং ষাটোর্ধ্ব ৭ শতাংশ।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া গতকাল সকাল পর্যন্ত হিসাবে এ পর্যন্ত দেশে করোনায় মোট মৃতদের মধ্যে ১-১০ বছরের ০.৪৪ শতাংশ (২০ জন), ১১-২০ বছরের ০.৮৫ শতাংশ (৩৯ জন), ২১-৩০ বছরের ২.৩৭ শতাংশ (১০৯ জন), ৩১-৪০ বছরের ৬.০৩ শতাংশ (২৭৭ জন), ৪১-৫০ বছরের ১৩.০৯ শতাংশ (৬০১ জন), ৫১-৬০ বছরের ২৭.১৫ শতাংশ (এক হাজার ২৪৭ জন) এবং ষাটোর্ধ্ব ৫০.০৮ শতাংশ (দুই হাজার ৩০০ জন)।

দেশে করোনায় মৃত্যুর ঝুঁকির ক্ষেত্রে আগে থেকেই অন্য জটিল রোগে আক্রান্ত পঞ্চাশোর্ধ্ব সবাইকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। অন্যদিকে এখন সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ বা পরিমাপের অন্যতম সূচক হিসেবে মৃত্যুর হার বা পরিসংখ্যানকেই সবচেয়ে বেশি নজরে রাখা হচ্ছে।

সেই সূচকে দেশে করোনায় সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানার দেওয়া বুধবারের তথ্য অনুসারে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার মৃত্যুর তালিকায় থাকা ৪১ জনের মধ্যে ৩৪ জন বা ৮৩ শতাংশই পঞ্চাশোর্ধ্ব। আর মোট মৃত চার হাজার ৫৯৩ জনের মধ্যে ৭৭.২৩ শতাংশ বা তিন হাজার ৫৪৭ জনের বয়স ৫০ বছরের ওপরে।

অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, আগে থেকে ডায়াবেটিস, হৃদেরাগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার, কিডনির রোগসহ অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তদের মধ্যে করোনার উপসর্গ দেখা দিলেই তাঁদের বাসায় না রেখে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে বা চিকি ৎসকের পরামর্শ অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে। কভিড পরীক্ষা বা ফলাফলের অপেক্ষায় থাকতে গেলে তাঁদের ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। বরং হাসপাতালে যাওয়ার পর চিকিৎসকরাই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। এতে তাঁদের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আরো আগে থেকেই এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছি। যাঁরা এই পরামর্শ মেনে চলছেন তাঁদের অনেকেই হয়তো সুফল পেয়েছেন বলেই মৃত্যু তুলনামূলক কম থাকছে বা অনেক বেশি হারে বাড়েনি।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই বয়সভিত্তিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে আসছি। এই তথ্য অনুসারে বলা যায়, মূলত অপেক্ষাকৃত তরুণ বা ২০-৪০ বছর বয়সীদের মাধ্যমেই করোনায় মৃত্যুর সূচকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ ঘটছে। শিশুরাও আক্রান্ত হওয়ার কারণ এই তরুণরা। কারণ করোনার নানা সতর্কতার কারণে বয়স্ক বা শিশুরা সাধারণত ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ফলে ঘরের বাইরে গিয়ে সরাসরি তাদের আক্রান্ত হওয়ার সুযোগও কম। যদিও শিশুদের মৃত্যুহার খুবই কম। সেদিক থেকে এখন বয়স্করাই রয়েছেন মৃত্যুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে।’

তিনি বলছেন, বয়স্ক মানুষ আছেন—এমন সব পরিবারের অপেক্ষাকৃত তরুণ বা কর্মজীবীরা নানা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাচ্ছেন। ফলে বাইরে অন্যদের মাধ্যমে তাঁরা সংক্রমিত হয়ে ঘরে আসার পর নিজেদের অসাবধানতায় সংক্রমিত করছেন পরিবারের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের। এককথায় বলতে গেলে বলা যায়, অপেক্ষাকৃত তরুণদের সংক্রমণের বলি হচ্ছেন ঝুঁকিপূর্ণ বয়স্ক মানুষরা।

ওই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে বলেন, এখন সংক্রমণ কমলেও ঘরের বাইরে ঝুঁকি আছেই। ফলে যারাই ঘরের বাইরে যাবে, তারা অবশ্যই ঘরে ফিরে অন্যদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। বিশেষ করে ঘরে ঢুকে অন্যদের সংস্পর্শে বা ঘরে কিছু স্পর্শ করার আগে পোশাক আলাদা জায়গায় রাখা, ভালো করে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা আবশ্যক। সম্ভব হলে সাবান দিয়ে গোসল করা, বয়স্কদের কাছ থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, তাঁদের কাছাকাছি গেলে মাস্ক ব্যবহার করা, বাইরে থেকে ঘরে নিয়ে আসা কোনো কিছু বয়স্কদের স্পর্শ করতে না দেওয়া, অতিপ্রয়োজনে স্পর্শ করার পর হাত সাবান ও পানি দিয়ে ধুয়ে দেওয়া বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে দেওয়ার বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *