কান নিয়েছে চিলে | মুহাম্মাদ আইয়ুব
বাংলাদেশের মানুষ ‘কান নিয়েছে চিলে’র সংস্কৃতি থেকে বোধহয় কোন কালেই বের হতে পারবে না। গুজবের ভিত্তিতে ধর্মের নামে এরা যেখানে সেখানে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেও ধর্ম অবমাননার জঘন্য অপবাদ নিয়ে নৃশংস ভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন রংপুরের শহীদুন্নবী জুয়েল।
বাংলাদেশের মাটি বলে কথা। এ মাটিতে ধর্মের নামে মুনাফিকদের কাছে সবই সম্ভব। ধর্ম ও কুরআন অবমাননার যে গুজবে ভাই শহীদ শহীদ হলেন মজার ব্যাপার হচ্ছে,দিন শেষে সেই গুজবের কোন অস্তিত্ব পাওয়া গেল না! হায় রে অসভ্য মুনাফিকুন।
ম্যাঁক্রো ইস্যুর মাঝেই যখন লালমনিরহাটের ঘটনা ঘটল তখন সাম্প্রদায়িক মার্কা কিছু জাতীয় পত্রিকা ও ফেসবুকের নাবালক বাচ্চারা শহীদুন্নবীর হত্যার পক্ষে সাফাই গাওয়া শুরু করে দিল। এ কেমন দেশ আমার! গুজবের মাঝে মানুষ হত্যা আবার তার বৈধতার পক্ষে ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা?
আসলে ইসলাম কি চায়?
পাটগ্রামের ঘটনা নিছক গুজব। আর এ সম্পর্কে ইসলামের প্রথম ও শেষ কথা সূরা হুজুরাতের ছয় ও বারো নম্বর আয়াত ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুলুকে আজীম তথা উত্তম চরিত্র মাধুর্য। পর্যায়ক্রমে আমি সবগুলো গল্প অল্প করে উল্লেখ করছি।
আল্লাহ পাক বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী তোমাদের নিকট কোন বার্তা আনয়ণ করে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে যাতে অজ্ঞতা বশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ [সূরা হুজুরাত আয়াত নং ৬]
অপর আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা বহুবিধ অনুমান হতে দূরে থাক; কারণ অনুমান কোন কোন ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করনা এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করনা। তোমাদের মধ্যে কি কেহ তার মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করতে চায়? বস্তুতঃ তোমরাতো এটাকে ঘৃণাই মনে কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ তাওবাহ গ্রহণকারী, পরম দয়ালু।’ [সূরা হুজুরাত আয়াত নং ১২]
একজন নামাজি মুসলমানকে ধর্ম অবমাননার গুজবে হত্যা করে আজ যারা মামলা মাথায় নিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে চোরের মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছে তাদের খুব বেশি করে এই আয়াতদ্বয় স্মরণ হচ্ছে। কিন্তু লাভ কি? কথায় আছে ‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিওনা’।
১. মক্কা বিজয়ের দিন আউস গোত্রপতি হযরত সা’দ বিন উবাদা (রাঃ) আবু সুফিয়ানকে লক্ষ করে বললেন ‘আল ইয়াউমু ইয়াউমুল মালহামাহ’ তথা আজ রক্তপাতের দিন। এ সংবাদ হুজুর (সাঃ) এর কানে পৌঁছতেই তিনি হযরতের সা’দের কাছ থেকে ঝান্ডা নিয়ে তাঁর ছেলেকে দিয়ে দিলেন আর বললেন ‘আল ইয়াউমু ইয়াউমুল মারহামাহ’ আজ তো ক্ষমার দিন, ভালবাসার দিন, রহমের দিন। (বুখারী শরীফ, কিতাবুল মাগাজী, হাদিস নংঃ৪০৩০)
২. রাসূলের (সাঃ) কাছে সংবাদ আসল কালিমা পড়া সত্ত্বেও উসামা ইবনে যায়েদ এক লোককে হত্যা করেছে। মহানবী (সাঃ) হযরত উসামাকে ডেকে ঘটনার সত্যতা জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন সে তো মৃত্যু ভয়ে কালিমা পড়েছিল। হুজুর (সাঃ) তাঁর দিকে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ‘আফালা শাক্বাক্বতা আন ক্বলবাহু’ তুমি কি তার হৃদয় চিরে দেখেছ? (সে আল্লাহর ভয়ে কালিমা পড়েছিল নাকি মৃত্যুর ভয়ে? ) বুখারী শরীফ -হাদিস নং ৬৮৭২)
প্রিয় পাঠক! সবখানে শুধু সাবিলুনা সাবিলুনা আল জিহাদ ওয়াল জিহাদ স্লোগান চলে না। আগে নিজেকে সংশোধন করে পূর্ণ ঈমানদার হতে হয়। মুসলমান যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতকে এবাউট করে মনগড়া কিছু করতে যায় তাহলে সে হবে বেদআতি। আর যদি তেরো বছরের মক্কী জিন্দেগী ডিঙিয়ে সরাসরি মদীনায় উপস্থিত হয় তাহলে পদে পদে হবে সে লাঞ্চনার শিকার। আজ এই মুহুর্তে লালমনিরহাট ট্র্যাজেডীর মূলহোতা মসজিদের খাদেম জোবেদ আলী আর ডেকোরেটর ব্যবসায়ী আবুল মিয়ার অনুভূতি জানতে পারতেম তাহলে ভালোই হতো। ইবনে উবাইয়ের জাত সন্তানরা কেমন আছে এখন। মনে হয় না ওদের বিচার স্বচক্ষে দেখতে পারব!
বাংলাদেশের বিচারের যে অবস্থা তাতে এক ইস্যুর দাফন সম্পন্ন করতে করতেই নতুন ইস্যুর কাফন পরানো হয়ে যায়। নইলে ধর্মের নামে যারা বিধর্মীদের ধর্ম পালন করে,মুনাফিকদের অবৈধ লালসা চরিতার্থ করে তাদের বুক ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেওয়ার দৃশ্য দেখার বড়ই শখ।
প্রিয় ভাই শহীদুন্নবী জুয়েল! অভিমান করো না ভাই! মাওলায়ে কারিমের কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করছি যেন তিনি তোমাকে পরকালে ভালো রাখেন।
লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক


