কাশ্মীরে ভারত-পাকিস্তানের ‘বোমা বোমা খেলা’

কাশ্মীরে ভারত-পাকিস্তানের ‘বোমা বোমা খেলা’

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ভূস্বর্গখ্যাত কাশ্মীরের দখল নিয়ে তুমুল সংঘর্ষের পর ১৯৪৮ সালে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল ভারত-পাকিস্তান। বিরোধপূর্ণ অঞ্চলটি জুড়ে রয়েছে দুই দেশের মধ্যে সুদীর্ঘ নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলওসি। এ দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক ভালো থাকলে পার্বত্য অঞ্চলটির পরিস্থিতিও ঠাণ্ডা থাকে।

ঈদ-দীপাবলীর মতো অনুষ্ঠানগুলোতে ভারত-পাকিস্তানের সেনারা মিষ্টি বা উপহার আদান-প্রদানও করেন। ক্রিকেট ম্যাচে দুই দেশ মুখোমুখি হলে প্রতিটি চার-ছক্কার মার বা উইকেট পতন উদযাপন করা আতশবাজি ফুটিয়ে, ফাঁকা গুলি ছুড়ে। তবে এখনকার দিনগুলোতে মিষ্টি-উপহার আর দেখা যায় না, আনন্দের বদলে গুলি চলে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে।

গত ১৩ নভেম্বর ভারত দাবি করেছে, এলওসি’র বিভিন্ন অংশে কোনও ধরনের প্ররোচনা ছাড়াই পাকিস্তানের হামলায় তাদের চার বেসামরিক নাগরিক এবং পাঁচ নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও ১৯ জন। আর পাকিস্তান বলেছে, ভারতের ‘অপ্ররোচিত এবং নির্বিচার’ হামলায় তাদের পাঁচ বেসামরিক নাগরিক এবং এক সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। দুই দেশই দাবি করেছে, তারা প্রতিপক্ষকে ‘যোগ্য জবাব’ দিয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিলেও উত্তেজনা ছড়িয়েছিল ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে। সেসময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রকাশিত একটি ড্রোন ফুটেজে দাবি করা হয়েছিল, পাকিস্তান হিমালয়ের হিমশীতল এলাকায় অস্ত্র মজুত বাড়াচ্ছে এবং পরিত্যক্ত গোলাবারুদ ফেলে যাচ্ছে।

২০০৩ সালে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল ভারত-পাকিস্তান, যা মাত্র এক দশক পরেই তা ভেঙে পড়ে। ২০১৮ সাল থেকে ভারতীয় বাহিনীর রেকর্ড করা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে, তবে পাকিস্তানি বাহিনীর হিসাবে তা বেড়েছে ১০ শতাংশের মতো। ২০১৯ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।

গত বছর ভারতীয়রা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন রেকর্ড করেছে ৩ হাজার ৪৭৯টি। আর চলতি বছরে এপর্যন্ত রেকর্ড হয়েছে ৩ হাজার ৮০০টি। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট কোনও ব্যাখ্যা না থাকায় এর হিসাবে পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়।

ভারত ও পাকিস্তানের সবেক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বর্তমানে দুই পক্ষই সেনা চৌকির পাশাপাশি সাধারণ গ্রামবাসীদেরও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। এদিক থেকে অবশ্য বিপাকে রয়েছে পাকিস্তান। ভারতের তুলনায় নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর তাদের গ্রাম ও কৃষিজমির সংখ্যা বেশি। তাছাড়া দেশটির সেন্যরা কাশ্মীর উপত্যকায় একই ধর্মাবলম্বীদের আঘাত করতেও অনিচ্ছুক।

পাকিস্তান জানিয়েছে, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত তাদের অন্তত ১৭০ বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৯১৮ জন আহত হয়েছেন। তবে হামলা-পাল্টা হামলা থেমে নেই। বরং তা ক্রমাগত বাড়ছে। গত বছর ভারত উত্তরাঞ্চলীয় পবর্ত সীমানায় হামলা করতে শুরু করেছে। ওই অঞ্চলের গ্রামগুলো তুলনামূলক জনবহুল এবং কাছাকাছি অবস্থিত। এছাড়া, তারা দূরনিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন রেখেছে, যেগুলো বাঙ্কার ধ্বংস করতে সক্ষম।

ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাধারণ বক্তব্য হচ্ছে, পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অনুপ্রবেশ থেকে ভারতীয় সেনাদের নজর ফেরাতে ইচ্ছা করে গোলাবর্ষণ করে। গত ২৩ নভেম্বর বেশ কয়েকজন অনুপ্রবেশকারী বন্দুকযুদ্ধে নিহত এবং ১৫০ মিটার লম্বা একটি নতুন সুড়ঙ্গ খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছে ভারতীয়রা।

যদিও এলওসি নিয়ে লেখা ‘লাইন অন ফায়ার’ বইয়ের লেখক হ্যাপিমন জ্যাকব দেখিয়েছেন, অনুপ্রবেশ এবং সহিংসতার মধ্যে পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক খুবই দুর্বল। তাছাড়া, গোলাবর্ষণ সেনাদের বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি সজাগ করেও তুলতে পারে।

এ আন্তঃসীমান্ত সহিংসতার আরেকটি ব্যাখ্যা হতে পারে- প্রতিশোধ। ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ডের সাবেক প্রধান জেনারেল ডি এস হুদা বলেন, ২০১৩ সালে ভারতীয় সেনারা সীমান্তে বিশেষায়িত বোমা, স্নাইপার হামলা, এমনকি শিরশ্ছেদের মুখোমুখি হচ্ছিল। এর জেরে তাৎক্ষণিকভাবে সীমান্তে গোলাগুলি বেড়ে যায়। ২০১৯ সালে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় পাকিস্তানভিত্তিক একটি গোষ্ঠীর ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত আরও কঠোর হয়। তখন থেকে ভারতীয় বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, পাকিস্তানকে সবদিক থেকেই আঘাত করা।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *