কৈশোরের নায়ক আলী সাবূনীঃ এক ফালি ইতিহাস

কৈশোরের নায়ক আলী সাবূনীঃ এক ফালি ইতিহাস

স্মৃতি  |  শিক্ষা ও কর্ম  |  বিতর্ক

 

আব্দুস সালাম : আমাদের কৈশোরকালের মাদরাসা জগতের স্মৃতিগুচ্ছ থেকে কয়েকটি জিনিস কখনো মুছে যাবে না। মাদরাসার পেছনের হলুদ নদীর সর্ষে খেত। শান বাঁধানো পুকুরে ভরদুপুরে ডোবাডুবি আর সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ‘সফওয়াতুত তাফাসীর’ নামক চোখ জুড়ানো প্রচ্ছদের রঙিন একটি বই নিয়ে পড়ে থাকা।

তখন বিক্রমপুরের অজপাড়াগাঁয়ের একটি মাদরায় হেদায়েতুন নাহু পড়ি আমরা । একপ্রকার আন্দোলন করে সে বছর কুরআন তরজমার ক্লাস আদায় করে নিয়েছিলাম। তরজমা বুঝার জন্য বাংলা বাজার গিয়ে কিনে এনেছিলাম তাফসীরের এই কিতাবটি।

বৈরুতের দারুল হাদীস প্রকাশনীর ঝকঝকে মলাটের সেই তাফসিরটির নাম ‘সফওয়াতুত তাফাসীর’। অতুলনীয় তিন খণ্ডের সেই কিতাবটির মাধ্যমেই মুহাম্মাদ আলী সাবূনীকে জেনেছিলাম। তাঁর সহজ ও ঝরঝরে লেখা আমাকে দারুণভাবে মোহিত করতো৷ যখন একআধটু আরবীর প্রতি টান জন্মাতে থাকে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই কিতাবটি পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিলাম। সারাদিন ব্যাস্ত থাকতাম সফওয়াতুত তাফাসীর নিয়ে৷ সেই কিতাবটির লেখক; কৈশরের না দেখা আমাদের ভালোবাসার মানুষটি গতকাল না ফেরার দেশে চলে গেলেন।

সেই দিনগুলো পার হয়ে কেটে গেলো অনেকগুলো বছর। শিক্ষক জীবনে আবার সাবূনীর দ্বারে উপস্থিত হই। এবার তাঁর আরেক সৃষ্টি ‘কাবাসূম মিন নূরিল কুরআন’ আমাকে যারপরনাই মুগ্ধ করে। জালালাইন পড়াতে এই কিতাবটি আমাকে অন্ধের যষ্ঠীর মত সাহায্য করেছিলো। নতুন সূরা শুরু করতে গেলে এই কিতাবটি একবার না দেখলে মনে অতৃপ্তি থেকে যেতো। সাবূনীর এই দুটি কিতাবের ঋণ আমি কখনোই শোধ করতে পারবো না৷

 

শিক্ষা ও কর্মজীবন

১৯৩০ সালে সিরিয়ার হালাব শহরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন এই মনিষী। বাবার কাছে খুব অল্প বয়সেই কুরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন৷ হালাবের স্থানীয় মাদরাসায় আরবী ভাষা, ফারায়েজ, হাদীস, তাফসীর, ফিকাহ, প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। তাঁর মেধা ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে সিরিয়ার ধর্ম মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় স্কলারশিপে তাকে আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়৷ সেখান থেকে তিনি ১৯৫২ সালে ইসলামী আইনতত্বে স্নাতক শেষ করেন।

পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি হালাবের বিভিন্ন মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে সিরিয়ার শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে প্রেষণে কিং আব্দুল আযীয বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। পরে উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুরাস বিষয়ক গবেষক হিসেবে নিযুক্ত হন। প্রায় ৩০ বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এছাড়া রাবেতাতুল আলাম আল ইসলামী এর একজন উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। দাপ্তরিক কার্যাবলি থেকে বিরতি নিয়ে পরে একসময় কেবল লেখালেখি ও গবেষণায় নিজেকে লিপ্ত রেখেছিলেন।

শায়খ সাবূনী ইলমুত তাফসীরকে পৃথিবীর অনারব শিক্ষার্থীদের জন্য সুখপাঠ্য করে দিয়েছেন। দাওরা পড়েও যেখানে ছাত্ররা আরবী তাফসীর ছুঁতে সাহস করতো না, সেই ছাত্রদেরকেই তিনি নাহু সরফ পড়াকালীন তবারী, কাশশাফ, ইবনে কাসীর, রুহুল মা’আনীর অথৈ সমুদ্র তীরে ঘুরে আসার রসদ দিয়ে গেছেন। তিন খণ্ডের ছোট্ট আয়োজনে দেড় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ তাফসিরগুলোর রূপরস মধু তিনি আহরণ করেছেন।

তাফসীর নিয়ে তাঁর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন সংক্ষেপে সারা সম্ভব না। ইলমুত তাফসীরের প্রায় প্রতিটি শাখায় তিনি কাজ করেছেন। কুরআনের শরঈ হুকুম আহকাম ও ফিকহী বিষয়ের উপর লিখেছেন ‘রাওয়াইউল বয়ান তাফসিরু আয়াতিল আহকাম’।

শানে নুযূল, কাসাস ও সূরাসমূহের সারসংক্ষেপ বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন ‘কবাসুম নিন নূরিল কুর’আন’। ঈজায ও বালাগাত বিষয়ে লিখেছেন ‘ঈজাযুল বয়ান ফি সুওয়ারিল কুর’আন’। উলুমুল কুরআন বিষয়ে লিখেছে ‘আত তিবয়ান ফি উলূমিল কুরআন’। এছাড়াও তাফসীর ইবনে কাসীর ও তাফসীরে তবারীর মতো বিশাল ভান্ডারের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ তিনি তৈরি করেছেন।

 

বিতর্ক

শায়েখ সাবূনী আরব বসন্তের বিপ্লবী দলগুলোর খুব পক্ষপাতী করতেন এবং আরব শাসকদের কঠোর সমালোচনা করতেন। বেশ কয়েকটি টেলিভিশন সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, “যে শাসক তার লোকদের উপর জবরদস্তি করেন এবং ধর্ম থেকে বিচ্যুতি ঘটান তিনি অবশ্যই অপরাধী এবং তাকে অবশ্যই প্রতিহত করা উচিত।”

তিনি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশশার আল আসাদকে নব্য মুসায়লামাতুল কাজ্জাব ঘোষণা করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। বাশশারের সাথে সুসম্পর্ক থাকার দরুণ প্রখ্যাত আলেম ও গবেষক ড. সাইদ রমাদান আল বুতীকে তিনি মুনাফিক ও গণহত্যাকারী বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।

শায়খ আব্দুল আযীয বিন বাযসহ সৌদীর অনেক মাশায়েখ সাবূনীর রচনাবলীর নিন্দা করেছেন। বিশেষ করে সাফওয়াতুত তাফাসীরে বিভিন্ন আয়াতের আকিদা সংক্রান্ত ব্যাখ্যা তাদের পছন্দ হয়নি। সেই ব্যাখ্যাগুলোকে একত্রিত করে বইও লেখা হয়েছে। পরবর্তীতে শায়খ সাবূনী সেগুলোর জবাব দিয়ে ‘কাশফুল ইফতিরা’আত ফি রিসালাতিত তানবিহাত হাওলা সফওতাতুত তাফাসীর’ নামে একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন। সাবূনী চার মাজহাবের কোন একটিকে মেনে চলা ওয়াজিব মনে করতেন এবং এটা তাঁর রচনায়ও উল্লেখ করেছেন। একারণে তিনি আব্দুল আযীয বিন বায ও অন্যান্য সালাফী আলেমদের সমালোচনার শিকার হন।

একটি কর্মচঞ্চল আদর্শ জীবনের নজীর রেখে শায়খ সাবূনী ৯১ বছর বয়সে গতকাল (শুক্রবার) সন্ধ্যায় তুরস্কের য়ালোভা শহরে ইন্তিকাল করেছেন। তাফসীর জগতের এই উজ্জ্বল জ্যোতিস্কের স্থলাভিষিক্ত আর কেউ হতে পারবে কিনা জানি না ৷ হয়তো শূন্যই রয়ে যাবে তাঁর এই আসনটি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে জান্নাতের উঁচু স্থানটি দান করুন।

 

লেখকঃ জামিআ ইকরার সাবেক মুহাদ্দিস, আত তুরাস একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *