কোনো দেশেই ১৮’র নিচে ভ্যাকসিন নয়

কোনো দেশেই ১৮’র নিচে ভ্যাকসিন নয়

কোনো দেশেই ১৮’র নিচে ভ্যাকসিন নয়

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দগুলোর একটি ‘ভ্যাকসিন’। বলা চলে, গোটা বিশ্ব উন্মুখ হয়ে আছে এই ভ্যাকসিনের জন্য। ইতোমধ্যেই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্ব শেষ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুমোদন সাপেক্ষে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুরো বিশ্বেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের মতো ফ্রন্টলাইনারদের। একইসঙ্গে যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি তাদেরকেও ভ্যাকসিন দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্বের কোথাও এখন পর্যন্ত ১৮ বছরের কম বয়সীদের ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্বে সংক্রমণ ঝুঁকি কম থাকায় ১৮ বছরের কম বয়সী ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও গুরুতর রোগে আক্রান্তদের ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না।

সম্প্রতি বাংলাদেশেও জনগণের জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। দেশের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, মুক্তিযোদ্ধাসহ ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষদের অগ্রাধিকার দিয়ে করা হয়েছে ভ্যাকসিন বিতরণের খসড়া পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, অনুমোদন সাপেক্ষে শেষ পর্যায়ে ১৮ বছরের কম বয়সী ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের টিকা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন না পেলে প্রাথমিকভাবে ১৮ বছরের কম বয়সীদের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিশ্বে এই মুহূর্তে ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আছে তাদের কারোর-ই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে ১৮ বছর বয়সের নিচে কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বিভিন্ন গুরুতর রোগে আক্রান্তদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। যেহেতু করোনার ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ নতুন একটি টিকা তাই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এই জনগোষ্ঠীকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আওতায় আনা হয়নি। এছাড়া শিশুদের মাঝে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কম হওয়ার কারণেও তাদের ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করেনি কোনো প্রতিষ্ঠান। ২ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ফাইজারের ভ্যাকসিন ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। এই ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রথম পর্বে ১২ বছর বেশি বয়সীদের অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি থাকলেও তারা এটি করেনি।

একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মডার্নাও তাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্বে ১৮ বছরের কম বয়সীদের অন্তর্ভুক্ত করেনি। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রতিষ্ঠান দুটি পাঁচ থেকে ১২ বছর বয়সীদের অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এই পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি অঙ্গরাজ্যে তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবকদের অন্তর্ভুক্ত করতে যাচ্ছে। একইসঙ্গে যুক্তরাজ্যের অ্যাস্ট্রেজেনেকা ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের প্রথম পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পাঁচ থেকে ১২ বছর বয়সীদের অন্তর্ভুক্ত করা না হলেও দ্বিতীয় পর্যায়ে এই বয়সসীমার মধ্যে থাকাদের ট্রায়ালে নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্বের ফলাফল ছাড়া কোনো ভ্যাক্সিন প্রয়োগ হয়ে উঠতে পারে আত্মঘাতী। আর তাই এখন পর্যন্ত যেসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে ফ্রন্টলাইনার ও ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা বয়সসীমার জনসংখ্যাকে। তবে বিশ্বের কোনো দেশেই আপাতত ১৮ বছরের নিচে কাউকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে না। তবে ১৮ বছর বয়সীদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) অনুমোদন দেয় তবে হয়তো এই বয়সসীমার জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটির অন্যতম সদস্য এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) কার্যকরী সদস্য ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন প্রয়োগের জন্য যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে ১৮ বছরের কম বয়সীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের উপরেও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়নি। এক্ষেত্রে একটি বিষয় হলো- ভ্যাকসিন বিতরণের খসড়া পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যারা আগে পাবেন পর্যায়ক্রমে সেগুলো শেষ করতেও কিন্তু একটা সময় লাগবে। যত বেশি জনসংখ্যা ভ্যাকসিনের আওতায় আসবে তত বেশি সংখ্যকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘১৮ বছরের কম বয়সী যারা তাদের নিয়ে আলাদাভাবে ভাবার কিছু নেই। এক্ষেত্রে যখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হবে তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যদি অনুমোদন দেয় তবে বাংলাদেশেও নিশ্চয় এ বিষয়ে ভাবা হবে। আপাতত তাই এই বয়সীমায় যারা আছেন তারাসহ অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ রোগে আক্রান্তদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপদে থাকতে হবে।’

এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও ১৮ বছরের কম বয়সী, গর্ভবতী মা ও অন্য কোনো গুরুতর রোগ আছে এমন ব্যক্তিকে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, এই জনগোষ্ঠীর মাঝে এখন পর্যন্ত কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও হয়নি। আমাদের দেশে করোনা ভ্যাকসিন বিতরণ করা হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী। তাদের নির্দেশনা ছাড়া কিন্তু এখানে কিছু করা যাবে না। সেই হিসেবেই কিন্তু বাংলাদেশে ভ্যাকসিন বিতরণের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *