খ্যাতিমান মুহাদ্দিস আল্লামা আবুল হাসান যশোরী রহ.
( জন্ম – ১৯১৮, মৃত্যু- ১৮ জুলাই -১৯৯৩)
আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: শায়খুল হাদীস আল্লামা আবুল হাসান যশোরী রহ, একজন খ্যাতিমান মুহাদ্দিস, মর্দে মুজাহিদ আলেম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে দক্ষিনবঙ্গের পদ্মার এপারের মানুষগুলো আবুল হাসান যশোরীকে যশোরের মুহাদ্দিস হিসেবে জানত। বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামের নিকট তিনি একজন তুখোড় মেধাবী আলেম এবং বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল।
যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, বরিশাল বৃহত্তর জেলাগুলোর সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাঁর ছিল ব্যাপক পরিচিতি। এক নামে যশোরের মুহাদ্দিস সাহেব হিসেবে সবাই জানত। এসব অঞ্চলের ধর্মীয় এবং ইসলামী রাজনীতির মধ্যমণি ছিলেন হযরত যশোরী রহ,। বড় বড় প্রোগ্রামের প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করতেন তিনি। সেই ছোট বেলায় আমি যখন লেখাপড়া শুরু করেছি, সেসময়ে পোষ্টার গুলোতে বাংলাদেশের শীর্ষ আলেমদের মাঝে তাঁর নাম দেখতে পেতাম। রাজধানী ঢাকায় যখন গেলাম।সেই নব্বই সালের কথা। তখন যশোরী রহঃ কে দেখলাম, বেফাকের সন্মেলনে সভাপতির আসন গ্রহণ করতে।
আমাদের এই বাংলাদেশ এবং ভারত, মোটকথা এই উপমহাদেশের শীর্ষ একজন আলেম এবং বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব মাওলানা আবুল হাসান যশোরী রহ.।
সেই ১৯৫০ সনের দিকের কথা, যখন পদ্মার এপারে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ছিলনা। জাহালাত – মুর্খতায় ভরে গিয়েছিল।বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষা,কোরআন – ইলমে হাদীসের চর্চার তেমন কোন ইদারা গড়ে ওঠেনি, ঠিক সেই সময়ে যশোরের বুকে ( যশোর রেল ষ্টেশনের পাশে) এক বিশাল দ্বীনি মাদ্রাসা গড়ে তোলেন। এঅঞ্চলের মানুষকে সঠিক দ্বীনি জ্ঞান, দ্বীনের আলো ছড়াতে থাকেন। প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত তিনি একটানা বুখারী শরীফের দরস দিয়েছিলেন। পাশাপাশি দাওয়াত ও তবলীগের কাজ, আত্মশুদ্ধির মেহনত, সেই সাথে বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতেন। একজন রাজপথের অন্যতম সিপাহসালার ছিলেন।
যশোরী সাহেব রহ. ছিলেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক,কতুবে আলম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.-এর অন্যতম এক শাগরেদ। উস্তাদ মাদানীর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালিত করতেন। হযরত মাদানী রহ.-এর সঙ্গে নেছবাত ছিল। যতদিন মাদানী রহ, জীবিত ছিলেন, ততদিন তাঁর পরামর্শে নিজেকে চালিয়েছেন। কিঞ্চিত পরিমাণ এদিক- ওদিক হয়নি।
হযরত মাদানী রহ, যেমন ছিলেন মর্দে মুজাহিদ আলেম, খ্যাতিমান মুহাদ্দিস, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রায় তিন যুগের অধিক সময়ের শায়খুল হাদীস। আবার আত্মশুদ্ধির ময়দানের এক মহান ব্যক্তিত্ব। ফকীহুন নফস রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহীর আজাল্লে দরজার খলিফা।
আমাদের যশোরের মুহাদ্দিস সাহেব রহ, হুবহু উস্তাদের নকশে কদমে চলেছিলেন। যুগ যুগ ধরে হাদীসের অধ্যাপনা, খানকাতে মুরীদানদের রিয়াযাত- মুজাহার কাজ, আবার বাতিলের আতঙ্ক ছিলেন তিনি। যশোর খুলনা অঞ্চলে ইলমে হাদীসের চেরাগ তাঁর হাতেই প্রজ্বলিত হয়েছিল। অন্ধকারাচ্ছন্ন যশোর – খুলনা- ফরিদপুর- কুষ্টিয়ায় তিনি আলোকিত করেছিলেন উলুমে নববী শিক্ষাদানের মাধ্যমে।
প্রথম যশোরী হুজুর রহ, কে দেখছিলাম জামেয়া কাসেমীতে পড়াকালিন সময়ে। যশোর শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্হিত মাদ্রাসাটি। একবার মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে তিনি উপস্হিত হয়েছিলেন। সম্ভবত সেটা ১৯৮৮ সনের কথা। বয়সে ভারী ছিলেন। পুরো বার্ধেক্যে। একজন ছাত্রের কাঁধে ভর করে রিকসা থেকে নামলেন। ছাত্ররা অতি ইজ্জতের সাথে তাঁকে মাদ্রাসার দফতরে বসালেন।
যশোরী হুজুর রহ, তখন বার্ধক্যের কারণে বয়ান করতে পারতেন না। মাহফিলে গিয়ে শুধু দুআ পরিচালনা করতেন। তাঁর সেই শব্দগুলো, তাঁর হৃদয় নিংড়ানো কথাগুলো, মহান রবের কাছে তাঁর ফরিয়াদ ছিল হৃদয়ছোঁয়া। উপস্হিত স্রোতাদের অন্তর বিগলিত হত। কান্নার আওয়াজে ময়দান প্রকম্পিত দেখা যেত।
একজন প্রবীণ আলেমেদ্বীন মাওলানা আব্দুল হক আব্বাসী রহ, যিনি হযরত যশোরীর যৌবনকাল দেখেছেন, তিনি বলতেন, যশোরী হুজুরের মুনাজাতটা ছিল এক বে-মেছাল। মহান আল্লাহর কাছে যেভাবে রোনাজারীর মাধ্যমে যে সব শব্দগুলো ব্যবহার করতেন, তা খুব কম লোকের মুখ থেকে বেরিয়েছে। মহান প্রভুর সাথে তাঁর নিবিড় সস্পর্কের কারণে তিনি অনেক উচ্চতায় পৌছে ছিলেন। যার কর্ম তৎপরতা, রিয়াযাত- মুজাহাদায় তিনি সৌরভ ছড়িয়েছিলেন দেশ থেকে দেশান্তরে।
এই প্রতিভাবান আলেম এবং বুজুর্গের অবদান আজ দেশ জুড়ে। বিশেষ করে যশোর শহরের বুকে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান জামেয়া এ’জাজিয়া। হাজার হাজার আলেমের উস্তাদ তিনি। তাঁর হাতে গড়া হাজারো ছাত্র। যে সব ছাত্ররা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ- বিদেশে। তারা ইলমের খেদমতের আন্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন জায়গায় শত শত প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে। সবই যশোরী হুজুরের অবদান।
মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ, এর জীবদ্দশায় গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার শায়খুল হাদীস ছিলেন প্রায় এক যুগ। সেই অজপাঁড়াগায়, আবার ফরিদপুরী রহ, এর মত একজন প্রতাপশালী আলেমের প্রতিষ্ঠানের প্রধান মুহাদ্দিস এবং প্রধান মুফতীর দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তি তিনি। এতেই বোঝা যায়, হযরত যশোরী কত উঁচু মানের আলেম ছিলেন।
১৯৯৩ সনে আমরা তখন ঢাকা মালিবাগ মাদ্রাসার ছাত্র। খবর পেলাম যশোরী হুজুরের ইন্তেকাল হয়ে গেছে। সারাদেশের আলেম সমাজ ব্যথিত হলেন। যেন স্বজন হারা বেদনা শুরু হল। মালিবাগ মাদ্রাসার পাশে যশোরী হুজুর রহ, এর এক ভক্ত থাকতেন। জনাব তবিবর রহমান সাহেব। হযরতের বিয়োগে একদম মুষড়ে পড়েন। একজন সাধারণ মানুষ তিনি। সরকারী একজন কর্মকর্তা ছিলেন। কিন্তু যশোরী হুজুরের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা।
জন্ম ও শৈশব
মাওলানা আবুল হাসান যশোরী রহ, ১৯১৮ সনে বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ড থানার ভবানীপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।
পিতার নাম জোনাব আলী শেখ। যশোরী হুজুরের পিতা একজন মুত্তাকী- ধর্মভীরু এবং মর্দে মুজাহিদ ব্যক্তি ছিলেন। ভবানীপুর এলাকাটি ছিল হিন্দু প্রভাবশালী এলাকা। হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের প্রায় সময় বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়াদী নিয়ে বাক- বিতন্ডা হত। হিন্দুদের প্রভাবে ইসলামী কৃষ্টি- কালচার, সভ্যতা – সংস্কৃতি আন্জাম দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাঁধার সম্মুখিন হতেন। তবুও যশোরী হুজুরের পিতা হিন্দুদের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে দ্বীন ইসলামের প্রতিটি কাজ যথাযথ ভাবে পালন করতেন।
সে সময়ে ভাবানীপুর গ্রামে কোন মসজিদ ছিল না। কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত ঝাউদিয়া গ্রাম, যেটা ৭/৮ মাইল দুরে, সেখানে নিজ এলাকার মুসলমানদের সাথে নিয়ে জুমার নামাজ আদায় করতেন। তাঁর দ্বীন ইসলামের প্রতি ভালবাসা এবং দ্বীনি খেদমতের কারণে এলাকার সুপরিচিত ব্যক্তি ছিলেন।
শিক্ষা
প্রাথমিক শিক্ষা ভবানীপুর প্রাইমারী স্কুলে। এরপর ভর্তি হন বাড়ি থেকে চারমাইল দুরে ঘোষবিলা হাইস্কুলে।
আবুল হাসান যশোরী সাহেব স্কুলে ভর্তি হলেও তিনি ছোটবেলা থেকে নামাজের পাবন্দী। কোন একটা সময় তাঁর নামাজ কাযা হয়নি। স্কুলে পড়ার পাশাপাশি তিনি সব সময় জামাতে নামাজ আদায় করতেন। এবং ধর্মীয় রীতি – নীতি মেনে চলতেন।
স্কুলের গন্ডি পার হয়ে ভর্তি হন মাগুরা কলেজে। অত্যান্ত মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। সবসময় পরীক্ষায় বেশী নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হতেন। তিনি এস এস সি পরীক্ষায় তিনটি লেটার সহ প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। আবার কলেজে গিয়েও তিনি পুরো কলেজের মধ্যে অন্যতম মেধাবী ছাত্র ছিলেন।
যশোরী সাহেব স্কুল কলেজে যেখানেই পড়েছেন, তবে তিনি নামাজ কাযা করেন নি। এবং গোনাহর কাজ থেকে বেঁচে থাকতেন। তাঁর কলেজ জীবনের এক চমকপ্রদ ঘটনা রয়েছে। একবার তাঁর বন্ধুরা সিনেমা দেখানোর জন্য হলের নিকটবর্তী নিয়ে গিয়েছিল। তারা হুজুরের অগোচরে টিকিট ক্রয় করে। টিকেট কেনার পরে তারা বলল, আবুল হাসান! আজ তোমাকে আমাদের সাথে সিনেমা দেখতে হবে। কিন্তু তিনি বন্ধুদের হাত ঝাড়া দিয়ে জোরে দৌড় দিয়ে চলে আসেন। তাঁকে বন্ধুরা খুঁজে পায়নি।
হযরত যশোরী কলেজের লেখাপড়ার সাথে তিনি ইসলামী বই- পুন্তক পড়া শুরু করেন। তাঁর মধ্যে দিনে দিনে ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত হতে থাকে। দ্বীন ইসলামের প্রতি, দ্বীনি শিক্ষার প্রতি তাঁর ভালবাসা পয়দা হতে থাকে। কলেজে পড়লেও তাঁর মনছুটে চলল মাদ্রাসায় ইলম শেখার ব্যাপারে। শেষমেষ তিনি মাদ্রাসায় পড়া- লেখা করার জন্য কলেজের পড়া বন্ধ করে দিয়ে ছুটে চললেন।
দ্বীনি ইলম শিক্ষা লাভের জন্য দিল্লি গমনঃ কলেজ থেকে বের হয়ে নিজের ভগ্নিপতির সহায়তায় তিনি ভারতের দিল্লিতে রওয়ানা হন। সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁকে অনেক মুজাহাদা- কোরবানী করতে হয়। ভাষাগত সমস্যা। আরেকটা বিষয় হল, তিনি জীবনে কোনদিন মাদ্রাসায় পড়েন নি। যার কারনে তাঁর অনেক বেগ পেতে হয়। তবে তিনি ছিলেন কঠিন অধ্যাবসায়ের মানুষ। মেহনত শুরু করে দিলেন। একজন উস্তাদের কাছে বিশেষ ভাবে পড়ে তিনি অনেক এগিয়ে গেলেন।
এরপর তিনি ভর্তি হন, দিল্লি ফতেপুর মাদ্রাসায়। একটানা ছয়বছর সেখানে লেখাপড়া করেন।
প্রতি শ্রেণীতে সব সময় প্রথম স্হান অধিকার করেছেন। তাঁর লেখাপড়ায় সকল উস্তাদের বিশেষ দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন।
তিনি নিখিল বাংলা ছাত্র সংগঠনের সেক্রেটারী এরপর সভাপতি নির্বাচিত হন।
দিল্লিতে পড়াকালিন সময়ে তাঁর এক আজব ঘটনা রয়েছে, যার কারনে সবাই তাঁকে অনেক সমীহ করে চলত। একবার দিল্লি শহরে এক বিতর্ক অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে ইংরেজীতে বক্তব্য দিতে হবে। সেখানকার বিচারক ছিলেন একজন জজ। ছাত্ররা যশোরী হুজুর কে অনুরোধ করে সেখানে নিয়ে যায়। এরপর অনুষ্ঠান শুরু হলে তিনি যখন ইংরেজীতে বক্তব্য দিলেন, পুরো অনুষ্ঠানে পিনপতন নিরবতা চলে আসল। তাক লেগে গেল। যশোরী সাহেব বিজয়ী হলেন। অনুষ্ঠানের বিচারক জজ সাহেব বললেন, আমি কোন বাঙালীর কাছ থেকে এত সুন্দর ইংরেজী আর শুনিনি।
দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তিঃ ১৯৪৩ সনে যশোরী সাহেব দিল্লি ফতেহপুর মাদ্রাসা থেকে দেওবন্দে চলে যান। সেখানে গিয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশুরু করেন।বড় স্বপ্ন ছিল দেওবন্দে পড়বেন। সেটা যেন কবুল হল। দেওবন্দে গিয়ে অনেক সুনামের সাথে লেখাপড়া করেছেন। সেখানেও মেধার পরিচয় দেন।
১৯৪৮ সনে তিনি দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। তাঁর প্রিয় উস্তাদ সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, এর কাছে তিনি বুখারী শরীফ পড়েন।
যশোরী সাহেব রহ, এর উস্তাদ বৃন্দঃ সাইয়্যদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, , শায়খুল আদব এ’জাজ আলী রহ,, আকাবীরে আমিন ইব্রাহিম বলিয়াবী রহ,, মুফতীয়ে আজম পাকিস্তান আল্লামা শফী রহ,,,আল্লামা ক্বারী হিফজুর রহমান রহ,, হযরতুল আল্লাম ফখরুল হাসান সাহেব রহ,, হযরত মাওলানা মিয়া আছগার হোসাইন সাহেব রহ, হযরত মাওলানা ক্বারী তৈয়ব সাহেব রহ,, হযরত মাওলানা আব্দুল হক হক্কানী সাহেব রহ.।
কর্ম জীবন
দেওবন্দে লেখাপড়া যখন শেষ করেন, তখন দেওবন্দের শায়খুল আদব শায়েখ এ’জাজ আলী রহ, এর কাছে দুটি চিঠি যায়। একটা চিঠি বার্মা থেকে, আরেকটা চিঠি গওহরডাঙ্গা আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ, এর পক্ষ থেকে। সেখানে চিঠিতে লেখাছিল। আমাদের মাদ্রাসাতে শায়খুল হাদীস প্রয়োজন।ভাল যোগ্যতা সম্পন্ন আলেম চাই।
হযরত যশোরীকে তাঁর উস্তাদ বললেন, তোমার কি ইচ্ছা, কোথায় যেতে চাও। উল্লেখ্য যে, বার্মার বেতন হবে ২৫০ টাকা। আর গওহরডাঙ্গার বেতন মাত্র ৫০ টাকা।
যশোরী সাহেব তাঁর উস্তাদকে বললেন, আমার নিজের কোন ইচ্ছা নেই। উস্তাদগণ যেখানে পরামর্শ করে পাঠাবেন,সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
এ’জাজ আলী রহ, তাকে সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, এর কাছে পরামর্শ নেওয়ার জন্য পাঠালেন। হযরত চিঠি দুটো পড়ে তিনি যশোরী সাহেবকে গওহরডাঙ্গা যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। বললেন, গওহরডাঙ্গাতে শামসুল হক ফরিদপুরী আছেন।আর বুখারী শরীফের দরস দিতে পারবে। ইলমে হাদীসের তরক্কী হবে।
উস্তাদদের পরামর্শ ক্রমে যশোরী রহ, গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসায় শায়খুল হাদীস এবং প্রধান মুফতী পদে যোগদান করেন। দীর্ঘ ১১ বছর গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার শায়খুল হাদীস ছিলেন আবুল হাসান যশোরী সাহেব।
গওহরডাঙ্গা থেকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল তাঁর সুনাম। যশোরী সাহেব ছাত্রদের পড়ানো আর কিতাব মুতালায়ায় মগ্ন থাকতেন। ইলমপিপাসু ছাত্রদের তৃষ্ঞা নিবারণ করতেন। দিনে দিনে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিক।
গওহরডাঙ্গা থেকে যশোরে আগমন
১৯৫০ সনে যশোর রেলষ্টেশন এর পাশে হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা হাবীবুর রহমান রহ, এর সাহেবজাদা মাওলানা ফারুক সাহেব মক্তব আকারে একটি কুরআনী মাদ্রাসার গোড়পত্তন করেন। তাতে সহযোগীতা করেন, স্হানীয় ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি আলতাফ হোসেন চৌধুরী সাহেব। কিন্তু স্হানীয় কিছু সমস্যার কারণে মাদ্রাসাটির কোন তরক্কি হচ্ছিলনা। বরং সেটা বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
১৯৫৯ সনে গওহরডাঙ্গা থেকে আবুল হাসান যশোরী সাহেব যশোর আগমন করেন। এবং আলতাফ হোসেন সাহেবের সাথে পরামর্শক্রমে মাদ্রাসার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
যশোরী সাহেব রহ,, মাদ্রাসাটির দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথে তিনি এটাকে দাওরায়ে হাদীসে উন্নীত করেন। মাত্র একবছরের ব্যবধানে মাদ্রাসার বিশাল উন্নয়ন চোখে পড়ে সবার। টিম টিম করে জ্বলতে থাকা প্রতিষ্ঠান দাওরায়ে হাদীসের সর্বোচ্চ চুড়ায় নিয়ে যান তিনি। প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন, প্রিয় উস্তাদ এ’জাজ আলী রহ, এর নামের সাথে মিলিয়ে। জামেয়া এ’জাজিয়া দারুল উলুম রেল ষ্টেশন, যশোর।
বায়আত ও খিলাফত লাভ
আবুল হাসান যশোরী সাহেব রহ, দেওবন্দ থেকে ফারেগ হওয়ার পর তিনি প্রিয় উস্তাদ সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, এর কাছে বায়আত হন। এবং তাঁর প্রদত্ত সবক আদায় করতে থাকেন। তিনি দেশে ফিরে আসলে হযরত মাদানী এর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা কষ্টকর ছিল। চিঠি ঠিকমত পৌছাত না। তাই একদিন হুসাইন আহমাদ মাদানী যশোরী হুজুরকে পত্র লিখলেন, আবুল হাসান! যেহেতু নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে তোমার কষ্ট হচ্ছে, তুমি চট্রগ্রাম -পটিয়ার মুফতি আজিজুল হক রহ, এর কাছে চলে যাও,সেখানে গিয়ে বায়আত হও।
হযরত মাদানীর নির্দেশে তিনি পটিয়ার মুফতী আজীজুল হক সাহেবের কাছে চলে যান। সেখানে পুরো রমজান মাস ইতিকাফ করেন। এভাবে পরবর্তী রমজানেও ইতিকাফ করার পর তিনি মুফতী আজিজুল হক সাহেবের কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেন।
যশোরী হুজুরের উল্লেখযোগ্য খলিফা
১/ মাওলানা আব্দুর রউফ সাহেব, মোহতামিম, মাদ্রাসায়ে হযরত আলী রাঃ, কালীগন্জ,ঝিনাইদহ।
২/ মাওলানা আব্দুল হাকীম রহ, মুহাদ্দেস গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা,
৩/ মাওলানা খলিলুর রহমান রহ, ছোটফার হুজুর।
৪/ মাওলানা হাবীবুর রহমান রহ, মুহাদ্দেস রেল ষ্টেশন মাদ্রাসা।
রাজনৈতিক জীবন
প্রিয় উস্তাদ সাইয়্যেদ হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, কে অনুসরণ করে চলতেন তিনি। উস্তাদের সংগঠন জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের সক্রিয় কর্মি ছিলেন। বাংলাদেশ হওয়ার পরে জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এর নেতা ছিলেন।
হাফেজ্জী হুজুর আন্দোলনের ডাক দিলে তিনি শরীক হন। খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি।
বাতিলের মোকাবেলায় তিনি সর্বাগ্রে থাকতেন। দেশ ও আন্তর্জাতিক ভাবে যখন যে সমস্যা দেখা দিয়েছে,তিনি অগ্রণী ভুমিকা রেখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন আল্লামা যশোরী
১৯৭১ সনে এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর বড় অবদান রয়েছে। যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ছিল তাঁর মাদ্রাসায়। তিনি পাকিস্তানীদের নির্মম- জুলুম নির্যাতনের কথা মানুষের সামনে তুলে ধরতেন। মানুষকে পাকি- সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতেন।
বড় নির্মম নির্যাতন করেছিল পাকিস্তানী সৈন্যারা তাঁর উপরে। তাঁকে এবং তাঁর মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্রাশফায়ার করেছিল পাকিস্তানী সৈন্যরা। ২২জন আলেম এবং মাদ্রাসার ছাত্র তাতে শহীদ হয়েছিল। যশোরী সাহেব আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে বেঁচে গিয়েছিলেন। সেই শহীদদের কবর এখনো মাদ্রাসার আঙিনায় বিদ্যমান। দেশ বাঁচাতে তাঁর অবদান চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে।
ইন্তেকাল
১৯৯৩ সনের ১৮ জুলাই তিনি মহান রবের সান্নিধ্যে চলে যান। তাঁর মৃত্যুতে পুরোদেশের আলেম সমাজ স্তিমিত হয়ে পড়ে।শোকে কাতর হয় তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
একজন হক্কানী আলেম, আত্মশুদ্ধির মহান সাধক, আবার তিনি ছিলেন মর্দে মুজাহিদ। পুরোজীবনটা কেটেছে তাঁর দ্বীনি খেদমতে। বিরাম- বিশ্রামহীন ভাবে তিনি ছুটে চলেছিলেন। তাঁর জন্য মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। আমিন।
লেখক : কলামিস্ট


