সাহাবীগণের সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরামর্শ বৈঠক
এই স্বপ্ন ছিল জুমুআ-পূর্ব রাত্রির। পরদিন সকালে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীগণের সঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য পরামর্শ বসলেন। তিনি গতরাতের স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে বললেন, আমার মনে হয় তোমরা মদিনায় অবস্থান করেই দুশমনদের মোকাবিলা করো। নারী ও শিশুদের আমরা ‘আতাম’ (বেষ্টনী আবৃত উঁচু ঘর, কেল্লা)-গুলোতে রেখে দিব। তারা নিরাপদ থাকবে।
দুশমনরা যদি বাইরে অবস্থান করে তবেও তা তাদের জন্য ভাল হবে না। আর যদি ভেতরে ঢুকে পড়ে, আমরা অলিতে-গলিতে এদের বিরুদ্ধে লড়ব। আমাদের রাস্তাগুলো আমরা ভাল চিনি। দুর্গ এবং আস্তানাগুলোর উপর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীরের সম্মুখীন হবে এরা। মদিনার চতুর্দিকে ঘরবাড়ি রয়েছে চন্দ্রবলয়ের মতো। সুতরাং এটি সুদৃঢ় একটি কেল্লার ন্যায় রক্ষা করবে সকলকে।
অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রবীণ সাহাবীগণ তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ দিলেন, মদিনায় থেকে দুশমনদের প্রতিরোধ করা হোক। সাধারণত দেখা যায় মদিনার ভেতরে এসে যুদ্ধ করলে শত্রুরা কখনও জয়লাভ করতে পারে না। কিন্তু তরুণগণ এবং যারা বদরে শরীক হতে পারেননি, শাহাদতের স্বপ্নে ছিলেন বিভোর, তাঁরা আবেগ-উচ্ছ্বাসে নিবেদন করলেন, আমরা মদিনার বাইরে গিয়ে এদের প্রতিরোধ করব। আমরা শহীদ হওয়ার এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চাই না।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনার বিষয়ে অভিজ্ঞ মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এরও পরামর্শ নিলেন। সে বলল, মদিনায় অবস্থান করেই দুশমনদের মোকাবিলা করুন। আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা হল, সাধারণত যখনই আমরা বাইরে গিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেছি, বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছি। আর দুশমনরা যখনই মদিনার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যুদ্ধ করেছে, তারা পরাজিত হয়েছে। সুতরাং এরা যদি ভেতরে প্রবেশ করে তবে পুরুষরা তাদের সশস্ত্র মোকাবিলা করবে, বালক কিশোররা তাদের ঘরের ছাদ থেকে পাথর ছুড়ে মোকাবিলা করবে। এরা যেভাবে আসবে সেভাবেই লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হবে।
হযরত হামযা, সা’দ ইবন ‘উবাদা, নু’মান ইবন মালিক প্রমুখ সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, এতে দুশমনরা ভাববে আমরা বুঝি ভয়ে কাতর হয়ে গেছি। পরবর্তীতে এই বিষয়টি তাদের ধৃষ্টতা প্রদর্শনের কারণ হতে পারে। এরা দুঃসাহসী হয়ে যেতে পারে। বদরে তো আমরা তিনশো-এর মতো ছিলাম। আল্লাহ পাক আপনাকে এদের উপর জয়ী করেছেন। বর্তমানে আমরা তো অনেক। এই দিনটিরই আশায় ছিলাম আমরা। আল্লাহর কাছে এই দিনের প্রার্থনা জানাচ্ছিলাম। আজ আল্লাহ পাক এদেরকে আমাদের আঙিনায় পৌঁছে দিয়েছেন।
হযরত নু’মান ইবন মালিক বিনয়ের সঙ্গে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, জান্নাত থেকে আমাদের মাহরুম করবেন না। যার হাতে আমার প্রাণ সেই মহান সত্তার কসম! আমি অবশ্যই জান্নাতে যাব।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে কীভাবে? হযরত নু’মান বললেন, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি (বর্ণনান্তরে) আমি সাক্ষ্য দেই আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মা’বূদ নাই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রাসূল। যুদ্ধের ময়দান থেকে আমি পলায়ন করি না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তুমি সত্য কথা বলেছো।’ পরবর্তীতে হযরত নু’মানের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং তিনি এতে শহীদ হয়েছিলেন।
এরপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমুয়ার সালাত আদায় করলেন। খুতবায় জিহাদে উদ্বুদ্ধ করলেন। ‘ধৈর্য ধরে যদি টিকে
থাকতে পারো তবে আল্লাহর সাহায্য আসবে।’ এতে যারা মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার জন্য পীড়াপীড়ি করছিলেন তারা খুবই খুশি হলেন।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসরের নামাযও আদায় করলেন। এর মধ্যে আওয়ালী এবং চতুর্পার্শ্ব থেকে বহু লোক এসে মসজিদে জড়ো হলেন। মহিলা ও শিশুদেরকে সুরক্ষিত উঁচু গড় (আতাম)-সমূহে পাঠিয়ে দেয়া হল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে গেলেন, সাথে হযরত আবূ বকর ও ‘উমর রা.ও ছিলেন। তাঁরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমর পোশাক পরিয়ে দিলেন, মাথায় পাগড়ি বেঁধে দিলেন।
অন্যান্য সাহাবীগণ মিহবর থেকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হুজরা পর্যন্ত কাতার বেঁধে তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। হযরত সা’দ ইবন মুআয এবং হযরত উসায়দ ইবন হুযায়ের রা. সমবেত সাহাবীগণের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা পীড়াপীড়ি করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মদিনার বাইরে যেয়ে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছো। অথচ সবাই জানে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ওহী নাযিল হয়। সুতরাং বিষয়টি তাঁর উপরেই সকলে ছেড়ে দাও। তিনি যেভা্বে বলবেন আমরা তা বাস্তবায়ন করব। তাঁরই আমরা আনুগত্য করব।
এর মধ্যে সমর পোশাক ও অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেরিয়ে এলেন। সমবেত সাহাবীগণ পীড়াপীড়ি করার জন্য অনুশোচিত ছিলেন। সকলেই বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনাকে খুবই পীড়াপীড়ি করেছি। এটা আমাদের উচিত হয়নি। আপনি যদি চান তবে এখানেই থেকেই দুশমনদের মোকাবিলা হতে পারে।
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি তো আগেই তোমাদেরকে বলেছিলাম কিন্তু তোমরা তা গ্রহণ করোনি। অস্ত্রসজ্জিত হওয়ার পর দুশমনদের সাথে ফায়সালা না করে অস্ত্র খুলে ফেলা নবীর জন্য শোভন নয়। আমি যে নির্দেশ দিচ্ছি তা লক্ষ্য করো এবং পালন করো। আল্লাহর নামে অগ্রসর হও, ধৈর্যধারণ করে দৃঢ়পদ থাকলে আল্লাহর সাহায্য তোমাদের জন্যই।
অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারিত স্থানে গিয়ে হযরত মালিক ইবন আমর আন নাজ্জারী রা. এর জানাযায় ইমামত করলেন। পরে তিনটি বর্শার মাথায় তিনটি পতাকা যুক্ত করলেন। কবীলা আওসের পতাকা দিলেন উসায়দ ইবন হুযায়ের রা. এর হাতে। কবীলা খাযরাজের পতাকা তুলে দিলেন হযরত সা’দ ইবন ‘উবাদা (বর্ণনান্তরে, হুবাব ইবনুল মুনযির রা.)-এর হাতে, আর মুহাজিরীনের পতাকা দিলেন হযরত আলী রা. এর হাতে। হযরত উম্মি মাকতুমকে মদিনায় স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করলেন।
চলবে……


