আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দাঃবাঃ রচিত বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থ আল্লাহর পরে শ্রেষ্ঠ যিনি এর দ্বিতীয় খন্ড থেকে গযওয়া উহুদ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডকম পরিবার। তারই ধারাবাহিকতায় আজ ১ম পর্ব প্রকাশিত হল।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,
وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
এই দিনসমূহ আমি আবর্তিত করি মানুষের মাঝে।
আজ আমার তো কাল তোমার। এভাবেই চলে আসছে মানুষের জীবন। একই অবস্থায় কাটে না সবসময়। জয়পরাজয়, সুখদুঃখ, ভালমন্দ, নানা হালে অতিবাহিত হয় মানুষের দিনকাল। সব অবস্থায় ফেলে আল্লাহ যেন মুমিনকে যাচাই করে নিতে পারেন। খাঁটি সোনায় পরিণত হয় মানুষ। ইসলাম কিয়ামত পর্যন্ত সর্বকালের, সব বর্ণের, সব অঞ্চলের মানুষের জন্য আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ও জীবনব্যবস্থা। কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের অবস্থাও একই রকম যাবে না। জয়পরাজয়, ভালমন্দের সম্মুখীন হতে হবে তাদের। সুতরাং জয় যদি অক্ষুণ্ণ না থাকে, তবে কী করতে হবে সেটিরও একটা নমুনা থাকার দরকার ছিল।
বদর যুদ্ধে বন্দি মুশরিকদের ফিদয়ার বিনিময়ে মুক্তি দেওয়ার সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, ‘আগামীতে এই সত্তরজনের স্থানে তোমাদের সত্তরজনের শাহাদত স্বীকার করতে হবে।’
সাহাবীগণ এতদসত্ত্বেও বন্দিমুক্তির বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন। উহুদে যা ঘটেছে এটি ছিল একটা ‘তাকবীনি’ ফয়সালা, অর্থাৎ, আল্লাহর কুদরত-রহস্যের সাথে সম্পর্কিত। সাময়িক বিপর্যয়ে সাহাবীগণ আরো বলীয়ান, ঈমানী তেজে আরো তেজীয়ান হয়েছিলেন।
কুরাইশরা বিশেষ করে বদরের যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছিল তাদের আত্মীয়-স্বজনরা কিছুতেই এই পরাজয় মেনে নিতে পারছিল না। তারা দুঃখে, ক্ষোভে, শোকে ফুঁসছিল। আবু সুফিয়ানের কাফেলা মক্কায় নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের পর এর সম্পদ ও ব্যবসার লাভ শরীকদের মাঝে বণ্টন না করে বায়তুল্লাহ শরীফের দারুন নাদওয়ায় রেখে দিয়েছিল।
শেষে আবু সুফিয়ান, আবদুল্লাহ ইবন আবী রবীআ, ইকরিমা ইবন আবী জাহল, সফওয়ান ইবন উমাইয়া এবং অন্যান্য কুরাইশ নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নিল, এর পুঁজি মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হবে; আর বাদবাকি মুনাফা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিগণের বিরুদ্ধে নিহতদের প্রতিশোধ-যুদ্ধে ব্যয় করা হবে।
সকলেই একবাক্যে সিদ্ধান্তটি মেনে নিল। মুনাফার অংকটিও কম ছিল না। তা ছিল তৎকালীন মুদ্রায় পঞ্চাশ হাজার ‘দিনার’ বা স্বর্ণমুদ্রার বিপুল এক অংক। এতদপ্রেক্ষিতে কুরআন মাজীদে নাযিল হয়,
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ
আল্লাহর পথ হতে লোকদেরকে নিবৃত্ত করার জন্য কাফিরগণ তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে; অতঃপর সেটা তাদের মনোপীড়নের কারণ হবে, এরপর তারা পরাভূত হবে। আর যারা কুফরী করে তাদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে।
কুরাইশদের প্রস্তুতি
কুরাইশরা প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মত্ত হয়ে জোরেশোরে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে। চতুর্দিকে অবস্থিত কবীলাসমূহকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়। এই ‘আহাবীশ’ কবীলাগুলো কুরাইশদের প্রতিশ্রুতিতে প্রলুব্ধ হয়ে তাদের পাশে এসে জমায়েত হতে থাকে।
এদিকে আবু আমির আল ফাসিকের নেতৃত্বে মদীনার ইয়াহুদী মুনাফিকদের পঞ্চাশ জনের একটা দল গোপনে মক্কায় গিয়ে কুরাইশদেরকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আশ্বস্ত করে। তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে প্রস্তুত হয়। সাতশো ছিল বর্ম পরিহিত। তাছাড়া দু’শো ঘোড়া, তিন হাজার উট ছিল এই বাহিনীতে।
কুরাইশরা আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দাসহ পনেরোজন সম্ভ্রান্ত মহিলা সাথে নিয়েছিল। এরা যুদ্ধে অনুপ্রেরণা যোগাবে। সেই সাথে এদের সম্মান প্রতি খেয়াল করে পুরুষরা যেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায় এবং কেউ যেন পালানোর চিন্তাও না করে।
তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসের ৫ তারিখ এই উন্মত্ত বাহিনী মক্কা থেকে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে।
হযরত আব্বাস-এর গোপন পত্র
হযরত আব্বাস তখনও বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেননি। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসলিমগণের প্রতি খুবই সহানুভূতিপরায়ণ ছিলেন। তিনি কুরাইশ বাহিনীর এই যুদ্ধযাত্রার সংবাদ দিয়ে এক দূতের মাধ্যমে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে একটা পত্র প্রেরণ করেন। দূতকে তাগিদ করে দিলেন, যেভাবেই হোক তিন দিনের মধ্যে যেন সে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এই চিঠি পৌঁছে দেয়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রস্তুতি
উক্ত চিঠি হস্তগত হওয়ার পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আনাস এবং মুনিস নামক দুই সাহাবীকে কুরাইশ বাহিনীর খবরাখবরের জন্য প্রেরণ করেন। তাঁরা খোঁজখবর নিয়ে এসে জানালেন, কুরাইশ বাহিনী একেবারে মদীনার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ওদের উট-ঘোড়াগুলো ‘উরাইয’ অঞ্চলের ক্ষেতগুলো খেয়ে লোপাট করে ফেলেছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সৈন্যসংখ্যা ও শক্তির একটা আন্দাজ নেওয়ার জন্য হযরত হুবাব ইবন মুনযিরকে প্রেরণ করলেন। তিনি এসে সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে অবহিত করলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, এখনই অন্য কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।
আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তত্ত্বাবধায়ক। দু‘আ করলেন,
হে আল্লাহ, আপনার সাহায্যেই আমি বিজয়ী হই।
আপনার সাহায্যেই আমি বিজয়ী হই।
এইদিন পুরো রাত হযরত সা‘দ ইবন মু‘আয, উসাইদ ইবন হুদাইর রা. মসজিদে নববীর পাহারায় ছিলেন। আশেপাশেও পাহারা বসানো হল। এটি ছিল জুমুআর রাত।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বপ্ন
এই রাতেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বপ্ন দেখেন, তিনি সুদৃঢ় লৌহবর্ম পরে আছেন। সেখানে একটা গরু জবাই করা হচ্ছে।
হযরত ইবন আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, বদর যুদ্ধে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা তলোয়ার পেয়েছিলেন, সেটির নাম ছিল যুল ফকার। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি স্বপ্নে দেখি যুল ফকার তরবারিটি নাড়ালাম, এর অগ্রভাগে ভাঙন সৃষ্টি হল। এরপর আবার নাড়ালাম, তখন তা ঠিক হয়ে গেল।
নবীগণের স্বপ্ন ‘ওহী’ বলে গণ্য হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বুঝে ফেললেন, এই যুদ্ধে বিপর্যয়কর কিছু ঘটতে যাচ্ছে।
এক বর্ণনায় আছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম আমি একটা সুদৃঢ় এবং মজবুত বর্মের ভেতর আছি। এর অর্থ হল মদীনা। মদীনা আমার জন্য সুদৃঢ় বর্মের ন্যায়। আরো দেখি, আমি একটা মেষের উপর আরোহণ করাছি। এটির অর্থ হল এই বাহিনী ও এর সর্দারগণ। আরো দেখি, আমার ‘যুল ফকার’ নামক তরবারিটির অগ্রভাগে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। এর অর্থ হল, তোমাদের বাহিনী ভেঙে পড়বে।
চলবে………


