গযওয়া উহুদ । পর্ব-৩

গযওয়া উহুদ । পর্ব-৩

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উহুদযাত্রা

জুমুআর দিন, ১১ শাওয়াল, তৃতীয় হিজরীতে আসরের পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ‘সাকব’ নামক ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং মদীনা থেকে যাত্রা করেন। তাঁর ধনুক ছিল কাঁধে, বর্শা ছিল হাতে, শরীর ছিল জোড়া বর্মাচ্ছাদিত। এক হাজার সেনার এক বাহিনী ছিল সাথে। তাঁদের একশো জন ছিলেন বর্ম পরিহিত

হযরত সা‘দ ইবন মুআয ও হযরত সা‘দ ইবন ‘উবাদা দুই আনসারী সর্দার বর্ম পরে আগে আগে দ্রুত চলছিলেন। অন্যরা ডানেবামে ছড়িয়ে ছিলেন। শত্রুপক্ষ যেন গতিবিধি টের না পায় এজন্য প্রথমে দক্ষিণে, পরে বাগানের গাছপালার আড়ালে আড়ালে উত্তরে উহুদের দিকে অগ্রসর হলেন

ছানিয়্যা গিরিপথ মূলে পৌঁছে প্রচুর অস্ত্রসজ্জিত এক বাহিনী দেখতে পেলেন। এরা শোরগোল করছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এদের বিষয়ে জানতে চাইলে বলা হল, এরা আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের বন্ধু গোত্র ইয়াহূদীদের একটা দল। এরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে শরীক হতে চাচ্ছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এরা কি ইসলাম গ্রহণ করেছে? বলা হল, তা নয়। তিনি বললেন, মুশরিকদের বিরুদ্ধে আরেক মুশরিকের সাহায্যের প্রয়োজন নেই

সামনে অগ্রসর হয়ে মদীনার অদূরে ‘শায়খাইন’ নামক স্থানে পৌঁছে স্বীয় বাহিনী পর্যবেক্ষণ করলেন। যারা কমবয়সী ছিলেন তাঁদের ফেরত পাঠালেন। এরা ছিলেন সত্তর জন। চৌদ্দ বছরের কম বিধায় এবং বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়ায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে যুদ্ধে শরীক হওয়ার অনুমতি দেননি

এই কিশোর বালকদের মধ্যে যাদেরকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধে শরীক হওয়ার অনুমতি দেননি, তাঁদের অন্যতম ছিলেন হযরত সাইদ ইবন হাবতাহ। পরবর্তীতে তিনি খন্দক যুদ্ধে যোগদানের অনুমতি পেয়েছিলেন। সেদিন তিনি তাঁর বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন। তা দেখে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি তাঁকে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁর জন্য বরকতের দুআ করেছিলেন। এই দুআর ফসল হিসাবে তিনি চল্লিশজন ভাতিজার চাচা এবং বিশজন সন্তানের পিতা হয়েছিলেন। প্রখ্যাত ইমাম ও বাগদাদের কাযিউল কুযাত হযরত ইমাম আবূ ইউসুফ তাঁরই অধস্তন পুরুষ ছিলেন

শিশুকিশোরদের অপূর্ব উদ্দীপনা

হযরত রাফি‘ ইবন খাদীজ রা.ও এই কিশোরদের মধ্যে ছিলেন। তিনি তখন কৌশলে পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে নিজেকে উঁচু করে দেখালেন যাতে মাপে পড়ে যান। তাছাড়া তিনি ভাল তীরন্দাজ ছিলেন। তাঁর নিশানা খুব কমই ভুল হত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর আগ্রহ দেখে তাঁকে যুদ্ধে শরীক হওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন। তখন আরেক কিশোর হযরত সামুরা ইবন জুন্দুব রা. তাঁর সম্পর্কীয় পিতা (মায়ের অন্য বিবাহের স্বামী) মুরাই ইবন সিনানকে বললেন, হে পিতা, রাফি‘ ইবন খাদীজকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিয়েছেন, অথচ সে তো শক্তিতে আমার সঙ্গে পারবে না

মুরাই রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে রাসূল, রাফি‘কে সুযোগ দিলেন কিন্তু সে তো শক্তিতে সামুরার সঙ্গে পারবে না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কুস্তি লড়ো তো দেখি

উভয়ে কুস্তি হল। হযরত সামুরা কুস্তিতে রাফি‘কে পরাস্ত করে ফেললেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন তাঁকেও অনুমতি দিয়ে দিলেন

সকলকে নিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাগরিবের নামায আদায় করলেন এবং সেখানেই রাত্রিযাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন

‘ইশার নামাযের পর মুহাম্মদ ইবন মাসলামাকে প্রধান করে পঞ্চাশ জন সাহাবীর একটা দল পাহারার কাজে নিযুক্ত করা হল, আর হযরত যাকওয়ান ইবন আবদি কয়স রা. অস্ত্রসজ্জিত হয়ে স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাহারায় রইলেন। সেহরির সময় পর্যন্ত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শান্তিতে নিদ্রা গেলেন। ফজরের সালাত আদায় হল, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভিন্নপথ দিয়ে উহুদের দিকে অগ্রসর হলেন

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিস্ময়কর সহনশীলতা

মিরবা‘ ইবন কযয়ী-এর কূপের কাছে পৌঁছলেন। মিরবা‘ ছিল নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি খুবই বিদ্বেষপরায়ণ। সে ছিল অন্ধ। মুঠোভর্তি ধুলো নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সঙ্গী সাহাবীগণের মুখে নিক্ষেপ করছিল এবং চিৎকার করে বলছিল, এখানে আসার অনুমতি নেই। অন্য কারো আঘাত লাগতে পারে এই আশঙ্কা না থাকলে আমি তোমাকে হত্যা করতাম

সাহাবীগণ তার এই বিদ্বেষমূলক কথা ও আচরণে উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তাকে খতম করে দিতে চাইলেন, কিন্তু সহনশীলতার পাহাড় দয়ার সাগর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবাইকে বাধা দিলেন। বললেন, একে ছেড়ে দাও, এ তো অন্ধ, এর হৃদয়ও অন্ধ

চলমান…………….

Related Articles